প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফর : বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় এগিয়ে নিতে হাসিনা-মোদি ঐকমত্য

বিশেষ প্রতিবেদক : নজিরবিহীন সম্মান, গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও বন্ধুত্বপূর্ণ দীর্ঘ সম্পর্কের আশ্বাসের পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বার্থকে সামনে নিয়ে এসে দিল্লিতে বসেই বললেন, ‘পানি মাঙ্গতা লেকিন ইলেকট্রিসিটি মিলতা।’ ঢাকার উদ্দেশে দিল্লি ছাড়ার আগে দুই বক্তৃতায় শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, তিস্তা চুক্তির ওপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আগামী দিনের রূপান্তর নির্ভর করছে। মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘চাইলাম পানি, দিল বিদ্যুৎ।’ অবশ্য নরেন্দ্র মোদির আশ্বাসের ওপর বাংলাদেশ আস্থা রাখতে চায় বলেও উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঝগড়া করে নয়, আলোচনার মাধ্যমেই বন্ধুর কাছ থেকে পাওনা বুঝে নিতে হয়।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরে তিস্তা চুক্তি না হলেও বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত চুক্তিটির বিষয়ে নতুন আশা দেখিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই দেশের বিদ্যমান সরকারই এ জট খুলতে পারবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। মোদি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান সরকারের মেয়াদেই তিস্তা চুক্তি হবে।’ নরেন্দ্র মোদি যে নিশ্চয়তা দিয়েছেন এবং উদারতা দেখিয়েছেন বিশেষ করে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি না থাকলেও সমস্ত প্রটোকল ভঙ্গ করে নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনাকে ভারতে অভ্যর্থনা জানান। এতে নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় বাংলাদেশকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে ভারত। অপরদিকে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সমর্থন দিয়েছে ভারত। এসবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নিদর্শন। তবে বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছেন, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনে বাংলাদেশ ও ভারত যখন একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছবে, তখন থেকেই প্রকৃত অর্থে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় স্থান পাবে।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স
নীতি জোরদারে ঢাকা ও দিল্লির অঙ্গীকার
বাংলাদেশ ও ভারত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি জোরদারের পাশাপাশি অপরাধ কার্যক্রম মুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ সীমান্ত গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠককালে তারা এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পরে এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির পাশাপাশি অপরাধ কার্যক্রম মুক্ত এবং শান্তিপূর্ণ সীমান্ত গড়ে তোলার ব্যাপারে উভয় দেশই অঙ্গীকারবদ্ধ। দুই প্রধানমন্ত্রী তিস্তার মতো অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, পদ্মা-গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প এবং আন্তঃসীমান্ত নদীর অববাহিকা ভিত্তিক ব্যবস্থাপনাসহ পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইস্যুতে আলোচনা করেছেন বলে শেখ হাসিনা জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি দ্রুততার সাথে এসব ইস্যুর সমাধানে আমরা ভারতের সমর্থন পাবো। তিনি বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপীয় চমৎকার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে তাদের এই বৈঠককে ফলপ্রসূ হিসেবে বর্ণনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, পারস্পরিক উদ্বেগ ও অগ্রাধিকারের ব্যাপারে বোঝাপড়া আরো এগিয়ে নিতে আমাদের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের সকল দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। এ প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ এবং বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার।
শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অমূল্য অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, এ জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, তার বর্তমান দিল্লি সফরকালে ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী শহীদ সদস্যদের সম্মান জানাতে পেরে তিনি আনন্দিত। একাত্তরের গণহত্যার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় নয়াদিল্লি সমর্থন দিতে সম্মত হওয়ায় তিনি এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদি একমত হয়েছেন যে, এ দু’টি দেশের উন্নয়নে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই আমরা খুলনা-কলকাতা রুটে নতুন যাত্রীবাহী বাস সার্ভিস, পরীামূলকভাবে খুলনা-কলকাতা দ্বিতীয় মৈত্রী এক্সপ্রেস এবং মালামাল পরিবহনের জন্য বিরল-রাধিকাপুর রেলপথটি পুনরায় চালু করতে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি েেত্র ভালো পারস্পরিক সহযোগিতা বিদ্যমান রয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ উদ্বোধন করেছি এবং নেপাল এবং ভুটান থেকে ক্রসবর্ডার বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়েও আলোচনা করেছি। দু’দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে আরো বেশ কিছু উদ্যোগ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি দু’দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক ঘাটতি বাড়তে থাকার বিষয়টি মেনে নিয়ে এ বিষয়ে তার সরকারের প্রয়োজনীয় পদপে গ্রহণের বিষয়েও আশ্বস্ত করেছেন। আমরা পাট রপ্তাানির েেত্র অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার বিষয়েও আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি।
দু’দেশের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্যের েেত্র সমতা আনয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার দেশের বিভিন্ন নির্দিষ্ট স্থানে ভারতের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করারও উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দু’দেশের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অন্যান্য সকল বিষয়ে আলোচনা করেছি।
দু’দেশের মধ্যে যোগাযোগের েেত্র আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগই বড় শক্তি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সে কারণেই আমরা আমাদের আগরতলা ভিসা অফিসকে যুগোপযোগী করে সম্প্রতি সহকারী হাইকমিশন এবং গৌহাটিতে আরেকটি নতুন সহকারী হাইকমিশন খুলেছি। ভারতও বাংলাদেশে আরো অনেকগুলো ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার (আইভিএসি) খুলেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এগুলো আমাদের মধ্যকার পারস্পরিক আত্মবিশ্বাস এবং বিশ্বাসের ভিতকে মজবুত ও সম্প্রসারিত করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজ (৮ এপ্রিল) দু’টি দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি দ্বিপাকি চুক্তি স্বার হয়েছে। ফলে বিবিধ জায়গায় সহযোগিতার ত্রে প্রস্তুত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরা সহযোগিতা, শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক জ্বালানির ব্যবহার, আউটার স্পেস, যোগাযোগ প্রযুক্তি, গণমাধ্যম প্রভৃতি। ভারত ইতোমধ্যে প্রশংসনীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করেছে এবং খুব দ্রুতই শিা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের েেত্র পাওয়ার হাউজ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এখন একটি সন্তোষজনক হারে এগুচ্ছে, ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। আমরা সহস্রাব্দ উন্নয়ন ল্যমাত্রার (এমডিজি) বিভিন্ন েেত্র বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তার গতিশীল নেতৃত্ব এবং উদ্ভাবনী চিন্তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এর ফলে যে ভারতই শুধু দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে তা নয় বরং দ্বিপাকি সম্পর্কের েেত্রও যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। একটি সমন্বিত এবং টেকসই সম্পর্ক সৃষ্টির কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের কর্মসূচি আমাদের যৌথ ঘোষণাতেই প্রতিফলিত হয়েছে। এখন আমাদের এই ঘোষণাকে কাজে পরিণত করে এর একটি শক্ত ভিত প্রদান করতে হবে। আসন্ন বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী দুদেশের জনগণকে শুভ নববর্ষ বলে বাংলায় নববর্ষ ১৪২৪-এর আগাম শুভেচ্ছা জানান।
প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের রাষ্ট্রপতি
ভবনে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন প্রাঙ্গণে ভারত সরকারের প থেকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতি ভবনের সংবর্ধনাস্থলে স্থানীয় সময় ৯টা ১৫ মিনিটে এসে পৌঁছলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে স্বাগত জানান। প্রেসিডেন্টের গার্ড রেজিমেন্টের একটি অশ্বারোহী দল রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রধান গেট থেকে সংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহরকে স্কট করে নিয়ে যায়। পরে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়ে হেঁটে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং সালাম গ্রহণ করেন।
গার্ড পরিদর্শন শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেখানে উপস্থিত তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সফরসঙ্গী মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে
ভারতে লালগালিচা সংবর্ধনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ৭ এপ্রিল ভারতে লালগালিচা সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফাইট প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর পালাম স্টেশন বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে ফুলের তোড়া হাতে স্বাগত জানান। ভারতের ভারী শিল্প ও পাবলিক এন্টারপ্রাইজ প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়া এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন।
