কলাম

বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের যুদ্ধ

ড. আতিউর রহমান : মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তিই ছিল সাধারণ মানুষ। আর এ কারণেই এটি ছিল জনগণের যুদ্ধ; যেটি জনযুদ্ধ হিসেবেই স্বীকৃত। এ যুদ্ধে যে যার অবস্থান থেকে সব ধরনের মানুষ অংশগ্রহণ করে। কেউ যেমন সশস্ত্র অংশগ্রহণ করে, তেমনি অনেকেই আশ্রয় দিয়ে, খাবার দিয়ে, তথ্য আদান-প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হন। আমি বেশ আগে একটি নমুনা জরিপ করেছিলাম। সেই জরিপ নিশ্চিত করে যে কৃষক সম্প্রদায় থেকে উদ্ভূত ও বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিতি, দায়িত্ববান তরুণ ও যুবকদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি।
আশির দশকে ‘বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের যুদ্ধ’ শিরোনামে আমার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি গবেষণা গ্রন্থের লেখার অংশবিশেষ ছিল। সে সময়ে এ লেখায় আমি স্পষ্টত তুলে আনতে চেয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষ তথা দুঃখী মানুষের অংশগ্রহণটা কেমন ছিল। সেই অংশগ্রহণের মূল শক্তিই বা কী ছিল। সে সময় গণমাধ্যমের বিস্তৃতি এতটা ছিল না, যতটা এখন। সঙ্গত কারণেই দুঃখী মানুষের যুদ্ধটাকে খুঁজে বের করে তা জনমানুষের নিকট পৌঁছে দেওয়ার তাগিদটা আমার হৃদয়ে ভীষণ রকম প্রোথিত ছিল। টেলিভিশন পর্দায় এখনো যখন মুক্তিযুদ্ধের কোনো প্রামাণ্যচিত্র দেখি, সেই রাইফেল ঘাড়ে লুঙ্গিপরা গ্রামের তামাটে কৃষক-তরুণ বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অথবা শ্রমিক বা দিনমুজর শ্রেণির কোনো তরুণ গ্রেনেড হাতে ক্রলিং করছে দেশ স্বাধীন করার অভাবনীয় সাহস নিয়েÑআমি মুগ্ধ চোখে তাদের ভেতরটা অনুসন্ধানের চেষ্টা করি।
আসলে মুক্তিযুদ্ধের বড় এক শক্তি ছিল এই অধিকারবঞ্চিত সাধারণ জনগোষ্ঠীই। এ জনগোষ্ঠীর ভেতরেই সুপ্ত ছিল অধিকার আর নতুন দেশ নির্মাণের এক স্বপ্নচিত্র। আর এ স্বপ্নচিত্রের মহানায়ক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন খুবই সাধারণ এবং একই সঙ্গে অতি অসাধারণ। ছিলেন ‘আমাদেরই লোক’। তাঁরই দ ও যোগ্য নেতৃত্বে এবং আহ্বানে ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে উদ্ভাসিত হয় বাংলাদেশের। রক্তের অক্ষরে লেখা সেই ইতিহাসের প্রাণপুরুষের রক্ত আজও মিশে আছে এই নাম জানা-না জানা অসংখ্য শহীদের রক্তের সঙ্গে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। হাজার বছর ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠী সমাজ ও সংস্কৃতির পরিম-লে টিকে থাকলেও একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের নাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই। অবশ্য ভাষা আন্দোলন প্রকৃতপে শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে। একমাত্র উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে জিন্নাহর চেষ্টার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই আন্দোলন দানা বাঁধে। এই আন্দোলনের সূচনা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই ছিলেন সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম দফায় রাজনৈতিক বন্দিদের অন্যতম। এ কথা ঠিক, বাঙালিরাও বিপুলভাবে পাকিস্তান চেয়েছিল। মূলত আর্থসামাজিক মুক্তির আশা নিয়েই তারা তা চেয়েছিল। তারা আশা করেছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি হবে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণধর্মী। জমিদারি প্রথা দ্রুত উচ্ছেদ করে পূর্ব বাংলার কৃষকদের ওপর শোষণের প্রক্রিয়া বন্ধ করতে এ রাষ্ট্র তৎপর হবে। প্রশাসনিক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে শিা, স্বাস্থ্য, শিল্প, বাণিজ্য বিকাশের পূর্ণ সুযোগ অনগ্রসর বাঙালিদের দেওয়া হবে। কিন্তু তাদের এ স্বপ্ন ভঙ্গ হতে খুব বেশি সময় লাগেনি। নয়া রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে সব েেত্রই বাঙালিরা হতে থাকে উপেতি। নতুন রাষ্ট্রের বাজেটের প্রায় পুরোটাই খরচ হতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য। সেদিনের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষে ছিল তারাই। তাই সরকারি জমা-খরচের ন্যায্য হিস্যা বাঙালিরা যে পায়নি তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। উল্টো তাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় বাংলা ভাষার ওপর নেমে আসে নগ্ন আঘাত। ফলে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতির বিকাশের পথ হয় রুদ্ধ। আমলাতান্ত্রিক, অমানবিক ও অগণতান্ত্রিক পাকিস্তানি রাষ্ট্রের চাপে বাঙালির বেড়ে ওঠার সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায় বায়ান্নর ২১ ফেব্র“য়ারিতে। সেদিন পুলিশের গুলিতে নিহত হয় বেশ কয়েকজন ভাষাপ্রেমী তাজা প্রাণ। সেদিনই পূর্ব বাংলার মূলত কৃষক-সন্তান মধ্যবিত্ত তরুণরা পাকিস্তান ধারণাটির কবর রচনা করে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বহুমাত্রিক এ নয়া রাষ্ট্র চিন্তার বীজ বপন করে।
এরপর পর্যায়ক্রমে চুয়ান্নর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয়, একষট্টির রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উদ্যাপন, বাষট্টির শিা আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এবং অসংখ্য ছাত্র, শ্রমিক ও কৃষক বিােভের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। এসব আন্দোলনে অনেক নেতারই অবদান ছিল। কিন্তু তাঁদের সবার অবদান আত্মস্থ করে ধীরে ধীরে একজনই শুধু বেড়ে উঠেছিলেন বাঙালি জাতির আশা-আকাক্সার প্রতীক হিসেবে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেই যেন সমগ্র বাঙালি জাতির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হতো। তাঁর চোখ দিয়েই যেন সমগ্র বাংলাদেশকে দেখা যেত। সুখে-দুঃখে তাঁর উপস্থিতি প্রায় সবাই অনুভব করত। আর সে কারণেই ঊনসত্তরের সফল গণ-অভ্যুত্থান শেষে ছাত্র-জনতা তাঁকে বাংলার বন্ধু বা বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধীরে ধীরে নিজে বেড়ে উঠেছেন আর সেই সঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তার পূর্ণ বিকাশের প্রক্রিয়া জোরদার করেছেন। তিনি নিজে সাহসী ছিলেন এবং সেই সাহস সঞ্চারিত করেছেন বিকাশমান পুরো জাতির মনে। সামরিক আইনের বেঁধে দেওয়া গ-ির মধ্যেও সত্তরের নির্বাচন ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক ‘টার্নিং পয়েন্ট’। এ নির্বাচন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের পে গণভোটে রূপান্তর করতে সম হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে তিনি যেসব প্রাক-নির্বাচনি সভায় বক্তৃতা করেন তাতেই দারিদ্র্য ও শোষণমুক্ত একটি স্বতন্ত্র দেশের কথা আকারে-ইঙ্গিতে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও বাঙালিকে দেশ শাসনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডেকেও সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার কোনো মতামত না নিয়েই তা হঠাৎ করে স্থগিত করে দেয়া হলো। এর প্রতিবাদে একাত্তরের পহেলা মার্চ থেকেই শুরু হলো অসহযোগ আন্দোলন। এরপর এলো ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। এদিন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে রণহুংকার দিলেন রাজনীতির এক অমর কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর পরের ইতিহাস আমাদের সবারই জানা। তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য বিচণ নেতার সহায়তায় এ ভূখ-ের পুরো বেসামরিক শাসনভার বঙ্গবন্ধু নিজের হাতে তুলে নিলেন। তাঁর নির্দেশেই একাত্তরের মার্চ মাসের বেশির ভাগ সময় বাংলার জীবন ও প্রশাসন স্বাধীনভাবে চলতে থাকে। পাশাপাশি সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের স্বপ্নও সুদৃঢ় হতে থাকে। ঔপনিবেশিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের কর্ণধাররা আলাপ-আলোচনার নামে কালপেণ করে ২৫ মার্চের কালরাতে হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। শুরু হয় নির্মম গণহত্যা। এর পরপরই ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই (১২টা ২০ মিনিট) টেলিফোন, টেলেক্স, টেলিগ্রাম ও ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপরই পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
