কলাম

জঙ্গিবাদের নতুন পরিক্রমা

মেজর জেনারেল মো. আব্দুর রশীদ (অব.) : গত বছরের ১ জুলাই গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে নব্য জেএমবির বর্বরোচিত হামলা নিরাপত্তাহীনতার শিরশিরে অনুভূতি দেশের মানুষের অস্থিমজ্জায় পৌঁছে দিয়েছিল। তারা ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে নৃশংসভাবে খুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ভীতি ও শঙ্কা ছড়াতে সম হয়েছিল। পরে র‌্যাব ও পুলিশের ৭টি সার্থক অভিযানে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরী ও সরোয়ার জাহানসহ ৩৫ জন নিহত হলে সংগঠনটি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। নেতৃত্বশূন্য হয়ে শক্তি ও সামর্থ্য দুটোই হারায়। হামলা করার সমতা দারুণভাবে তিগ্রস্ত হয়। পুলিশের তাড়ার মুখে তারা লুকিয়ে যায় এবং নিজেদের গুটিয়ে নেয়। ফলে জনমনে স্বস্তি ফিরে আসে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসতে থাকলে বিদেশিরাও আস্থা ফিরে পায়। ইরাক-সিরিয়ার ব্যাপক এলাকা নিয়ে খিলাফত স্থাপনকারী জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আতঙ্কে থাকা পশ্চিমা দেশগুলো বাংলাদেশেও তার অস্তিত্ব অনুভব করতে শুরু করে। যদিও ২০১৩ সাল থেকে মাঝে মাঝে ব্লগার, পুরোহিত, যাজক, পীর-মাশায়েখ, বিদেশি নাগরিক, শিয়া ও আহমেদিয়া সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চলতে থাকলে প্রায় ৩০ জন প্রাণ হারায়। জঙ্গি-আক্রান্ত অন্য দেশের তুলনায় মাত্রা অনেক কম হলেও সুন্নি মুসলিম সংখ্যাধিক্যের বাংলাদেশে আইএসের অশরীরীদের বিচরণ অনুভূত হতে থাকে। জঙ্গি তৎপরতা কমে এলে জনমনে স্বস্তি ফেরার পাশাপাশি সরকারের জঙ্গিবিরোধী অভিযান সাধুবাদ পেতে থাকে।
এবারের স্বাধীনতার মাসের শুরুতে জঙ্গিদের হামলা প্রচেষ্টার কয়েকটি ঘটনা মানুষকে আবার উদ্বিগ্ন করে তোলে। বিশেষ করে ঢাকার আশকোনায় র‌্যাবের নির্মাণাধীন সদরদপ্তরে অবস্থিত ক্যাম্পে আত্মঘাতী বোমা হামলার চেষ্টা নতুন করে আতঙ্ক ছড়ায়। র‌্যাবের মতো এলিট বাহিনীর ওপর হামলা করার দুঃসাহস দেখে মানুষ এটাকে জঙ্গিদের নতুন করে সংগঠিত হবার ইঙ্গিত মনে করে কিছুটা শঙ্কিত হয়। আবার দিনটি ছিল ১৭ মার্চ, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। বিনম্র শ্রদ্ধায় জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত থাকা দিনটিতে হামলার চেষ্টা নিঃসন্দেহে জঙ্গি উদ্দেশ্যের বিষাক্ত তীরের আদর্শিক নিশানার অস্বচ্ছতা ঘুচিয়েছে। তবে এলিট ফোর্স হিসেবে দেশে-বিদেশে খ্যাতিসম্পন্ন ও সুপরিচিত র‌্যাবের ওপর হামলার চেষ্টা জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার গতি-প্রকৃতি নিয়ে নতুন ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। বিদেশিদের মধ্যেও জঙ্গিদের সাম্প্রতিক হামলার আলামত নিয়ে নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ঢাকায় সদ্যসমাপ্ত পুলিশ প্রধানদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সিঙ্গাপুর থেকে আসা জঙ্গি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রোহান গুনারতœার দেয়া বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে দাবি করে তা মেনে নেয়ার পরামর্শ নতুন আলোড়ন তুলেছে।
অপরদিকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হুজির শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে তাকে বহনকারী প্রিজন ভ্যানে বোমা হামলা হয়। বোমা ল্যভ্রষ্ট হলেও পুলিশ এক জঙ্গিকে পাকড়াও করতে সমর্থ হয়। কুমিল্লার চান্দিনাতে নৈমিত্তিক তল্লাশির মুখে পড়ে দুই জঙ্গি বাস থেকে নেমে পুলিশকে ল্য করে বোমা ছোড়ে। দুই হামলাকারী ধরা পড়ে। তাদের দেয়া তথ্য নিয়ে পুলিশ জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পায় চট্টগ্রামের মিরেরসরাইয়ে। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বের হবার মতো সীতাকু-ে সন্ধান পায় দুটো জঙ্গি আস্তানার। প্রথম আস্তানা থেকে এক দম্পতির আত্মহনন প্রতিহত করে পুলিশে দেয় বাড়িওয়ালা ও তার পরিবার। অপর আস্তানায় পুলিশের অবরোধের মুখে প্রতিরোধ গড়ে ব্যর্থ হলে ১ নারীসহ ৪ জঙ্গি আত্মহনন করে। পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার বদলে আত্মঘাতী হবার নতুন প্রবণতা দেখা গেল। ফাঁসি হওয়া জেএমবি নেতা সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ভাইয়ের অনুচর সাবেক স্কুল শিক মাঈনুল ইসলাম মুসা নব্য জেএমবির হাল ধরে জামায়াত শিবির অধ্যুষিত এলাকায় আস্তানা গেড়ে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি শুরু করেছিল বলে আস্তানা থেকে উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক ও সরঞ্জাম থেকে অনুমিত হয়। এই মুসা-ই ২৭ মার্চে সিলেটের আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শ্বাসরুদ্ধকর কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় বলে জানা যায়। সীতাকু-ের হামলায় নিহতদের পরিবার জঙ্গিদের জামায়াতকর্মী বলে জঙ্গিত্বের দায় নিতে অস্বীকার করেছে। মানুষ হত্যা করে ইসলাম কায়েম করা যায় না বলে আপে করা খাগড়াছড়ি জেলার নাই্যংছড়িতে বসবাসরত জঙ্গি পরিবারের জঙ্গিবিরোধী উপলব্ধি জ্ঞানী মানুষদের হার মানাবার মতো।
সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলোকে নব্য জেএমবির নতুন করে মাথাচাড়া দেবার চিহ্ন হিসেবে দেখছেন অনেকেই এবং অদূর ভবিষ্যতে বড় হামলার আশঙ্কাও করছেন। সিলেটের জঙ্গি ঘটনা সে ধরনেরই ইঙ্গিত বহন করে। সীতাকু- ও সিলেটের হামলা চেষ্টাগুলোর বৈশিষ্ট্য আগের হামলাগুলো থেকে বেশ আলাদা। এবারের অসফল হামলায় অনেক দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। তড়িঘড়ি করে পরিচালিত হামলায় জঙ্গিদের সুপ্রশিতি মনে হয়নি এবং দতা ও দৃঢ়তার অভাব সুস্পষ্ট ছিল। জঙ্গিনেতাদের অপরিপক্ব মস্তিষ্ক হামলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। প্রচ- চাপ থেকে অস্তিত্ব বিপন্নের মুখে থাকা জঙ্গিরা সাধারণত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শক্তি প্রদর্শনকে উপায় হিসেবে বেছে নেয়। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারির হামলার পর অন্তত ৭টি অভিযানে ৩৫ জন যোদ্ধা নিহত হলে পুরনো জঙ্গিদের যোদ্ধায় রূপান্তর প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক জঙ্গি ধরা পড়ে বিচারের অপোয় জেলে দিন কাটাচ্ছে। মানুষের তীব্র জঙ্গিবিরোধী মনোভাব ও তরুণদের জঙ্গিবাদের অপউদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতনতা নতুন জঙ্গি সংগ্রহে প্রতিকূলতা তৈরি করেছে। পুরাতন জঙ্গিদের অনেকেই আত্মসমর্পণ করেছে এবং অনেকেই ফেরত আসার নিরাপদ পথের অপো করছে। অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহের পুরাতন সরবরাহ লাইন পুলিশের অতিরিক্ত নজরদারির মধ্যে থাকায় ভেঙে পড়েছে। অতীতের পৃষ্ঠপোষকদের অনেকেই সটকে পড়েছে। ইরাক-সিরিয়ায় আইএসের ক্রমাগত বিপর্যয় এবং পরাজয়ের ফলে সৃষ্ট ত্রিশঙ্কু অবস্থা এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সৃষ্ট আইএস নিধন যুদ্ধে সমমুখিতা ও এককেন্দ্রিকতা জঙ্গি পৃষ্ঠপোষকদের কিছুটা হলেও ভীত ও শঙ্কিত করেছে। অস্তিত্ব সংকট থেকে বের হয়ে আসার তাড়না থেকে দেশীয় জঙ্গিরা আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের দৃষ্টি কাড়তে সফল হামলার জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। শক্তির অপর্যাপ্ততা ও সংগঠনের অমতাকে ঢাকতে র‌্যাবের মতো শক্ত বাহিনীকে ল্যবস্তু বানাতে সচেষ্ট হয়েছে। র‌্যাবের ওপর হামলা সার্থক না হলেও দেশীয় গণমাধ্যমের দৃষ্টি কাড়তে সম হয়েছে। হামলা সফল হলে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতো।