পালাম স্টেশন থেকে প্রধানমন্ত্রীকে একটি সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রা সহকারে রাষ্ট্রপতি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী সেখানে অবস্থান করেন। বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাাৎ করেন। এরপর সন্ধ্যায় দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রধানমন্ত্রীকে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা দেয়া হয়।
বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের
অভিন্ন নীতিতে প্রধানমন্ত্রীকে
সোনিয়ার আশ্বাস
নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের সকল রাজনৈতিক দলের অভিন্ন অবস্থান গ্রহণের বিষয়ে ৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলীয় সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাাৎকালে সোনিয়া গান্ধী বলেন, আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান এক ও অভিন্ন।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, সোনিয়া গান্ধী দু’দেশের মধ্যে সম্পাদিত স্থল সীমানা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের সময় এই চুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়।
প্রেস সচিব ইহসানুল করিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতি অর্জনে তার পদেেপর বিষয়ে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেন। সোনিয়া গান্ধী আর্থসামাজিক েেত্র বাংলাদেশের উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।
জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে শেখ হাসিনার গৃহীত পদেেপর কথা জেনে সোনিয়া গান্ধী বলেন, কঠোর হাতে এই সামাজিক ব্যাধি দমন করতে হবে। সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ও জাতীয় কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী।
ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব
মুখার্জীর সঙ্গে শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাাৎ করেন। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দু’দেশের অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রণব মুখার্জী বলেন, তার পতœী শুভ্রা মুখার্জীর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর প্রতি সমবেদনা জানাতে কষ্ট স্বীকার করে ভারত সফর করে যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন তা ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে স্পর্শ করেছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থন দানের জন্য প্রণব মুখার্জীকে ধন্যবাদ জানান।
১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসিত জীবনে তাদের দুই পরিবারের স্মৃতিচারণ করেন।
প্রণব মুখার্জীর
নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ এপ্রিল রাতে তাঁর সম্মানে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর দেয়া নৈশভোজে অংশগ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত এ নৈশভোজে অন্যান্যের মধ্যে ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রধান বিচারপতি জগদীশ সিং খেহার, লোক সভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী অংশ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী এ কে এম মোজাম্মেল হক, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও নৈশভোজে অংশ নেন। শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও যোগদান করেন। অনুষ্ঠানে ভারতের শীর্ষ স্থানীয় শিল্পীরা লোকসংগীত, নাটক ও নৃত্য পরিবেশন করেন।
দণি এশিয়ার দেশগুলোর
উন্নয়নের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ
সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান শেখ হাসিনার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দণি এশিয়ার দেশগুলোকে দারিদ্র্যমুক্ত করে জনগণের উন্নত জীবন নিশ্চিত করার জন্য এই অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুতারোপ করে বলেছেন, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সব সময়ই জনকল্যাণের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে… এখানে কোন দেশটি বড় আর কোনটি ছোটÑএটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। আমরা একটি সার্বভৌম দেশ। কাজেই আমরা সব সময় একে অপরকে সম্মান করি এবং বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দেই; কারণ বন্ধুত্ব ছাড়া বিবাদপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকলে কিছুই অর্জন সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৯ এপ্রিল ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে তাঁর সম্মানে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগান্তকারী পদপে এবং তাঁর নেতৃত্বে এই অঞ্চলের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রধানমন্ত্রীকে এই সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ভারতের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং মতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপির উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান এল কে আদভানী এবং ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের পরিচালক নির্মলা সীতারমন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, দুই দেশের যে কমন জলজসম্পদ রয়েছে সেগুলোকে একীভূতভাবে ব্যবহার করা উচিত এবং দু’দেশের মধ্যে কমন নদীগুলোর পানি বণ্টনের ওপরই আমাদের উভয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
