ফিচার

নিরাপদ মাতৃত্ব লাভের উপায়

ডা. লুৎফা বেগম লিপি : একটি মায়ের মৃত্যু অভিশাপ একজন নারীর, তার পরিবারের এবং ঐ সমাজের। পৃথিবী জুড়ে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মায়েদের মৃত্যু হয় মাতৃত্বের জটিলতার কারণে এবং এই সংখ্যা বছরে ৬ লাখের কাছাকাছি। এর ৯৯ শতাংশ উন্নয়নশীল দেশে এবং এর শতকরা ৮০ ভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
নিরাপদ মাতৃত্ব বা সেইফ মাদারহুড ইনিশিয়েটিভ (ঝধভব সড়ঃযবৎযড়ড়ফ রহরঃরধঃরাব) হলো পৃথিবী জুড়ে একটি পদপে, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকার, বিভিন্ন এনজিও, বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি। নিরাপদ মাতৃত্বের ল্য হলো পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদপে গ্রহণের মাধ্যমে মায়ের স্বাস্থ্যের উন্নতি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন : ডঐঙ, টঘঋচঅ, টঘওঈঊঋ, ওচচঋঋ, ডড়ৎষফ ইধহশ এবং বিভিন্ন জাতীয় সংস্থাসমূহ নিরাপদ মাতৃত্ব রায় অত্যন্ত সচেতন এবং সকলের একই মত যে, সীমিত সম্বল ও কার্যকরী পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে আশানুরূপভাবে মাতৃমৃত্যু কমানো যায়। নিরাপদ মাতৃত্ব একজন মানুষের অধিকার। মাতৃমৃত্যুর বিভিন্ন কারণের মূলে যে কারণগুলো প্রতীয়মান হয় সেগুলো হলো :
১. লিঙ্গ অসমতা বা এবহফবৎ রহবয়ঁধষরঃু : মেয়েদের নিম্ন সামাজিক অবস্থা মূল নির্ধারক মাতৃমৃত্যু। উন্নয়নশীল দেশে মেয়েদের বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়, যেমন সীমিত অর্থনৈতিক উৎস, শিার অভাব, অতিরিক্ত শ্রম কিন্তু তুলনামূলক কম খাবার, সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণে অনীহা। ফলে অতিরিক্ত সন্তান নেয়া, ঘনঘন গর্ভধারণ এবং সর্বোপরি গর্ভাবস্থা ও প্রসবকালীন বিভিন্ন সেবা গ্রহণে অনীহা।
২. অপুষ্টি : একটি মায়ের অপুষ্ট শরীর একটি অপুষ্ট শিশুর জন্ম দেয়, সেই সঙ্গে প্রসবে জটিলতা সৃষ্টি হয়।
৩. প্রশিণপ্রাপ্ত দাইয়ের অভাব : প্রসবের সময় প্রশিণপ্রাপ্ত দাইয়ের অভাব, প্রয়োজনে উন্নত স্থানে স্থানান্তর, ইমার্জেন্সি অবস্ কেয়ার, নিরাপদ এবরশনের অভাব মাতৃমৃত্যু বাড়ায়। উন্নয়নশীল দেশসমূহে যেমন বাংলাদেশে শতকরা ৭৬ ভাগ বাড়িতে ডেলিভারি হয়, তন্মধ্যে ৪% প্রশিণপ্রাপ্ত দাইয়ের হাতে। অথচ আমাদের ল্য হলো শতভাগ ডেলিভারি ২০২০ সালের মধ্যে প্রশিণপ্রাপ্ত দাইয়ের হাতে সম্পন্ন হওয়া। প্রজনন ও শিশুস্বাস্থ্য রায় নিরাপদ মাতৃত্ব বা সেইফ মাদারহুড একটি অন্যতম সেবা। এর মধ্যে রয়েছে :
ক. প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা : যার ভেতরে ১২-১৪ সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা নেয়া, কমপে ৪ বার স্বাস্থ্যসেবা নেয়া, ঝুঁকিপূর্ণ কেসগুলো শনাক্তকরণ ও বিশেষ সেবা প্রদান, প্রয়োজনে অন্যত্র উচ্চতর চিকিৎসা সেবা গ্রহণ, টিটেনাসের টিকা গ্রহণ।
খ. প্রসবের সময় সেবা : দ দাইয়ের কাছে
সন্তান প্রসব এবং হাসপাতালে এই সেবা গ্রহণ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার তিনটি মূলমন্ত্র অনুসরণ : হাত, মায়ের নিম্নাঙ্গ ও শিশুর নাভিমূল।
গ. প্রসবের পরবর্তী সেবা : মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সেবা মজবুত ও উন্নত, পরিবার পরিকল্পনা ব্যবস্থা গ্রহণ। নিরাপদ এবরশন এবং দ্রুত ও শুধু মাতৃদুগ্ধ পান।
ঘ. শিশুর যতœ : পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্থানে ডেলিভারি, শিশুর যতœ।
নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য করণীয় কয়েকটি ধাপ বর্ণনা করা হলো :
স্বাস্থ্যখাত
ক্স উপরে উল্লেখিত সেবা প্রদান
ক্স দ দাইয়ের উপস্থিতি
ক্স ইমার্জেন্সি অবস্ কেয়ার প্রদান
ক্স কার্যকরী সেবা ও গুণগত মানের সেবা
ক্স পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ ও অপরিকল্পিত প্রেগন্যান্সি রোধ
ক্স মাতৃমৃত্যুর সঠিক কারণ খুঁজে বের করা
ক্স নিয়মিত প্রশিণ কার্যক্রম চালু রাখা
সমাজ ও পরিবার খাত
ক্স সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালী মহিলারা ও সমাজের নেতারা এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
দেশের নীতিনির্ধারক খাত
ক্স সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রশিণের মাধ্যমে মাতৃমৃত্যুর কারণসমূহ সকলকে অবহিতকরণ
ক্স রেফারাল সিস্টেমকে উন্নতকরণ
ক্স লিখিত প্রটোকল নির্ধারণ
ক্স গুণগতমানের সেবা প্রদান
পলিসি কার্যকরণ খাত
ক্স মেয়ে শিশুদের খাদ্য, শিা ও অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে শিা প্রদান
ক্স সেবা প্রদানকারীদের সকল স্তরে সেবাপ্রদান নিশ্চিতকরণ
ক্স বয়স, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থানের বৈষম্য দূরীকরণ
সর্বোপরি সমাজের সকলের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ ও সচেতনতার আলোকে আমরা মাতৃমৃত্যু রোধ করে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে পারি।
লেখক : কনসালটেন্ট, গাইনি বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল; ঢাকা