কলাম

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং বিএনপি’র রাজনীতি

অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত। পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে বৃহত্তম প্রতিবেশী ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে সর্বোত্তম পর্যায়ে আছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে গত ৭ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেছেন। সফরের উদ্দেশ্যে দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রটোকল ভেঙে সংবর্ধনা জানাতে ছুটে আসেন। এছাড়া এবারে দিল্লি অবস্থানকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে থেকেছেন। এই প্রথম বাইরের কোনো রাষ্ট্রীয় অতিথিকে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার বিরল সম্মাননা দেয়া হলো। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের ফলে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়েছে। গত ১১ এপ্রিল গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানান, সব মিলিয়ে ৩৫টি বিষয়ে দুই পক্ষ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেছে। গণমাধ্যম সূত্রগুলো বলছে, এর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক ৫টি, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা সম্পর্কিত ৪টি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্যাটেলাইট ব্যবহার বিষয়ক ৩টি চুক্তি রয়েছে। এর বাইরে বাণিজ্য, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, সীমান্ত নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিগত সফরগুলোতে তিস্তা নিয়ে হইচই দেখা গেলেও এবার তিস্তার পাশাপাশি ‘সামরিক সহযোগিতা’ সমঝোতা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। যদিও তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ আরো কিছু সমস্যা সমাধান হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের অনেক আগে থেকেই বিএনপি এই সফরকে নেতিবাচকভাবে দেখছিল। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বিএনপি ‘হতাশ ও ক্ষুব্ধ’ হয়েছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য গত ১০ এপ্রিল বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘ভারত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে বিভক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছিল।’ অপরপক্ষে, এই দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে ‘গোলামির দস্তখত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রিজভী আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘দিল্লি নিতে জানে, দিতে জানে না। ইতঃপূর্বে ভারত এদেশ থেকে শুধু নিয়েই গেছে।’ ভারতের নিকট বাংলাদেশ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগও বিএনপি’র পক্ষ থেকে উত্থাপিত হয়েছে। দেশ বেচে দেয়া সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভারত সফর চলাকালেই বলেন, ‘আমি যখন ভারত আসি তখন নানা কথা শুনতে হয়েছে। আমি নাকি দেশ বেচে দিলাম। কতটুকু কি বিক্রি করলাম আপনারাই জানবেন। যারা এসব কথা বলেন তারা অর্বাচীন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কিছু সমস্যা থাকবেই। আমি মনে করি আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। যেমন সীমান্ত হাটে সমস্যার সমাধান করেছি, গঙ্গার পানি চুক্তি করেছি। ’৬৫ সালে যুদ্ধের সময় যেসব যোগাযোগ বন্ধ হয়েছিল তা খুলে দিচ্ছি। আমাদের ব্যবসায়ীরা সেটা নিশ্চয় বুঝতে পারবেন। এখন আপনারাই ঠিক করুন। দেশ বেচে গেলাম, নাকি নিয়ে ফিরলাম, তা আপনারাই বলবেন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের (বাংলাদেশ-ভারত) সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার নয়। আমাদের লক্ষ্য সবার বন্ধুত্ব। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ উপরের ঘটনা ও বক্তব্য বিবৃতি থেকে এটি স্পষ্ট যে এক দিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে বিদ্যমান যেকোন সমস্যার সমাধানে প্রয়াসী। এর ঠিক বিপরীতে বিএনপি’র চাওয়া হচ্ছে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা বজায় রাখা। যদিও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানাতে বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতারা দিল্লি যাচ্ছেন। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ‘ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দিল্লিতে বিএনপি’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। সেখানে তিনি সবিস্তারে এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আনন্দ কুমার ২০১৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘ডমেস্টিক পলিটিক্স অব বাংলাদেশ এন্ড বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া রিলেশন্স’ শিরোনামের এক গবেষণা নিবন্ধে লিখেছেন, ‘একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি ক্রমবর্ধমানভাবে পরিবর্তিত হয়ে থাকে কিন্তু বাংলাদেশের (ভারত) সম্পর্কীয় নীতির ক্ষেত্রে কোনো দল বা জোট ক্ষমতায় আছে তার উপর নির্ভর করে নাটকীয়ভাবে (এই পরিবর্তন) হতে দেখা যায়। বাংলাদেশের মতাদর্শগত বিভক্তি শুধু এর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই প্রভাবিত করে না, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে।’ কেন এবং কিভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভক্তি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে প্রভাবিত করে আনন্দ কুমার তাঁর নিবন্ধে সে সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। এই ভারতীয় গবেষকের নিবন্ধের বিষয়টি আমরা যদি বিবেচনায় নাও নিই তাহলেও আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি’র আবির্ভাব এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতবিরোধী চেতনার রাজনৈতিক ভিত্তি প্রায় একই সাথে হয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর ক্ষমতা দখলকারী সামরিক সরকার বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানের প্রভুত্বের চির অবসান ঘটে। কিন্তু পাকিস্তান এটি অদ্যাবধি মেনে নিতে পারেনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বনকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তখন পাকিস্তানের পরাজয় এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সহজেই মেনে নিতে পারেনি। অতএব এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি সহজ হিসাব যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান প্রেমীগোষ্ঠী ভারতের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের বিজয় তথা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়কে মেনে নিতে পারেনি। পাকিস্তান প্রেমীগোষ্ঠীটি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের নেতৃত্বদানের জন্য ১৯৭৫-এ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা- ঘটানোর জন্য দায়ী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী খুনিচক্র যারা হত্যার কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল দীর্ঘদিন পরে হলেও তাদের বিচার হচ্ছে এবং কারও কারও শাস্তি ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। কিন্তু যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত এবং যারা এই কলঙ্কজনক হত্যাকা-ের কারণে সংঘটিত পরিবর্তনের বেনিফিশিয়ারি তাদের বিচার হয়নি। পাশাপাশি দীর্ঘকাল পরে হলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার চলছে। দেখা যাচ্ছে, এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএনপি নেতিবাচক মনোভাব এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরোধিতা করে আসছে। একইভাবে পাকিস্তানও এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে অযাচিত মন্তব্য করছে। এমনকি পাকিস্তান এবং বিএনপি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারেরও বিরোধিতা করছে, অপরপক্ষে ভারত এটিকে সমর্থন করছে। এভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার বিষয়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র নীতি ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। আনন্দ কুমার বলছেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র পররাষ্ট্র নীতি সম্পূর্ণ আলাদা। আর এতে করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দ্বারা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভারতের কোনো কার্যক্রম ছাড়াই প্রভাবিত হয়। এর দ্বারা এটিও বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ থেকে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অবৈধকরণের পরই কেবল ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি হতে বিমুক্ত হতে পারে, যা যুদ্ধাপরাধের বিচারের সফল পরিসমাপ্তির পরই কেবল হতে পারে।’
বাংলাদেশ এবং ভারত একটি অনন্য এবং বিশেষ সম্পর্কে আবদ্ধ যার মূলে আছে সাদৃশ্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, একই নীতিমালা ও মূল্যবোধ এবং জনগণের একই ধরনের আকাক্সক্ষা ও আত্মোৎসর্গ। ভারতের কাছে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের পেছনে আছে ৩টি উপাদান। প্রথমটি হচ্ছে, ভারতের মূল ভূ-খ- এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ৭টি রাজ্যের মধ্যে অবস্থান বাংলাদেশের। এই ৭টি রাজ্যের প্রতিটি ভূমি আবদ্ধ এবং সমুদ্র পথে যাওয়ার একমাত্র সংক্ষিপ্ত পথ আছে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আমাদানিকৃত কার্গোর জন্য এই রাজ্যগুলো কলকাতাবন্দর ব্যবহার করে থাকে। দ্বিতীয়ত, ভারতের ‘পূর্বমুখী নীতির’ মূল অবলম্বন হচ্ছে বাংলাদেশ। অতীতের থেকে ভিন্ন, এক বন্ধুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ যার মাটি থেকে ভারতবিরোধী সন্ত্রাসকে অথবা বিদ্রোহী কর্মকা-কে না বলার নিশ্চয়তা দিতে পারে এবং তেমন এক বাংলাদেশ, বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত সমুদ্র রেখাসহ এই অঞ্চলে একটি একরোখা চীনকে নিয়ন্ত্রণ করার নিশ্চয়তা দিতে পারে। এছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বে নৌ-চলাচল উপযোগী নদীগুলো যা পশ্চিমবঙ্গকে বা উড়িষ্যাকে সংযুক্ত করতে পারে সেগুলোও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল হতে একমাত্র যাতায়াতের পথ শিলিগুড়ি করিডোর এবং এটিও বাংলাদেশের খুব কাছে। ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ হচ্ছে ভারতের নির্গমন পথ। তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে অনেক বিতর্কিত ও অমীমাংসিত ইস্যু ছিল এবং বেশ কয়েকটি এখনো রয়ে গেছে।