এর পরে ৯ মাস ধরে যে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয় তার সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুরই নামে তাঁরই আস্থাভাজন নেতারা (সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীনসহ আরো অনেকে)। যুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন দুইবার তাঁর ‘বজ্রকণ্ঠ’ প্রচারিত হতো এবং মুক্তিযোদ্ধারা তাতে উজ্জীবিত হতেন। সাধারণ মানুষ অনুপ্রাণিত হতো। শারীরিকভাবে না থেকেও সর্বণ তাঁর নৈতিক উপস্থিতি মুক্তিকামী সব মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধা পলে পলে অনুভব করেন।
মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তিই ছিল সাধারণ মানুষ। আর এ কারণেই এটি ছিল জনগণের যুদ্ধÑযেটি জনযুদ্ধ হিসেবেই স্বীকৃত। এ যুদ্ধে যে যার অবস্থান থেকে সব ধরনের মানুষ অংশগ্রহণ করে। এতে কৃষক সম্প্রদায় থেকে উদ্ভূত ও বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিতি, দায়িত্ববান তরুণ ও যুবকদের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি। একইভাবে চাকরিজীবী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শ্রমিক, মজুর শ্রেণির অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। আর নানান কৌশলে নারীর অংশগ্রহণ ছিল অতুলনীয়।
আমরা দেখতে পাই, একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বর্বর সেনারা আক্রমণ করার ফলে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট অখ- পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। অসংখ্য লাশের তলায় পড়ে অক্কা পায় নিপীড়নবাদী পাকিস্তান রাষ্ট্রটি। দখলদার পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে তাই সাধারণ জনগণ প্রতিরোধযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বাংলাদেশের শহর, নগর, গ্রামগঞ্জে অসাধারণ স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষ্য করা যায়। পাকিস্তানিদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে বাঙালিরা দুরন্ত সাহস নিয়ে প্রতিরোধে নামে। দ্রুতই ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, কৃষক, শ্রমিক ও হাজার হাজার লড়াকু তরুণের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে সবাই প্রতিরোধ শুরু করলে মুক্তিবাহিনীর মাঝে দারুণ শক্তি সঞ্চারিত হয়। একইভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর থেকে বিদ্রোহ করে আসা সদস্যরাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আঞ্চলিক বাহিনী গড়ে উঠেছিল। এসব বাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কাদেরিয়া বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী, আকবর বাহিনী, আফসার বাহিনী প্রভৃতি। দেখা যায়, এসব বাহিনীও গড়ে উঠেছিল স্থানীয় পর্যায়ের কৃষক, শ্রমিক পরিবারের একেবারে সাধারণ তরুণদের অংশগ্রহণে, যে তরুণদের বেশির ভাগই ছিল দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রণকৌশল ও যুদ্ধ পরিচালনায়ও সাধারণ মানুষ দারুণভাবে সফলতার পরিচয় দেয়। মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা গ্র“পগুলোও তৈরি হয়েছিল গ্রামীণ তরুণদের সমন্বয়ে। আবার দেরাদুন থেকে যে বিপুলসংখ্যক তরুণ (বিএলএফ) সশস্ত্র প্রশিণ গ্রহণ করে এসেছিলেন, তাঁরাও ছিলেন শহুরে ও গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সচেতন, শিতি তরুণ।
