রাজনীতি

জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে সিদ্ধান্তহীনতায় বিএনপি : দ্বিধাদ্বন্দ্বে তৃণমূল নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি নাÑতা নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। দলের একটি অংশ যেকোনো প্রকারের নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করার পক্ষে; আর অন্য অংশটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিপক্ষে। নির্বাচনে অংশ নেয়া পক্ষের দল ভারী হলেও অংশ না নেয়া পক্ষকেই বেশি সক্রিয় মনে হচ্ছে। মূলত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে গ্রুপটির প্ররোচনায় বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল, সে গ্রুপটিই ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। এই গ্রুপটি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশ না নেয়াকে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ভুল বলে মনে করে। এই গ্রুপের দাবি হলো, বিএনপি আর যেন ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে। অন্যদিকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের যে গ্রুপটি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিরোধিতা করেছিল, তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে চায়। মূলত এই গ্রুপের ইন্ধনেই বিএনপি শেষ মুহূর্তে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকে। প্রভাবশালী এই গ্রুপটির কথা হলো, বিএনপি ২০১৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিলে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই ২৫ থেকে ৩০টি আসন পাবে; যা দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। তাছাড়া ২০১৪ সালের মতো ২০১৯ সালেও যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবে না। ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই সরকারকে মধ্যবর্তী নির্বাচন হিসেবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে এবং সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে।
মূলত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া বা না নেয়া প্রশ্নে বিএনপি দৃশ্যতই দুই বা ততোধিক ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। সামনাসামনি দুই পক্ষকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নির্বাচনে অংশ নেয়া পক্ষের সঙ্গে সুর মিলিয়ে খালেদা জিয়া বলছেন, ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেয়া উচিত। আবার নির্বাচনে অংশ না নেয়া পক্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি বলছেন, ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেয়া মোটেও উচিত নয়। আসলে খালেদা জিয়া আছেন চরম সিদ্ধান্তহীনতায়। তিনি নিজেই নিশ্চিত নন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারবেন কি না! কারণ তার সামনে ঝুলছে বেশ কয়েকটি মামলা। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ বলছেন, চেয়ারপারসনের এসব মামলার রায়ের ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি যাবে কি যাবে না। নির্বাচনের প্রায় দুই বছর বাকি থাকতে যেখানে প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে, সেখানে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তা নিয়ে চেয়ারপারসন যে ধরনের সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন তা দেখে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তারা হতাশ ও বিরক্ত। বিএনপি ২০১৯ সালের নির্বাচনে অংশ না নিলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে শঙ্কিত তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। নির্বাচনমুখী একটি দল এভাবে নির্বাচন বিমুখ হয়ে যাওয়ায় বিএনপির অনেক নেতাকর্মীই এখন সরকারি দলে যোগদানের জন্য মুখিয়ে আছেন। অনেক নেতাকর্মী আবার সরকারি দলে যোগ না দিয়ে সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টায় আছেন। এই গ্রুপটিই বিএনপিতে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। একেবারে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এই গ্রুপের বিস্তৃতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গ্রুপটির জন্যই বিএনপি কোনো আন্দোলনে হালে পানি পায়নি। বিএনপির এই গ্রুপটি সব সময়ই দুই ধরনের আচরণ করে থাকে। তারা সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে ব্যবসাবাণিজ্য করে আবার কর্মীদের পুলিশি জুজুর ভয় দেখিয়ে আন্দোলন থেকে নিবৃত্ত রাখে। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হলো, এই গ্রুপটি সব সময় প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনায় পঞ্চমুখ থাকে।
দলটির এই অংশই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কিছুতেই নির্বাচনে যাওয়ার পপাতী নয়। তাদের ভাষ্য, শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান থাকলে ভোট সুষ্ঠু হবে না। তিনি নির্বাচন প্রভাবিত করবেন এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করে ওই অংশ বলছে, বিএনপিকে বিরোধী দলের আসনে বসানোর কূটকৌশল করছে সরকার। কিন্তু এ ফাঁদে পা দেয়া ঠিক হবে না। আর উদারপন্থি বলে পরিচিত অংশটি এখনই কঠোর অবস্থান না নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখার প।ে তাদের মতে, দরকষাকষির মাধ্যমে কিছু দাবি আদায় করার পাশাপাশি শেখ হাসিনার মতা খর্ব করা গেলেই নির্বাচনে যাওয়া যাবে। কারণ জনমত পুরোপুরি বিএনপির পে আছে বলেই মনে করে তারা। ওই অংশের মতে, নির্বাচনি জোয়ার তৈরি করা গেলে প্রশাসন ব্যবহার করেও পার পাবে না আওয়ামী লীগ। তাই ‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবই না’ এমন কথা এখনই বলে সংকট তৈরি করতে রাজি নয় এ পটি। তাছাড়া দশম সংসদের মতো আরেকটি নির্বাচনের আয়োজন শেষ পর্যন্ত মতাসীন সরকার করে কি না তাও দেখার পপাতী এ অংশটি।
