রাজনীতি

নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে ভারতবিরোধী ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করছে বিএনপি!

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য অতীতের মতো আবারও ভারতবিরোধী ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার শুরু করেছে বিএনপি! বিএনপির সাম্প্রতিক কর্মকা-ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল এমনটিই মনে করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর-পরবর্তী খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে তেমন ইঙ্গিতই পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর নিয়ে দলীয় প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া অভিযোগ করে বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত ও প্রহসনের নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারতের তদানীন্তন সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে খুবই ন্যক্কারজনকভাবে হস্তপে করেছিল। ভারতের তদানীন্তন পররাষ্ট্র সচিব বাংলাদেশ সফরে এসে মতাসীনদের প্রহসনের নির্বাচনের নীলনকশা বাস্তবায়নে প্রকাশ্যে ভূমিকা পালন করেছিলেন। সে কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, নির্বাচনি প্রহসনের মাধ্যমে ভারতের বিগত সরকারই আওয়ামী বলয়ের শাসন মতাকে প্রলম্বিত করার েেত্র সরাসরি সহায়তা করেছে এবং তাদের প্রত্য সমর্থনেই এদেশের জনবিচ্ছিন্ন সরকার মতায় টিকে রয়েছে। ১২ এপ্রিল বিএনপি চেয়ারপারসন তার গুলশান কার্যালয়ে জরুরি এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এই অভিযোগ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর ও দেশে ফিরে ১১ এপ্রিল গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান খালেদা জিয়া।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাইÑভারতের সঙ্গে আমাদের কোনো বৈরিতা নেই। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিবেশী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ব্যাহত করতে ভারতের বিগত শাসকদের একতরফা ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ ুব্ধ। আমরা আশা করি ভারতের বর্তমান সরকার অতীতের সেই ভুল থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের মনোভাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরে দু’দেশের যৌথ ইশতেহারে যে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশে এখন সেই গণতন্ত্র নেই।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, শেখ হাসিনা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি দিল্লিতে কিছু চাইতে যাননি। কেবল বন্ধুত্বের জন্য গিয়েছিলেন এবং সেটা তিনি পেয়েছেন। কিসের এই বায়বীয় বন্ধুত্ব তা দেশবাসীই বিচার করে দেখবেন। তবে এই কথার মাধ্যমে শেখ হাসিনা প্রকারান্তরে মেনে নিয়েছেন যে, ভারত থেকে তিনি দেশের জন্য কিছুই নিয়ে আসতে পারেননি। বরং ভারতের চাহিদা মোতাবেক সবকিছুই দিয়ে এসেছেন। এই সফরকে দেশবাসী কেবলই দেয়ার এবং কোনো কিছুই না পাওয়ার এক চরম ব্যর্থ সফর বলেই মনে করে।
খালেদা জিয়া বলেন, ভাটির দেশ হিসেবে সকল আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের অধিকার। এটা কারো কোনো দয়া-দাণ্যি বা করুণার বিষয় নয়। তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি দুই সার্বভৌম দেশের মধ্যকার বিষয়। এ জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকেই বিষয়টি ফয়সালা করতে হবে। তৃতীয় প হিসেবে ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে দুই দেশের মধ্যেকার আলোচনায় সংশ্লিষ্ট করায় বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা ুণœ হয়েছে।
বিএনপি প্রধান বলেন, চুক্তি ও সমঝোতাগুলো প্রকাশ করার বদলে শেখ হাসিনা তার নিজের ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তার ওপর আস্থা রেখে দেশবাসী আজ পর্যন্ত কিছুই অর্জন করতে পারেনি। বরং ভোট দেয়ার অধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার হারিয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অনুভূতিকে এক্সপ্লয়েট করার জন্য শেখ হাসিনা ভারত সফরের আগে আলেম সম্মেলন করেন। ফিরে এসে আবার হেফাজতে ইসলাম প্রভাবিত কওমি মাদ্রাসার ওলামায়ে কেরামদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি নিজেই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন। অতীতেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার ল্েয দেশে ইসলামি শরিয়তি আইন চালুর জন্য একই ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এখন কওমি মাদ্রাসা সনদকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলে ধোঁকা দিচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি মতায় গেলে দেশের স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি ও সমঝোতা পুনর্বিবেচনা করা হবে। বিএনপি আমলে চীনের সঙ্গে প্রতিরা চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, চীন বহু আগে থেকেই অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ, আর ভারত নিজেরাই অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিস্তার বিষয়ে সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে গেলে বিএনপি সমর্থন দেবে। সুপ্রিমকোর্টের সামনে থেকে গ্রিক ভাস্কর্য সরানোর দাবির বিষয়ে খালেদা জিয়া বলেন, বিষয়টি সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণের ইস্যু; তাই প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার এটা। সরকারবিরোধী আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, আন্দোলন চলছে, আন্দোলন চলবে।
সমালোচকরা বলছেন, ১২ এপ্রিল খালেদা জিয়া যে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন, তাতে বাহ্যিকভাবে মনে হয় তিনি ভারতবিরোধী ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করছেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, খালেদা জিয়া আসলে ভারতবিরোধী নয় কংগ্রেসবিরোধী ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করেছেন। তিনি সব দোষ ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের ওপর চাপিয়েছেন এবং নরেন্দ্র মোদিকে একটু খোঁচা দেয়ার জন্য এও বলেছেন, সেই কংগ্রেস সরকারের প্রভাবেই আওয়ামী লীগ এখনো ক্ষমতায় টিকে আছে। স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, খালেদা জিয়া ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির প্রতি ইঙ্গিত করেই এমন মন্তব্য করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়া মোদি সরকারের ওপর থেকে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এখন ভারতবিরোধী ট্রাম্পকার্ড ব্যবহারে নেমেছেন। কিন্তু ভারতবিরোধী প্রচারণায় নেমে তিনি সুকৌশলে ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের মন জুগিয়ে চলছেন।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অবশ্য বলছেন, এখন থেকে ১০ বছর আগে হলে মানুষ অবশ্যই খালেদা জিয়ার ভারতবিরোধী এই ট্রাম্পকার্ডকে গ্রহণ করতো। কিন্তু মানুষ এখন অনেক সচেতন। মানুষ খুব ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছে, খালেদা জিয়া ভারতবিরোধী কথাবার্তা বলছেন, কিন্তু মোদিবিরোধী কোনো কথাই বলছেন না। খালেদা জিয়ার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ভারতে এখনও কংগ্রেসই ক্ষমতায়। বাস্তবতা হলো মানুষ ভালোভাবেই বোঝে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মোদির দিকে এখনো অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার সব কিছুই এলোমেলো করে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি নিজেই। মোদি প্রটোকল ভঙ্গ করে দিল্লির পালাম এয়ারপোর্টে শেখ হাসিনাকে রিসিভ করতে আসেন স্বয়ং; যা মোটেও আশা করেননি খালেদা জিয়া। তারপরও খালেদা জিয়া তাকিয়ে আছেন মোদির দিকেই। তাই-তো সংবাদ সম্মেলনে মোদিবিরোধী একটি শব্দও ব্যবহার করেননি খালেদা জিয়া। তাই নিন্দুকেরা এও বলছেন মোদিই খালেদা জিয়ার শেষ ভরসা!