রাজনীতি

টার্গেট জাতীয় নির্বাচন : ঘর গোছাতে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দুই বছর আগে থেকেই ঘর গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছে মতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে ধরে নিয়ে আসনভিত্তিক প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ করছে দলটি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়া, লক্ষ্মীপুর ও মাগুরার জনসভায় জনগণকে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রতিটি জনসভায়ই তিনি নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। সর্বশেষ মাগুরার জনসভায়ও প্রধানমন্ত্রী ২০১৯ সালের নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে জয়যুক্ত করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নৌকা মার্কার পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি যেসব প্রার্থীকে মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দেবে সেসব প্রার্থীদের বিষয়ে জোরালো খোঁজখবর নেয়া শুরু করেছেন। এলাকায় নেতা-কর্মীবিমুখ ও জনবিচ্ছিন্ন হওয়ায় পাস করে আসতে পারবে না এমন এমপিদের আগামী নির্বাচনে নৌকায় না তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে বর্তমান এমপিদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, এরই মধ্যে অন্তত ৫০ জন এমপির বিষয়ে চরম নেতিবাচক বার্তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছেছে। এই এমপিরা এলাকা ও দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না। মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে নির্বাচনি এলাকায় যান ঠিকই, কিন্তু ঘুরে আসেন নিজের বাড়ি থেকে। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ কাউকেই সময় দেন না। আত্মীয়-স্বজন দ্বারা পরিবৃত্ত থাকেন সব সময়। ফলে নির্বাচনি এলাকায় তাদের জনপ্রিয়তাও শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এসব আসনের জন্য বিকল্প প্রার্থী সন্ধান করা হচ্ছে বলে আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জনসভায় এমপিদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে মানুষের কথা শোনার জন্য এবং তাদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী যেসব এমপি নিজ নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে, জানা গেছে শুধু তারাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮০ জনের মতো এমপি এলাকার সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রাখেন। অনেকে শুক্র-শনিবার দুই দিন এলাকায় মাঠ চষে বেড়ান। কেউ কেউ আরও বেশি সময় এলাকায় থাকেন। নিয়মিত উঠান বৈঠকেও যোগ দেন। উঠান বৈঠকের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিরা। তারা এমপি হোস্টেলে রাতযাপন না করে প্রকৃত অর্থেই এলাকায় সময় দিচ্ছেন। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংরক্ষিত আসনের নারী এমপিদের বিষয়ে প্লিজড। এ কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী এমপিদের অনেকেই নৌকা মার্কার মনোনয়ন পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কোন কোন আসনে বিজয় নিশ্চিত ও অনিশ্চিত তা নির্ণয়ে কাজ চলছে। দলের হাইকমান্ড যেসব আসনের েেত্র স্থির বিশ্বাসী হবেন, সেগুলো ছাড়া বাকিগুলো নিয়ে হিসাব-নিকাশ করা হবে। বিতর্কিত, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন এমপিরা ফের দলীয় মনোনয়ন পাবেন না। বিপরীতে উন্নয়ন, জনকল্যাণমূলক কাজ, দলে অবদান এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এসব নেতাকে প্রার্থী করেই সাজানো হবে পরবর্তী নির্বাচনের ছক। আবার এলাকায় গ্র“পিং সৃষ্টি করে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করা প্রার্থীদের বিষয়েও সতর্ক রয়েছে কেন্দ্র। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে হলে এলাকামুখী হও এই বার্তা দেয়া হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে। এলাকাবিমুখ এমপি ও নেতারা মনোনয়ন পাবেন নাÑএ কথা সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে। দলের হাইকমান্ড থেকে বর্তমান এমপি ও সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের বলা হয়েছেÑএলাকায় যাও, মনোনয়ন নাও। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই বছর আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপিদের এলাকামুখী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ যারা যথাযথভাবে পালন করবেন তারা আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন; আর যারা এর ব্যত্যয় ঘটাবেন, স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনোনয়ন দেয়া থেকে বিরত থাকবে আওয়ামী লীগ। আগামীতে মতায় আসতে হলে জনগণের মন জয় করেই আসতে হবে। এ জন্য যারা এলাকাবিমুখ, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যাদের সম্পর্ক নেই এমন ব্যক্তিদের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, ২০১৯ সালের নির্বাচনে দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলই অংশ নেবে এবং নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এ কারণে এলাকাবিমুখ নেতাদের কিছুতেই মনোনয়ন দেবে না আওয়ামী লীগ। সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেই প্রার্থী মনোনয়ন দেবে দলটি। এ জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই দলের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন। জেলা পর্যায়ে জনসভা করছেন নিয়মিত। সর্বশেষ ২১ মার্চ মাগুরায় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা-ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও মোড়ক উন্মোচনের পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতা করেছেন তিনি। তাছাড়া দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আগে থেকেই ছিলেন কর্মীবান্ধব। দলকে চাঙা করতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তিনি। সম্প্রতি ওবায়দুল কাদের বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে ডেকে তাদের সংশোধন হয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন; না হলে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হবে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সতর্কতা সত্ত্বেও অনেক এমপির কার্যক্রম নিয়ে দলের ভিতরে বাইরে প্রশ্ন রয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে রয়েছে নির্বাচনি এলাকায় বাণিজ্যের অভিযোগ। কাবিখা থেকে শুরু করে জমি দখলেরও অভিযোগ আছে অনেক এমপির বিরুদ্ধে। এলাকায় অনেক এমপি শুধু বিচ্ছিন্নই নন, নেতা-কর্মীবিচ্ছিন্নও। দলের দীর্ঘ দিনের ত্যাগী ও পরীতি নেতারা ভিড়তে পারেন না তাদের কাছে। এসব এমপির কাছে হাইব্রিডদের কদর বেশি। কেউ কেউ আবার দলীয় নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীর আত্মীয়স্বজন দিয়ে দল পরিচালনা করছেন এলাকায়। জানা গেছে, এই ক্যাটাগরির এমপিদের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে কঠোর হবে আওয়ামী লীগ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা বুঝেই প্রার্থী বাছাইয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। ৩০০ আসনের নির্বাচন এক দিনেই হবে। কোনো দুর্বল প্রার্থীর পক্ষে কেন্দ্রের অবস্থান নেয়ার সময় থাকবে না ভোটের সময়। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি না থাকলে সমস্যা তৈরি হবে। তাই দুর্বল ও বিতর্কিত প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়ে আওয়ামী লীগ ঝামেলা বাড়াতে চাচ্ছে না। এমনকি প্রতিটি আসনেই আওয়ামী লীগ যোগ্যতর প্রার্থীকেই মনোনয়ন দিতে বদ্ধপরিকর।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের বেশ কজন নেতা বলছেন, দলের মাথায় এখন শুধু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উন্নয়ন কর্মকা-ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে মতার ধারাবাহিকতাও চান তারা। এ জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে প্রার্থী বাছাইয়ে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের দেড় বছর আগে থেকেই ৩০০ আসনে ৩০০ প্রার্থীর প্রার্থিতা নিশ্চিত করতে চায়। দেড় বছর আগে একজন প্রার্থী যদি জানতে পারেন, তিনি তার এলাকায় এমপি পদের জন্য নৌকা মার্কার মনোনয়ন পাচ্ছেন, তাহলে তার জন্য এলাকা গোছানো অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। আর এ চিন্তা থেকেই ধারণা করা হচ্ছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বহু আগেই আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দিতে পারে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, বিএনপি নানামুখী চাপে থাকলেও আগামী নির্বাচনে তারা অংশ নেবে। তাই জনপ্রিয় প্রার্থী ছাড়া একাদশ সংসদ নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব হবে না। সে জন্য টাকাওয়ালা প্রার্থীর চেয়ে এলাকায় জনপ্রিয়তা আছে এমন প্রার্থীকেই দলটি মনোনয়ন দিতে চাচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান অনেক এমপি যারা ইতোমধ্যে এলাকায় নিজের বলয় সৃষ্টি করে ফেলেছেন, মনোনয়ন না পেলে কলহ-বিবাদে লিপ্ত হতে পারেন তাদের হাত থেকে দলীয় রাজনীতি বের করার চেষ্টাও হবে বিভিন্ন উপায়ে। আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত তৃণমূলে খোঁজখবর রাখছেন। বিভিন্ন জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে অনেক সময় তিনি যোগাযোগ করেন। দলের জরিপে উঠে এসেছে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে তৃণমূল। আর তৃণমূল নেতাদের সামাল দেয়ার কাজ করছেন ওবায়দুল কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন স্বদেশ খবরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া। নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমপিদের এলাকায় গিয়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব থাকলে তা নিরসন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন মাধ্যমে এমপিদের কর্মকা-ের খোঁজখবর রাখছেন। এতে করে বর্তমান সংসদে আছে এমন এমপিদের অনেকেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না-ও পেতে পারেন। তাদের বদলে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেতে পারেন তরুণ, অবিতর্কিত ও জনপ্রিয় প্রার্থীরা।