তিস্তা ইস্যুতে শেখ হাসিনা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরো একবার এই ইস্যু সমাধানে তার সরকারের দৃঢ় আকাক্সক্ষার কথা পুনর্ব্যক্ত করে শিগগিরই এটি সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেছেন। আর এটি হলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের েেত্র এটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় প্রচ- করতালির মধ্যে তিস্তা প্রসঙ্গে তার শঙ্কার কথা ব্যক্ত করে বলেন, দিদি মনি (মমতা ব্যানার্জি) তিস্তা ইস্যুতে আর কি করবেন তিনিই জানেন এবং আমি তার সঙ্গে কথা বলার পর তিনি আরো নতুন কিছু বিষয় আলোচনায় এনেছেন। যদিও মোদিজি (নরেন্দ্র মোদি) আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, আমরা এখানে আছি এবং দেখছি তিনি কি করেন। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ প্রদানে রাজি হওয়ার জন্য মমতা ব্যানার্জিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা পানির জন্য দাবি করে বিদ্যুৎ পেয়েছি। যা হোক, কিছুতো একটা পাওয়া হলো।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত সহযোগিতার প্রায় সকল েেত্রই উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে, বিশেষ করে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, ব্যবসাবাণিজ্য, স্বাস্থ্য এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ত্রেগুলোতে। আমরা বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের রূপকল্প ঠিক করেছি এবং আশা করছি, ভারতও আমাদের এই উন্নয়নের যাত্রার সারথী হবে। সীমান্ত চুক্তিটি ভারতের লোকসভা এবং রাজ্যসভায় সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হওয়ায় ভারতের সকল রাজনৈতিক দলের সদস্যদের প্রতি সন্তোষ জ্ঞাপন করেন শেখ হাসিনা।
ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, এটা ঐতিহাসিক ১৯৭১ সালের মতোই বিষয়, যখন ভারতের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল, সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং ভারতের জনগণ বাংলাদেশকে দ্ব্যর্থহীনভাবে সহযোগিতা প্রদান করেছিল। বাংলাদেশ ও ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি, বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার উল্লেখ করে মাল্টি মডেল কানেকটিভিটি এবং বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্যই এটা জরুরি। আমরা ভারত থেকে আরো বিনিয়োগ, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছি এবং ইতোমধ্যে ভারতের বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর এ বিষয়ে আগ্রহ দেখতে পেয়েছি।
অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে এল কে আদভানী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ নিশ্চিতভাবেই তাঁর নেতৃত্বে উন্নয়নের পথ ও পাথেয় খুঁজে পাবে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শেখ হাসিনাকে দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আদভানী বলেন, আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, বিশেষ করে আমাদের স্বাধীনতার পূর্বে যেমনটা ছিল। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের শুরুতেই এল কে আদভানী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শাল এবং ক্রেস্ট উপহার হিসেবে প্রদান করেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতার সাাৎ
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, বহুল আলোচিত তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া তারা বিভিন্ন দ্বিপাকি বিষয়াবলি যেমন আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কমন নদীগুলোর পানির হিস্যা আদায় সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করেন। এ সময় মমতা ব্যানার্জী প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন যে, তার সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধিতে প্রস্তুত রয়েছে।
শেষ কথা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে ২২টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিশ্চয়তা দিয়েছেন, তাঁর ও শেখ হাসিনার বিদ্যমান শাসনামলেই তিস্তাচুক্তি সম্পন্ন হবে। মমতা ব্যানার্জির কারণেই যে তিস্তাচুক্তি সম্পন্ন হয়নিÑএটা নরেন্দ্র মোদি অনুধাবন করেছেন। আর মমতা ব্যানার্জি যে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনের জন্য এখনই তিস্তাচুক্তি করতে চান না, এটাও নরেন্দ্র মোদি বুঝেছেন। তাই তিনি শেখ হাসিনার কাছ থেকে সময় নিয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বাস করে, তিস্তার বিষয়ে মমতাকে বোঝানো একমাত্র নরেন্দ্র মোদির পক্ষেই সম্ভব। মমতা ব্যানার্জিকে বুঝিয়ে তিস্তাচুক্তি সম্পাদন করে মোদি বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেনÑবাংলাদেশের জনগণ মনেপ্রাণে এই বিশ্বাসটি রাখে।