মুক্তিযুদ্ধে দুঃখী মানুষের স্বপ্ন ছিল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন ও অর্থনৈতিক মুক্তি। সবাই স্বপ্ন দেখত পেট ভরে ভাত খাবে, ভালো কাপড় পরবে। সন্তানরা উপযুক্ত শিা পাবে। সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পাবে। সবার জন্য আবাসন ব্যবস্থা থাকবে। ভূমিতে সাধারণ কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। শোষিত-বঞ্চিত শ্রমিকরা ন্যায্য অধিকার পাবে। আমরা দেখতে পাই, মুক্তিযুদ্ধে যে স্বপ্ন নিয়ে দুঃখী মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল, সেই স্বপ্নের বড় অংশই স্থান পেয়েছিল বাহাত্তরের সংবিধানে। একই সঙ্গে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিলেও আর্থসামাজিক মুক্তির আকাক্সা সন্নিবেশিত হয়েছিল। ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে’ যে যাত্রা বাঙালি শুরু করেছিল, তার মূল ল্যই ছিল দারিদ্র্যমুক্ত এক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তবে বলতে দ্বিধা নেই, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বাহাত্তরের সংবিধান অনুসৃত স্বপ্নগুচ্ছ থেকে ছিটকে পড়ে। তৎপরবর্তী সময়ে মতাসীন সরকারগুলো রাষ্ট্রে নিজেদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালি সংস্কৃতির বহু বিষয়ে নানা ধরনের বিতর্ক উসকে দেয় এবং সফলভাবে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে বিভ্রান্তি তৈরি করে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপরাধীদের রাজনীতি ও প্রশাসনে স্থান করে দেওয়া এবং অন্যদিকে জাতির জনকসহ মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনাকে অবজ্ঞা করার এক দুঃখজনক ‘অদ্ভুত অন্ধকার’ পর্বের মুখোমুখি হতে হয়েছিল দুর্ভাগা বাঙালিদের। সেই ন্যক্কারজনক অপইতিহাসের কথা সবারই জানা।
তবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার সুদ নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে নিরলস আকাক্সা লণীয়, তা আমাদের নতুন করে যেমন আশাবাদী করেছে, তেমনি ৩০ লাখ শহীদের প্রতি দায়বদ্ধতাও প্রকাশিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- ও যুদ্ধাপরাধীদের দীর্ঘ প্রতীতি বিচার সম্পন্ন করার পাশাপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে এবং এ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে ২০২১ সালের মধ্যে ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পরিপূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ল্েয এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। একই সঙ্গে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের ল্েযও এগিয়ে যাচ্ছে সরকার।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রমতায় আসে। মতা গ্রহণের পরপরই আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ ও রূপকল্প-২০২১ বাস্তবায়নে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন ও অগ্রসরমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে আবার মতা গ্রহণের পর জনগণের দোরগোড়ায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছানো, দরিদ্র মানুষের সম্পদ ও পুঁজি গঠন, শিা সহায়তা, কমিউনিটি কিনিক সক্রিয়করণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, নারী মতায়ন বাস্তবায়ন, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো, পরিবেশ সুরা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ল্েয মোট ১০ ধরনের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনিÑযা থেকে সরাসরি দেশের আপামর জনগণ উপকৃত হচ্ছে।
নানা ধরনের বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও আমরা দেখতে পাচ্ছি চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। একই সঙ্গে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার নেমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ২৪ ভাগে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বলতে দ্বিধা নেই, উন্নয়নের মহাসড়কে আজ বাংলাদেশ। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেলসহ যেসব মেগা প্রকল্প বর্তমান সরকার হাতে নিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের চেহারাই বদলে যাবে। আর এর সুফল দুঃখী তথা সাধারণ মানুষও পাবে। যেমনটি চেয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ
গবেষক ও অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক॥