আইএসের উপস্থিতি নিয়ে নিষ্ফল বিতর্ক জঙ্গি দমনে কোনো প্রভাব না রাখলেও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির ত্রে তৈরি করে। দেশীয় রাজনীতির উপাদানের ব্যাপক উপস্থিতি বাংলাদেশের জঙ্গিবাদকে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদ থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় ঘোষণার পর গণজাগরণ মঞ্চের আবির্ভাবের পর থেকে নতুন প্রজাতির জঙ্গিত্বের সূচনা হয়। জঙ্গি হামলার দায় স্বীকারের নতুন সংস্কৃতি পরিলতি হয়। ইসলামি জঙ্গিবাদীরা আদর্শিকভাবে দু’টি শিবিরে বিভক্ত। বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি) পরবর্তীতে আনসার আল ইসলাম আল কায়েদার অনুসারী এবং নব্য জেএমবি নামে গজিয়ে ওঠা জঙ্গিদলটি নিজেদের আইএসের অনুসারী হিসেবে দাবি করে। উদ্দেশ্য, কর্মকৌশল, রণকৌশল, হামলার ল্যবস্তু ও নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে আইএস ও আল-কায়েদার মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য সুস্পষ্ট হলেও অনেক েেত্র তাদের আলাদা করা যায় না। বিশুদ্ধ ইসলামের অনুসারী হিসেবে ইসলামের ভিন্ন ধারাকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয় আইএস। তাই তারা গোষ্ঠী নিধন যুদ্ধে সর্বণ লিপ্ত থাকে। প্রচলিত চর্চার নজির হিসেবে ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্যের শপথ বা বায়াত নিতে কোনো সংগঠনকে দেখা যায়নি। ২০১৩ সালের পর থেকে চালানো হামলাগুলোর দায় স্বীকারের ভিত্তিতে দুই জঙ্গিদলের মধ্যে বণ্টিত হতে দেখা যায়। গুলশান হামলা ব্যতিরেকে সব হামলা ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক অরতি নরম ল্যবস্তুকে ঘিরে। গুলশান হামলার পূর্বপ্রস্তুতি সংবলিত কিছু সাজানো চিহ্নকে উপজীব্য করে বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতির গীত গাওয়ার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক কারণকে উপো করা যায় না। গুলশান হামলার সময় জঙ্গিরা আল্লাহু আকবর ধ্বনি দেবার কথা শোনা গেলেও আইএসের সমর্থনে কিছু প্রদর্শন বা ধ্বনি দিয়েছে বলে শোনা যায়নি। বাংলাদেশের জঙ্গি হামলায় আলাদা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য আছে, ল্যবস্তুর ব্যাপকতা ও ভিন্নতা রয়েছে, মাত্রায় লঘু ও ভয়াবহতার দিক থেকে অনেক ীণ। বৈশ্বিক জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব পেলে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার অজুহাতে বাংলাদেশকে জঙ্গি দমনে হস্তেেপর ত্রে বানাতেই বারে বারে একই চিৎকার শুনতে হচ্ছে। আসলে মতাদর্শগতভাবে নব্য জেএমবি ইসলামিক স্টেট মতাদর্শের অনুসারী এবং ইউরোপ অথবা উত্তর আমেরিকার আইএস জঙ্গিদের সঙ্গে সাইবার যোগাযোগ থাকলেও এরা আইএসের নেতৃত্বাধীন অঙ্গসংগঠন নয় এবং কোনো সুস্পষ্ট চিহ্ন এখনও পাওয়া যায়নি। ব্যর্থ হামলা বা দৃষ্টি কাড়ার মতো হামলা না হলে আইএস সাধারণত দায় স্বীকার করে না অথচ বাংলাদেশের েেত্র ছোট হামলা শুধু নয় ব্যর্থ হামলার দায় আইএস স্বীকার করেছে বলে খবর প্রচার হয়। বাংলাদেশ আইএসের অস্তিত্ব স্বীকার করে না এবং জঙ্গিদের দেশীয় বলে মনে করে। আইএসের অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে থাকাটা কিছুটা অর্থহীন। জঙ্গি পরিচিতির চেয়ে জঙ্গি নিধন বা উৎপাটনের কর্মতৎপরতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
জঙ্গি নির্মূল না হলেও নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমর্থ হয়েছে। জঙ্গি নির্মূল অত্যন্ত দুরূহ কাজ। শক্ত ও নরম কৌশল মিশ্রিত বহুমুখী ও বহুমাত্রিক জঙ্গিবিরোধী রূপকল্প ও মহাকৌশল উদ্ভাবন অত্যন্ত আবশ্যকীয়। জঙ্গি দমনের চলমান কৌশল ফলপ্রসূ অবদান রাখলেও জঙ্গিবিরোধী অভিযান আরো সুচারু ও দভাবে পরিচালিত হলে জঙ্গি বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি মৌলবাদ প্রসারের রাস্তা বন্ধ করতে পারলে এবং পৃষ্ঠপোষকদের নিবৃত্ত করতে পারলে জঙ্গি নির্মূল উদ্যোগ নতুন পথ খুঁজে পাবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
ইনস্টিটিউট অব কনফিক্ট
ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস (আই কডস)- এর নির্বাহী পরিচালক