অত্যন্ত নান্দনিক ও প্রতীকী ভাষায় প্রতিবেশীর সাথে বন্ধুত্বকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ‘বহতা নদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ‘বন্ধুত্ব একটি বহতা নদী’ শিরোনামে এ সম্পর্কিত তাঁর লেখা ভারতের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। ‘রাজনীতি তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতি অথবা বলা চলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক’ বিষয়ে একটি নান্দনিক বিশ্লেষণ, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য যায় না। তাছাড়া ‘অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিফলন যে একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি’ সেটিও এই লেখার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মতো ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরেও ভারত বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সে কথাও তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ওই লেখাটিতে উল্লেখ করেছেন। অন্তত সংক্ষেপে হলেও দেশ স্বাধীনের পরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরবর্তীকালে এই সম্পর্ক কেমন দাঁড়িয়েছিল তাও এখান থেকে বোঝা যায়। এখানে তিনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট হত্যাকা- ছাড়া এই লেখাটিতে শেখ হাসিনা তাঁকে হত্যার উদ্দেশে ১৯ বারেরও বেশি আক্রমণের কথা উল্লেখ করেননি। পাশাপাশি ১৫ আগস্ট যে বিএনপি কৃত্রিম জন্মদিন পালন করে দেশের রাজনৈতিক সংকটকে ঘনীভূত করছে সেটিও তিনি উল্লেখ করেননি। ১৯৮১ সালে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছিল। এর পরে ১৯৯৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে নির্বাচিত হয়ে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ কর্তৃক সরকার গঠনের কথা উল্লেখ করেছেন। এ সময়ে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির দিকে মোড় নেয়। ‘দুই দশকের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি করি। ভারতের আশ্রয়ে থাকা ৬২ হাজার শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনি। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘বন্ধুত্ব একটি বহতা নদী’ কথাটি মেক্সিকোর নোবেল বিজয়ী কবি অক্টাভিও পাজ-এর ‘ইন লাইট অব ইন্ডিয়া’ বই থেকে নিয়েছেন, যা এই নিবন্ধটির শেষে তিনি উল্লেখ করেছেন। একজন কবির লেখাও যে রাজনীতি অধ্যয়নের উপাদান হতে পারে এই লেখাটি তারই প্রমাণ বহন করছে, এদিক থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়নের মধ্যে প্রচুর ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ এই সফরকে কেন্দ্র করে অন্তত একটি রাউন্ড টেবিল এবং টিভির পর্দায় প্রচারিত একটি টক শোতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের বিষয়টি তুলে ধরলেন তা খুবই হতাশাজনক। যাই হোক, প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখিত নিবন্ধে ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ থেকে পরিচালিত গণহত্যা, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট, যা বর্তমান বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর মধ্যেও পাওয়া যায় না। এছাড়া নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী মাত্র এই নিবন্ধে ‘জনকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গের শিক্ষা’ তাঁর পিতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, ‘আমার পিতা… বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের ব্রত নিয়ে রাজনীতি করেছেন। অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করেছেন। বারবার কারাবরণ করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, তবু নীতির প্রশ্নে অটল থেকেছেন। তাঁর নেতৃত্বেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।’ বহতা নদী যেমন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে বন্ধুত্বও কী তেমন পরিবর্তনশীল? গত ৭ এপ্রিল ভারতের প্রথম সারির দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ এবং পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক ‘আনন্দ বাজার পত্রিকা’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।
ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ হলে তাতে উভয় দেশেরই ক্ষতি। অপরপক্ষে, সম্পর্ক যদি বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক হয় তাহলে উভয়ের জন্যই তা কল্যাণ বয়ে আনে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাকিস্তান যেভাবে ভারত বিরোধিতা করেছে বা করছে, ঠিক একইভাবে বাংলাদেশও যাতে ভারত বিরোধিতা করে সে প্রচেষ্টাও প্রবলভাবে বাংলাদেশে আছে। তবে এখনকার বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে, দেশের প্রায় সবাই ভারতের সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ‘ভারত বিরোধিতা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য সহায়ক কি না’ ধরনের প্রশ্ন সম্ভবত এখন এ দেশে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে পড়েছে, যদিও এ ধরনের চক্রান্তকারীরা বাংলাদেশে বিশাল এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় উপস্থিত আছে। কারণ এখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রত্যেক বাংলাদেশি ভারত বিরোধিতা’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশের স্বার্থে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ বজায় রাখতেই আগ্রহী। এখন যে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক তাহলো নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণœ রেখে, দরকষাকষি করে কিভাবে বন্ধুভাবাপন্ন প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশ কত বেশি লাভবান হতে পারে, তার চেষ্টা করা। দেখা যাচ্ছে. দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রেখে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর আদর্শের সুযোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালেই ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ বাস্তবিকপক্ষেই বেশ কিছু বিষয় অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশও ভারত বিরোধিতায় মেতে থাকুক এমন ধরনের রাজনৈতিক অভিসন্ধিও বাংলাদেশের হয়ে থাকে বা এখনো হচ্ছে। