কলাম

জঙ্গি বিরোধী অভিযান ও বাংলাদেশ

মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার (অব.): বাংলাদেশের মতাসীন সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সর্বোপরি সাধারণ জনগণ সকলের জন্য গত বছরের ১ জুলাই দিনটি ছিল জঙ্গি সম্পর্কিত ধারণার একটি টার্নিং পয়েন্ট। জঙ্গিরা সেদিন গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে। পরে সেনা কমান্ডো অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হয়। নানা কারণে এটি একটি টার্নিং পয়েন্ট। ১. এর আগে আর কোনো জঙ্গি আক্রমণে এতো অধিক সংখ্যক বিদেশিকে হত্যা করা হয়নি। ২. আর কোনো জঙ্গি অভিযানে সেনা কমান্ডো ব্যবহার করা হয়নি। ৩. জঙ্গিরা জানান দেয় যে, তারা আইএস এর অংশ। ৪. জঙ্গিদের জিম্মি হত্যার ধরন ঠিক আইএসের মতোÑএকসাথে জড়ো করা এবং একে একে হত্যা করা। ৫. কোনো বিশেষ দাবি ছিল না জঙ্গিদের; তারা শুধু নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতেই বেশি তৎপর ছিল। আর এই আক্রমণ কিভাবে প্রতিহত করা হবে সে ধারণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছিল না, অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে ল্যস্থলে এগিয়ে যাওয়ার ফলেই ২ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। আর এর প্রায় ১২ ঘণ্টা পর সেনা কমান্ডোরা অভিযান পরিচালনা করে এবং ৭ মিনিটেই অভিযান শেষ করে। আর প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গি অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও।
এই সব কিছুই ছিল বাংলাদেশের জন্য এক নতুন ধারণা এবং এক নতুন জঙ্গিবিরোধী অধ্যায়। এ কথা অবধারিত সত্য যে এমন একটা ঘটনা ঘটে যাবে সে জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আদৌ প্রস্তুত ছিল না। তারপরও গুলশানের হলি আর্টিজান থেকে শুরু করে সিলেটের আতিয়া মহল পর্যন্ত জঙ্গিবিরোধী যতগুলো কাউন্টার অ্যাকশন নেয়া হয়েছে তার সবক’টিতেই কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিয়েছে।
এখন কথা হলো এই সফলতায় আত্মপ্রসাদ লাভ করার কিছু নেই। কেননা এই সফলতার মাত্রা নির্ভর করছে বাংলাদেশে কী ধরনের এবং কত শক্তিশালী জঙ্গিদের আনাগোনা আছে। দেশে সাধারণত ৪ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা- সংঘটিত হতে দেখা যায়। এগুলো হলো :
১. রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, রাষ্ট্র নিজেই তার সরকারি বাহিনী দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করে; তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিল ১৭৯৩ সালে সংঘটিত ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলেশন। ২. মতাসীন সরকারবিরোধী সন্ত্রাস, যা আমাদের দেশে প্রায় সংঘটিত হয়; আর তার টার্গেট থাকে সাধারণ জনগণ, আদতে সরকার নয়। ৩. ধর্মীয় উগ্রবাদী সন্ত্রাস, যা শোলাকিয়া, হলি আর্টিজানসহ আরো অনেক সন্ত্রাসী কর্মকা-; যা এখনও চলছে। ৪. ক্রিমিনাল সন্ত্রাস; এর একটি উদাহরণই যথেষ্ট, তা হলো ৯ ডিসেম্বর ২০১২ সালে বিশ্বজিৎ হত্যা। বলতে গেলে আমাদের দেশে সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকা-ই চলছে। আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো আমাদের দেশের জঙ্গিরা কতটুকু মোটিভেটেড এবং অস্ত্রশস্ত্র ও রণকৌশলের দিক দিয়ে তারা কতটুকু শক্তিশালী তা নির্ণয় করা এবং তার বিরুদ্ধে কাউন্টার অ্যাকশন নেয়া। বর্তমান বিশ্বে সন্ত্রাসীরা বিমান হামলা থেকে শুরু করে গাড়িবোমা বিস্ফোরণ পর্যন্ত ২৮ ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখ করার মতো হলো গাড়ি বোমা, আত্মঘাতী বোমা, কিংবা জিম্মি হত্যার মহোৎসব ইত্যাদি।
একটু ল্য করলেই দেখতে পাবেন আমাদের এদেশীয় সন্ত্রাসীরা ততটা ভয়ঙ্কর নয়, যতটা ভয়ঙ্কর হামাস কিংবা আল-কায়েদা কিংবা আইএস। সুতরাং এটা ভয়ঙ্কর পর্যায়ে যাবার আগেই সামাল দিতে হবে। আরো আশার কথা হলো আমাদের দেশীয় সন্ত্রাসীরা যেসব অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করছে সেগুলোও ততটা আধুনিক নয়। যেমন হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসীরা একে ২২ রাইফেল ব্যবহার করেছিল। আরো ছিল হাতে তৈরি হ্যান্ড গ্রেনেড ও পিস্তল।
সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও অর্থের উৎস জানা খুবই জরুরি, যা বহুবার বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ একে ২২ রাইফেল রুমানিয়াতে প্রস্তুত হলেও হলি আর্টিজানে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো এসেছিল বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিপরীতে অবস্থিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলা থেকে। ভারতের দি টাইমস অফ ইন্ডিয়ার (অক্টোবর ২৯, ২০১৬) মতে হলি আর্টিজানে ব্যবহৃত একে ২২ রাইফেল খোদ মালদাতে বানানো হয়েছিল। এতে একজন পাকিস্তানি বন্দুক নির্মাতা গোপনে মালদা এসে ভারতীয় বন্দুক নির্মাতাদের সহায়তা করেছিল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি বা এনআইএর মতে সেই বন্দুক নির্মাতা হলো আদমখেল সম্প্রদায়ের লোক, যা পাকিস্তানের পেশোয়ার ও কোহাটের মাঝামাঝি অবস্থিত। এই সম্প্রদায় বরাবরই বিভিন্ন অস্ত্র প্রস্তুত ও সরবরাহের েেত্র তালেবানদের সাহায্য করে থাকে।
এই অস্ত্র ভারতের মালদা থেকে নির্বিঘেœ বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ হয়ে ঢাকায় চলে এসেছিল। বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তা বের করেছে। ভারতীয় পত্রিকা ইন্ডিয়া টুডের (নভেম্বর ১, ২০১৬) খবর অনুযায়ী খায়রুল নামক জনৈক ভারতীয় অস্ত্র ব্যবসায়ীকে ওই সময় ঢাকার গাবতলী থেকে বাংলাদেশের ডিটেক্টিভ ব্রাঞ্চ গ্রেপ্তার করেছে। তার সাথে ১০টি অবৈধ অস্ত্র ছিল; তন্মধ্যে ছিল ৬টি পিস্তল, ৪টি বিদেশি শাটারগান, ৩৫টি বুলেট ও ১২টি ম্যাগজিন। এই সব অস্ত্র গুলশান ও শোলাকিয়া হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিল। এই ঘটনা দুইটি বিষয়কে জানান দেয়। ১. বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে হাজার কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও এসব অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ ঠেকানো যায়নি। ২. সকল অবৈধ অস্ত্র ও কন্ট্রব্যান্ড আইটেম ভারত থেকেই বেশি আসে। সুতরাং এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আমাদের বোঝাপড়ার অনেক কিছু আছে বৈকি।
বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকানো, যার সাথে যোগ হয়েছে সন্ত্রাসী কর্মকা-। তারই সঙ্গে পুনরায় যোগ হয়েছে রাজনৈতিক সন্ত্রাস। সন্ত্রাসবাদের পরিণতি তখনি সর্বনাশা হয় যখন সন্ত্রাসীদের থাকে নিরাপদ আশ্রয়, তাদের থাকে অস্ত্র ও অর্থের অনবরত উৎস। তা অদমনীয় হওয়ার পূর্বেই ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
শেষ কথা হলো আমাদের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট কতটা প্রস্তুত এবং শক্তিশালী। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের একটি কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট রয়েছে। সাথে রয়েছে র‌্যাব এবং সোয়াত। হালে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে তারা অনেক সফলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাসী দল যদি আরো আগ্রাসী ভূমিকা পালন করে কিংবা আরো আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে অধিক শক্তিশালীরূপে আত্মপ্রকাশ করে তাহলে এ ইউনিটগুলো কতটুকু সামাল দিতে পারবে তাই এখন ভাবনার বিষয়।
এমতাবস্থায়, বর্তমান সফলতার ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। তাদের অবশ্যই সন্ত্রাসীদের কর্মদতার ওপর টেক্কা দেয়ার মতা অর্জন করতে হবে। এটি একটি প্রতিনিয়ত কাজ। প্রশিণের কোনো বিকল্প নেই। সাথে রয়েছে সন্ত্রাস দমনে আধুনিক অস্ত্র জোগাড় করা। সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও অর্থের উৎস বের করে কার্যকরী পদপে গ্রহণ করতে হবে।
এতে জনগণকে অবশ্যই সম্পৃক্ত করতে হবে। বাড়ি ভাড়ার ওপর এখনো কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ আনয়ন করা সম্ভব হয়নি। আতিয়া মহলসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন আক্রমণে এটা খুবই স্পষ্ট যে বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়াদের সম্পর্কে পরিপূর্ণ তথ্য না জেনেই বাড়ি ভাড়া দিচ্ছেন।