প্রতিবেদন

ভারত সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা : বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের মেয়াদকালেই তিস্তা চুক্তি হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে বাংলাদেশের সবাই আশা করেছিল, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা চুক্তি না হলেও এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু তা-ও হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরোধিতার কারণেই মূলত তিস্তা নিয়ে আলোচনা তেমন এগোয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আগ্রহ ছিল তিস্তা নিয়ে ভারত সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী বলেন। প্রধানমন্ত্রী মানুষকে নিরাশ না করে বলেছেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের মেয়াদকালেই তিস্তা চুক্তি হবে। মোদি যখন ঘোষণা দিয়েছেন তখন স্বাভাবিকভাবে আমরা অপো করতেই পারি। মোদির মতো শেখ হাসিনাও আশা করেন তাঁর সরকারের বর্তমান মেয়াদকালেই তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হবে।’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেয়া তিস্তা চুক্তির বিকল্প প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ। ভারত সফরকালে তিস্তার বদলে ৪টি ছোট নদী থেকে বাংলাদেশকে পানি দিতে মমতার প্রস্তাবের পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি মমতাকে বলেছেন, ছোট নদীগুলো থেকে পানি তিস্তায় নিয়ে তারপর তিস্তা থেকে বাংলাদেশকে পানি দেয়া হোক। ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানান শেখ হাসিনা। তাঁর ভারত সফরের সার্বিক বিষয়ে জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ভারত সফরকালে তিস্তা চুক্তির অগ্রগতি, প্রতিরা খাতে এমওইউ স্বার, ভারতের অর্থঋণের বিষয়েও নানা তথ্য জানান শেখ হাসিনা।
ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি ভারতে গেছি, আমাদের বিএনপি নেত্রী বলে দিল, দেশ বেচে দিয়েছি। আমি বললাম যে ধামায় করে নিয়ে যাচ্ছি আর ফেরি করে বেচে এসেছি। আর কী বলব? শেখ হাসিনা দেশ বেচে না, দেশের স্বার্থ রা করে এবং রা করতে জানে।
তিস্তা চুক্তির বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জি যখন এ দেশে এসেছিলেন তিনি আমাকে কথা দিয়ে গিয়েছিলেন পানি দেবেন। এখনো কিন্তু তিনি নিষেধ করেননি। বলেছেন আশপাশে কয়েকটি ছোট নদীর সংযোগ ঘটিয়ে সেখান থেকে পানি দেয়ার ব্যবস্থা করার কথা। এগুলোর বাস্তবতা নিরীা করা হোক। মানে একটা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে গেল। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিস্তা চুক্তি হবে। আমাদের দুই সরকারের মেয়াদেই হবে।
বর্ষা মৌসুমে পানি ধরে রাখতে তিস্তা নদী খননের উদ্যোগ নেয়া হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বর্ষাকালে পানি যাতে ধরে রাখতে পারি সে জন্য নদী খননের উদ্যোগ নেব। তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিস্তার গজলডোবায় বাঁধ যখন করা হয়, তখন যারা আমাদের এখানে মতায় ছিল, তাদের এ নিয়ে বক্তব্য থাকা উচিত ছিল। এই ব্যারাজের পরিকল্পনা ভারতের বহু আগে থেকে। আজ যারা চিৎকার করে গলা ফাটাচ্ছে, তারা টুঁ শব্দ করেনি কেন তখন? আবার সেই নদীতেই তারা ব্যারাজ বানিয়েছে। এটা আমাদের জন্য আত্মঘাতী হয়েছে। এর অশুভ ফল আমরা এখন ভোগ করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে পাংশায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের প্রকল্প তিনি নাকচ করে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। এর বদলে উজানে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে ‘রিজার্ভার’ তৈরি করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য পানি সংরণের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় যে নকশা তৈরি করেছে তা পুরোপুরি ভুল। ওটা বাস্তবায়ন করা ঠিক হবে না। এটা আত্মঘাতী হবে। তিস্তা ব্যারাজের মতোই আত্মঘাতী হবে। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির সময় আমি বলেছিলাম, ব্যারাজ একসঙ্গে করব, যাতে সবাই ব্যবহার করতে পারে। এটা ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে করতে হবে এবং খরচও ভারত দেবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে যে রিজার্ভার যদি করা যায়, তাহলে দুই দেশ শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করতে পারে।’ ব্যারাজ নির্মাণে অতি উৎসাহীদের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের এখানে তো একটা ব্যাপার আছে, প্রকল্প হলেই কমিশন আসবে, ঠিকাদারি আসবে, টাকা আসবে। এসব কারণে অনেকের বেশি উৎসাহ থাকে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার কাছে ব্যারাজ নির্মাণের প্রকল্প এসেছিল। আমি এত্ত বড় নোট দিয়ে ওটা নাকচ করে দিয়েছি।’
ভারত সফরে কতটুকু সন্তুষ্টÑসাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বলব সফরটা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে, সব মিলিয়ে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভারতের চেয়ে আমরা ভৌগোলিকভাবে ছোট, জনসংখ্যাও আমাদের কম। কিন্তু একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে, সম্মানের দিক থেকে সমান সমান। ভারত অন্তত সেই মর্যাদাটুকু আমাদের দিয়েছে। এটাই হচ্ছে তৃপ্তির বিষয়। এখানে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যেকোনো কাজে আমি যখন সিদ্ধান্ত নিই তখন দৃঢ়চেতা হয়েই নিই। এখানে হতাশ হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি’। ভারত সফরের অর্জন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি তো কিছু চাইতে যাইনি। বন্ধুত্ব চাইতে গিয়েছিলাম, বন্ধুত্ব পেয়েছি।’
প্রতিরা চুক্তি সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, আমি শুধু এটুকু বলব, আমরা তো শুধু এমওইউ সই করেছি। এর মধ্যে আছে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিণ ও আলোচনা, মহান স্বাধীনতা দিবসের স্মৃতিচারণামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন, বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানের আদান-প্রদানের মতো বিষয়গুলো।’ প্রতিরা খাতে যে ঋণ চুক্তি হয়েছে সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত আমাদের যে সহযোগিতাটা দিয়েছে তা ১ শতাংশ সুদে এবং আগামী ২০ বছরে আমরা তা শোধ করতে পারব। এর মধ্য দিয়ে আমরা যা কিছু ক্রয় করব তাতে আমাদের স্বাধীনতা থাকবে। এখানে আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেব আমরা কী কী সামরিক সরঞ্জাম কিনব। এটা কিন্তু আমাদের নিজস্ব স্বাধীনতা। আমরা নিজেদের পছন্দমতো বিভিন্ন দেশ থেকে সরঞ্জাম কিনতে পারব। আমরা কিন্তু পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই কিছু না কিছু কিনি। এমনকি পাকিস্তান থেকেও কিছু জিনিস কিনি।’ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরা চুক্তি আছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বেলারুশ, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স, কুয়েত, তুরস্কÑএ ৬টি দেশের সঙ্গে আমাদের প্রতিরা সংক্রান্ত চুক্তি করা আছে।’