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে তা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে বাংলাদেশ পক্ষের লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় রাখা, অপরপক্ষে ভারতের লক্ষ্য থাকবে ভারতের স্বার্থ বজায় রাখা। এই দুই দেশের স্বার্থের পরিপূরক একটি বিষয় হচ্ছে একপক্ষের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো কিছুকে অপরপক্ষ কর্তৃক ‘না’ বলা। পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলো বাংলাদেশ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সেই কাজগুলোই করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিষ্কারভাবেই বলেছেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে কোনো চুক্তি হলে তা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই হবে, দেশের জন্য ক্ষতিকর এমন কিছুই করা হবো না। তিনি বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল ১৯৭৪ সালে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত ২৫ বছরের সমঝোতা চুক্তিকে গোলামির চুক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। কিন্তু এই চুক্তি থেকে সীমান্ত সমস্যা সমাধানসহ বাংলাদেশেরই অর্জন বেশি।’ গত ৫ এপ্রিল তাঁর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে বাংলাদেশ পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটির প্লটের বরাদ্দপত্র বিতরণকালে প্রধান অতিথির ভাষণে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতির জন্য শেখ হাসিনা দেশের পঁচাত্তর-পরবর্তীকালের সরকারগুলোকেই দায়ী করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া কখনও ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। উপরন্তু তারা সীমান্তে সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা এবং বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচারের মূল হোতা ছিল। ওই অস্ত্র বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চোরাচালান হয়ে ভারতে যাচ্ছিল।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব অটুট রেখেই সমস্যার সমাধান করতে পেরেছ। একই সঙ্গে একইভাবে ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা সমস্যারও সমাধান করেছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যদিও অনেকেই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে গৃহীত আমাদের অ্যাকশনপ্ল্যান নিয়ে সমালোচনা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশই পৃথিবীতে একমাত্র দেশ যারা জঙ্গিদের অ্যাকশনের পূর্বেই জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ১২ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সম্পর্কে কথা বলেন। বিশেষ করে ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার ‘ন্যক্কারজনকভাবে হস্তক্ষেপ’ করেছিল বলে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন। খালেদা জিয়া জরুরি সংবাদ সম্মেলনটি ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি এবং সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বেশির ভাগজুড়েই ছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এবং বর্তমানেও ভারত সরকারের ভূমিকা কেন্দ্রিক। লিখিত বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘২০১৪ সালে কলঙ্কিত ও প্রহসনের নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারতের তদানীন্তন সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে খুবই ন্যক্কারজনকভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল। ভারতের তদানীন্তন পররাষ্ট্র সচিব (সুজাতা সিং) বাংলাদেশ সফরে এসে ক্ষমতাসীনদের প্রহসনের নির্বাচনের নীলনকশা বাস্তবায়নে প্রকাশ্যে ভূমিকা পালন করেছিলেন। সে কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিক মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, নির্বাচনি প্রহসনের মাধ্যমে ভারতের বিগত সরকারই আওয়ামী বলয়ের শাসন ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করার ক্ষেত্রে সরাসরি সহায়তা করেছে এবং তাদের প্রত্যক্ষ সমর্থনেই এদেশের জনবিচ্ছিন্ন সরকার ক্ষমতায় টিকে রয়েছে। ফলে ভারতের অবস্থান এখনো বদলায়নি। নব্বইয়ের দশকে বিএনপি ভারতবিরোধী ভূমিকা নিয়ে যে ধরনের লাভবান হয়েছিল তারা সেটা এখন অনেকটাই পুনর্মূল্যায়ন করছেন। কারণ এদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ভারতের আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতন, আগে থেকেই তারা ভারতবিরোধী মনোভাব পোষণ করে আসছে বলে ধরে নেয়া হয়। ফলে দেশের এ বিশাল জনগোষ্ঠীর ভারতবিরোধী নেতিবাচক মনোভাবকে কাজে লাগাতে বিএনপি আবারও তাদের অবস্থানেই ফিরছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা বাণীতেও বেগম খালেদা জিয়ার তেমন মনোভাবই লক্ষ্য করা গেছে। একদিকে, ক্ষমতায় যেতে গোপনে ভারতকে সম্মত করানোর জন্য ব্যস্ত, অপরদিকে জনগণকে ভারতবিরোধী বক্তব্য শুনিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতাকে একটি টেকসই প্রচারণার কৌশল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে। এমতাবস্থায়, উভয় দেশের স্বার্থে বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করার জন্য অপকৌশলের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : চেয়ারম্যান
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ও পরিচালক
সাউথ এশিয়ান স্টাডি সার্কেল