প্রতিবেদন

তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে মমতার বিকল্প প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে না ঢাকা-দিল্লি

নিজস্ব প্রতিবেদক : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিস্তাচুক্তির বিকল্প প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে না ঢাকা-দিল্লি। বাংলাদেশ ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার মনে করে তিস্তা নিয়ে মমতা যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটা যথার্থ নয়। কয়েকটি ছোট ছোট নদীর পানি দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানি সমস্যা মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এদিকে, তিস্তার সমাধানে নতুন করে পথ খুঁজতে শুরু করেছে ভারতের মোদি সরকার। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিকল্প প্রস্তাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাড়া না দেয়ায় এবার তিস্তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।
দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানায়, তিস্তা চুক্তিতে মোদি সরকারের কোনো আপত্তি নেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিস্তাচুক্তি করতে আগ্রহী। তিনি শুরু থেকেই এটা বলে আসছেন। তিনি মমতাকে পাশে নিয়েই এই চুক্তি করতে চান। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরকালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প প্রস্তাবে বিব্রত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। আর কেন্দ্রীয় সরকার মমতার এই প্রস্তাব মানতেও নারাজ। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা, তোর্সা, মানসাই, ধানসাই ও ধরলা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে এই ৪টি নদীই ছোট ছোট নদী। বিশেষ করে তোর্সা নদীর কথাই আলোচিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তোর্সা নদী তিব্বতের চুম্বি ভ্যালি থেকে উৎপন্ন হয়ে ভুটানের মধ্য দিয়ে ৩২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশে নদীটি জলঢাকার সঙ্গে মিশেছে ও যমুনায় মিলিত হয়েছে। এর আরেকটি শাখা রংপুর সীমান্তে দুধকুমার নদীতে পড়েছে। তোর্সা নদীটি তিস্তার কিছুটা উত্তর-পূর্বদিকে অবস্থিত। আর মানসাই নদীর উৎপত্তি হয়েছে সিকিমের বিদং হ্রদ থেকে। এই নদী পাটগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। হিমালয় থেকে ধরলা নদী পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি, কোচবিহারের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। প্রবেশের পর নদীটি পাটগ্রাম থানার কাছে পুনরায় ভারতে প্রবেশ করে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। আবার ভারত থেকে অকস্মাৎ বাঁক নিয়ে কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ধরলা নদী কুড়িগ্রামের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। বাংলাদেশ অংশে ধরলার দৈর্ঘ্য ৭৫ কিলোমিটার। এর গড় গভীরতা ১২ ফুট। তবে এসব নদীর কোনোটিই তিস্তার বিকল্প হতে পারে না। কেননা তিস্তা নদী লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ৩১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই নদীর মধ্যে শুধু বাংলাদেশ অংশেই পড়েছে ১১৫ কিলোমিটার। আর তিস্তা থেকে মাসিক গড় পানি অপসারণের পরিমাণ ২ হাজার ৪৩০ কিউসেক।
জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা তোর্সা, মানসাই, ধানসাই, ধরলা নদীর পানি বণ্টনের যে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন, এসব নদীর কোনোটিতেই ব্যারাজ নেই। সে কারণে এসব নদীর পানি বাংলাদেশ এমনিতেই পাচ্ছে। তবে তিস্তার ভারত অংশে গজলডোবা বাঁধ থাকায় তিস্তার পানি পশ্চিমবঙ্গ সরকার সুবিধামতো ব্যবহার করছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। তিস্তার ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যাও অনেক বেশি। সে কারণে তিস্তা এসব নদীর কোনো বিকল্প হতে পারে না।
মমতার বিকল্প প্রস্তাবে সায় নেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্র জানায়, সিকিমের ওপর তিস্তা নদীতে ৮টি বাঁধকে পরিদর্শন করে আসার জন্য হাইড্রোলজি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধি দলকে চলতি মাসেই পাঠানো হচ্ছে। খুব শিগগির পরিদর্শনের দিন ঠিক করা হতে পারে। কারণ সিকিম রাজ্যের ওপর ওই ৮টি বাঁধকে নতুনভাবে সংস্কার করে তিস্তাকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে নিয়ে এসে তারপর তিস্তা চুক্তির পথে এগোতে পারে মোদি সরকার। সম্প্রতি শেখ হাসিনার ভারত সফরে তিস্তা চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়নের যে ঘোষণা নরেন্দ্র মোদি দিয়েছেন, এটা তারই প্রথম পদপে বলে মনে করা হচ্ছে। সেইমতো মমতার দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী তোর্সা বা ছোট ছোট নদীর বিষয়ে সমীা না করেই তিস্তা চুক্তি নিয়েই ভাবছে ভারতের মোদি সরকার।
মমতার বিকল্প প্রস্তাবে সায় নেই বাংলাদেশ সরকারেরও। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মমতার বিকল্প প্রস্তাবে সায় দিলে আর কখনোই তিস্তা চুক্তি করা সম্ভব হবে না। ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে তিস্তা চুক্তির পথ খুলতে পারে। এছাড়া মমতাকে বাদ দিয়েই এই চুক্তি করা সম্ভব কি না সেটা নিয়েও চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেছে ঢাকা-দিল্লি। ৪টি নদীর পানি বণ্টন নিয়ে যৌথ সমীা করার নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন মমতা। তবে এসব নদীর পানি নিয়ে যৌথ সমীার প্রস্তাব মানে সময়পেণ ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করছেন বাংলাদেশের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সরকারই তিস্তা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। সে কারণে মমতার বিকল্প প্রস্তাবে না গিয়ে কিভাবে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সে বিষয়ে উভয়প আবারও আলোচনা চালিয়ে যাবে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে আসার আগের দিন ৬ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি নৃপেন মিশ্রের সঙ্গে একটি বৈঠকে বসেন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিব মলয় দে। ওই বৈঠকে যাবতীয় তথ্য ও মানচিত্র দিয়ে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে রাজ্যের আপত্তির জায়গাগুলো তুলে ধরা হয়। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বক্তব্য সিকিমে একাধিক পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প ও ৮টি বড় বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি থাকছে না। ফলে কৃষি, খাবার পানি, বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। আবার বর্ষায় বাঁধ বাঁচাতে সিকিম পানি ছেড়ে দেয়ায় ভেসে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা।
সব মিলিয়ে এখন বলা যাচ্ছে, তিস্তা নিয়ে মমতা যে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন, তাকে একপাশে সরিয়ে রেখে মোদি সরকার তিস্তার পানির হিসাবে নেমেছে। তিস্তার পানিপ্রবাহের কতটুকু পশ্চিমবঙ্গ পাবে এবং কতটুকু বাংলাদেশ পাবে তা নিয়েই এখন মোদি সরকার হিসাব-নিকাশ চালাচ্ছেন। এই হিসাব-নিকাশ শেষ হলেই হয়তোবা মমতাকে বাদ দিয়েই বাংলাদেশ-ভারত ঐতিহাসিক তিস্তাচুক্তি সম্পন্ন হবে।