প্রতিবেদন

চলতি বছর ১০ লাখ কর্মী বিদেশ পাঠাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সময়োচিত ও সঠিক দিকনির্দেশনার কারণে আগের চেয়ে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। আগে বাংলাদেশ থেকে যেসব শ্রমিক বিদেশ যেত, তাদের বেশির ভাগই ছিল অদক্ষ শ্রমিক। তবে এখন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিদেশে কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে শ্রমিকের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে কর্মী পাঠানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের তৎপরতার ফলে চলতি বছর জনশক্তি রপ্তানির হার বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্র“য়ারি মাসে বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে গেছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৭২ জন কর্মী। গত বছরের এ সময়ে বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে যান ১ লাখ ২৬ হাজার কর্মী। গত বছরের তুলনায় এ বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৪ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে চাকরি পেয়েছেন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, সৌদি আরবের বাজারে বিপুলসংখ্যক কর্মী নিয়োগ হওয়ার ফলে এ পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। সৌদিতে বাংলাদেশি দালাল চক্রের উৎপাত বন্ধ হলে কর্মী নিয়োগের হার আরও বাড়বে। এ বছর ১০ লাখ কর্মীর বিদেশে চাকরির টার্গেট নিয়ে কাজ করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেশ কয়েকটি পুরনো শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগ হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবে কর্মী নিয়োগের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। ফলে এ বছরের শুরুতেই জনশক্তি রপ্তানির পরিমাণ ভালো বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। জানুয়ারি-ফেব্র“য়ারি মাসে বিভিন্ন দেশে নিয়োগ পেয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কর্মী; যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি কর্মী নিয়োগ হয়েছে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। জনশক্তির রপ্তানির এ হার বজায় থাকলে চলতি বছর ১০ লাখ কর্মী বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে যেতে পারবেন বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় আশা করছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা স্বদেশ খবরকে বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছর ১০ লাখ কর্মী নিয়োগ করা সম্ভব হবে। তারা এ টার্গেট নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন। নতুন নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি করার জন্য কাজ চলছে। জাপান ৬০০ ডাক্তারসহ পেশাজীবী নিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কাতারে আলোচনা হচ্ছে, বাজারটি অচিরেই খুলে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি বাজারে বেশি করে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সবকিছু মিলে এবার শ্রমবাজার অনেক ভালো যাবে। প্রথম দুই মাসে প্রায় পৌনে ২ লাখ কর্মী বিদেশে গেছেন। বাকি ১০ মাসে টার্গেটের চেয়ে বেশি কর্মী নিয়োগ হতে পারে। তবে সৌদিতে বাংলাদেশি দালালদের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। তাদের কারণে অভিবাসন ব্যয় কমছে না। দালাল চক্র দেশটির বিভিন্ন কোম্পানি থেকে ভিসা সংগ্রহ করে বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করছে। জনশক্তি রপ্তানিকারকরা ওই ভিসার বিপরীতে কর্মীদের কাছ থেকে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি স্বদেশ খবরের কাছে স্বীকার করে বলেন, ভিসা ট্রেডিং বন্ধ করার জন্য সৌদি কর্তৃপকে অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবে জনশক্তি রপ্তানির পুরো বিষয়টি পর্যবেণে রাখা হলেও কর্মীদের কাছ থেকে বেশি টাকার বিষয়টি তারাও জানেন। মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি কর্মীদের কাছ থেকে বেশি টাকা নিচ্ছে কি না বা এক চাকরির কথা বলে অন্য চাকরিতে দিচ্ছে কি নাÑএসব বিষয় ভালোভাবে মনিটর করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কর্মীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ট্র্যাভেল এজেন্সি বেশি টাকা নিচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠেছে তার জন্য সৌদি কর্তৃপরে সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অভিযোগবিহীন জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানই সৌদিতে কর্মী নিয়োগের সুযোগ পাবে। তারা মন্ত্রণালয় নির্ধারিত খরচের বাইরে বেশি টাকা নিতে পারবে না। যদি কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাতিল হবে জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স। সৌদি বাজার উন্মুক্ত হওয়ার সময় উভয় দেশ ভিসা কেনাবেচার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তখন সৌদি কর্তৃপ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে আশ্বস্ত করেছিলÑযারা ভিসা কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে ১৫ বছরের কারাদ-ের বিধান রেখে আইন করবে। কিন্তু সে আইন না হওয়ায় ভিসা কেনাবেচা প্রকাশ্যেই হচ্ছে। এ জন্য কর্মীদের সরকার নির্ধারিত খরচের বাইরে কয়েকগুণ বেশি টাকা দিয়ে যেতে হচ্ছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, সৌদি আরবে কর্মী নিয়োগে সরকার নির্ধারিত খরচের চেয়ে বেশি টাকা নিলে সে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। শুধু লাইসেন্স বাতিলই করা হবে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হবে। দীর্ঘ ৬ বছর পর সম্প্রতি সৌদি আরব সব খাতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করেছে। কোনো প্রকার অনিয়মের কারণে বাজার নষ্ট করতে দেয়া হবে না।
উল্লেখ্য, দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। বাজারটি ৬ বছর বন্ধ রাখার পর ২০১৫ সালের ১ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে সৌদি আরব। তবে গত দেড় বছর নারী গৃহকর্মীদের পাশাপাশি শুধু গৃহ খাতের কর্মী নিয়োগ করেছে দেশটি। গত বছরের ১১ আগস্ট সব ধরনের কর্মী নিয়োগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার ঘোষণা দেয় দেশটির শ্রম ও সমাজ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়। এরপর সৌদি আরবে পুরুষ কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্রও আসতে শুরু করেছে। আগস্ট থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজার কর্মী নিয়োগ পেয়েছেন দেশটিতে। চলতি বছরের ২ মাসে প্রায় ১ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে দেশটি। সৌদি শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানির এ হার অব্যাহত থাকলে বছরের বাকি সময়ের মধ্যে আরো কয়েক লক্ষ শ্রমিক কেবল সৌদি আরবেই যাওয়ার সুযোগ পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের টার্গেট অতি সহজেই পূরণ হবে বলেও মনে করছেন তারা।