বিএনপির থিংক ট্যাঙ্কদের মতে, জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া অথবা না নেয়ার প্রশ্নে বিএনপি নেতারা দৃশ্যতই কয়েক ভাগে বিভক্ত। তাদের কেউ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে চায়। কেউ নির্বাচনে যেতে চায় না। কেউ জোটকে শক্তিশালী করে নির্বাচনে যেতে চায়, কেউ একক নির্বাচনে যেতে চায়। মোট কথা হলো নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি নেতাদের বক্তব্য দেখে মনে হয়, তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। থিংক ট্যাঙ্কদের মতে, আগেভাগেই অমুকের অধীনে নির্বাচনে যাব না বলে শর্তজুড়ে দেয়া ঠিক নয়। বারবার নির্বাচনে যাওয়া থেকে বিরত থাকলে এক সময় বিএনপি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাছাড়া পরপর দুই বার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকলে নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের মাথায় রাখতে হবে।
বিএনপির কট্টরপন্থি বলে পরিচিতরা বলছেন, আগামী নির্বাচনে সরকারকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে তারা রাজি নন। বিএনপির এই অংশের মতে, যা হওয়ার হোক, তবু শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়। এর জন্য কেয়ামত পর্যন্ত অপোর কথাও বলছেন কেউ কেউ।
জানা গেছে, বিএনপির কট্টরপন্থি এই গ্রুপটি এখনই সরকারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করে আন্দোলনে নামতে চাইছে। আর এ জন্য তারা বিগত ৫ জানুয়ারির মতোই এবারও নির্বাচনে না যাওয়ার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের যুক্তি, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনেও যাওয়াই উচিত ছিল। আর তাঁর অধীনে আগামী নির্বাচনে গেলে দুই নির্বাচনকেই বৈধতা দেয়া হবে বলে মূল্যায়ন তাদের। তবে বিএনপির প্রভাবশালী আরেকটি অংশ এ প্রশ্নে কিছুটা কৌশলী অবস্থান নিয়ে সমঝোতার পথ খোলা রাখতে চাইছে। আর এ জন্যই শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাব নাÑএ ঘোষণা সরাসরি না দিয়ে তারা বলছে, শেখ হাসিনার অধীনে এ দেশে নির্বাচন হবে না। এ অংশের প্রকাশ্য অবস্থান হলো নির্বাচনকালে সহায়ক সরকারের দাবি আদায় করেই বিএনপি নির্বাচনে যাবে।
সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক আলোচনা সভায় বলেছেন, নির্বাচন হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে। পৃথক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, আগামী নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে হবে না। শেখ হাসিনা মতা না ছাড়লে জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে হটিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে ভোট দিয়ে বিএনপিকে মতায় বসাবে।
যেকোনো মূল্যে নির্বাচনে যাওয়ার পে এমন বিএনপি নেতারা বলছেন, বিএনপি নির্বাচনে যাবে, কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা প্রয়োজন সেই দাবিও আদায় করবে। নির্বাচনে যাওয়ার কথা বললে বিএনপির পেছনে জনগণ ঘুরে দাঁড়াবে। এর বিপরীতে নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বললে জনগণ বিএনপির ওপর থেকে আস্থা হারাবে।
এ গ্রুপটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের একটি প্রস্তাবনা দেয়ার প।ে আর এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা দেয়া হবে বলে এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি এ পর্যন্ত দলীয় ফোরামের কোনো বৈঠকে তিনি তোলেননি। যদিও সম্প্রতি বিএনপি সমর্থক পাঁচ বুদ্ধিজীবী নির্বাচনে যাওয়ার জন্য খালেদা জিয়াকে পরামর্শ দিয়েছেন। ওই দিন পাঁচ বুদ্ধিজীবীর একজন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, বিএনপি গলাকাটা পার্টি নয় যে নির্বাচনে যাবে না।
তবে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রথম থেকেই বলে আসছেন, শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। সর্বশেষ গত ১০ মার্চ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির এক আলোচনা সভায় স্পষ্ট করেই তিনি বলেন, কেয়ামত পর্যন্ত অপো করতে হলেও শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। তার এ বক্তব্যকে অবশ্য ব্যক্তিগত অবস্থান বলে দলের অনেকেই মনে করছেন।
আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি ভেঙে যেতে পারেÑএমন আশঙ্কা এখন বিএনপির অনেক নেতাই করছেন। বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত লন্ডন অবস্থানকারী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া প্রশ্নে তিনি দ্বিধান্বিত। পাশাপাশি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আছেন সিদ্ধান্তহীনতায়। এ অবস্থায় বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বিভ্রান্তিতে আছেন। বিএনপি নির্বাচনে যাবেÑএই চিন্তা থেকে তারা দলে থেকে যেতে চাচ্ছেন। আবার বিএনপি নির্বাচনে যাবে নাÑএই চিন্তা থেকে তারা সরকারি দলের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টায় আছেন।
তবে রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন এখনো অনেক দূরে থাকায় সম্ভবত সরকারকে চাপে ফেলার জন্য বিএনপির একেক নেতা একেক ধরনের কথাবার্তা বলছেন। কিন্তু বাস্তবে বিএনপি নির্বাচনে যাবে কি না তা এখনও পরিষ্কার নয়। অবশ্য অনেক বিশ্লেষকের মতে, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে হলেও বিএনপি এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সম্ভাবনা বেশি। আবার অনেকে বলছেন, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই বিএনপি ইতোমধ্যে নির্বাচনে যাওয়ার অনুকূলে সরকারের সাথে সমঝোতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং সে অনুযায়ী নির্বাচন প্রস্তুতিও নিচ্ছে দলটি।