আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্যে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার : উদ্বিগ্ন চীন-রাশিয়া

স্বদেশ খবর ডেস্ক : ইরাকে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। দেশটির মসুল শহরে গত ৩ মার্চ এক হামলায় ১২ জন আহত হওয়ার ঘটনার আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি রাসায়নিক হামলা ছিল। আহত ব্যক্তিরা বলেছেন, হামলার সময় তারা রাসায়নিক উপাদানের গন্ধ পেয়েছেন। আইসিআরসির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক রবার্ট মারদিনি বলেন, আহত ব্যক্তিদের লণ দেখে রাসায়নিক অস্ত্র হামলা হয়েছে বলে সন্দেহ হয়। তাদের শরীরে ফোসকা, চোখে লালচে ভাব, বমি, কাশি ও চুলকানি দেখে এমনটাই মনে হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে তিনি জানান। এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে ইরাকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের তদন্ত দাবি করেছে রাশিয়া ও চীন। সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে তদন্ত করছে জাতিসংঘের একটি প্যানেল। জাতিসংঘের এ প্যানেল যেন সিরিয়ার পাশাপাশি ইরাকেও তাদের তদন্ত কাজ সম্প্রসারিত করে, তার প্রস্তাব দিয়েছে দেশ দুইটি। তবে প্রস্তাবটিকে তাৎণিকভাবে নাকচ করে দেয় যুক্তরাজ্য। দেশটি বলেছে, ইরাক সরকারের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। এছাড়া ইরাক ও সিরিয়ার পরিস্থিতি ভিন্ন।
ইরাকের মসুল লড়াইয়ের বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠকে দেশটিতে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে তদন্তের প্রস্তাব তোলে রাশিয়া ও চীন। দেশটিতে ইরাকি বাহিনী জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াই করছে। বৈঠকে সভাপতিত্বকারী ব্রিটিশ দূত ম্যাথিউ রিক্রোফট বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা আইএস জঙ্গিদের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য পেয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘের উদ্বেগের পাশাপাশি সিরিয়া ও ইরাকের মসুলে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার দেখে আতঙ্কে রয়েছে বিশ্ববাসী। রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার দেখে অনেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন বলে মনে করছেন। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার যেসব কারণ আছে তার মধ্যে একটি হলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়া। এর কারণ রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে উন্নত দেশগুলো। এদের মধ্যে রয়েছে ইসরাইল, আমেরিকা ও রাশিয়া। এটি ওপেন সিক্রেট, ইরানে রাসায়নিক আক্রমণ করার পরিকল্পনা রয়েছে ইসরাইলের। অন্যদিকে আইএস দমনে সিরিয়া ইস্যুতে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের দ্বিধাবিভক্তি এখন স্পষ্ট।
চীনও রাশিয়ার সুরেই কথা বলছে। তাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা যেমন বাড়ছে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি। যদি সেটাই হয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে এই হিসাব কষা খুব কঠিন নয়। রাসায়নিক অস্ত্রের ভয়াবহতা বিশ্ববাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেখেছে। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নামের দু’টি শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে পারমাণবিক বোমা। যারা এ জঘন্য কাজটি করেছে আজও তাদের কোনো বিচার হয়নি।
এখন দেখেশুনে মনে হচ্ছে, আরেকটি বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার জন্য সামরিক শক্তিধর দেশগুলোর প্রস্তুতি রয়েছে। আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ অলিখিত ন্যাটোর মোড়কে কোয়ালিশন গঠন করে একটি প তৈরি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সামরিক জবাব দেয়ার জন্য রাশিয়া, চীন, ইরান, দণি কোরিয়াসহ সামরিক হামলার জবাব দিতে সম দেশগুলোও প্রস্তুত। স্থল, বিমান ও নৌ হামলার জন্য সবাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়াকে তার সেনাবাহিনী ব্যাপকভাবে পুনর্গঠিত করতে দেখা গেছে। দেশটির সেনাবাহিনী নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্রিটেনের বিভিন্ন গণমাধ্যমের দাবি, রাশিয়ার সেনাবাহিনী সম্মুখ সমরের জন্য নিজেদের তৈরি করছে। ভøাদিমির পুতিনের সেনাবাহিনী সামরিক প্রশিণের জন্য বিস্ময়করভাবে ৪ হাজার ক্যাম্পে অংশ নিয়েছে যেখানে ন্যাটোর সেনারা সাকুল্যে ২৭০টি সামরিক ক্যাম্পে অংশ নিয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার সমরাস্ত্র তৈরি ও আমদানি বেড়েছে ১৬ শতাংশ। তৎপরতা দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর তরফেও। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর আকার ছোট করার পরিকল্পনার কথা বলা হলেও কিছু নির্দিষ্ট সেনা ছাড়া গত দেড় বছর এই কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এছাড়া বেড়েছে সামরিক প্রশিণ ও তৎপরতা। সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটাই সত্যি দুই পই অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য নিজেদের তৈরি করছে।
ইউরোপিয়ান লিডারশিপ নেটওয়ার্ক (ইএলএন) জানিয়েছে, গত ১৮ মাসে অন্তত ৬৬ বার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়া। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট (ন্যাটো) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সামরিক তথ্যের ভিত্তিতে গত বছরের জুলাই মাসে ইএলএন প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সবচেয়ে বড় শঙ্কাটি দেখা দিয়েছিল। সে সময় ইউক্রেন নিয়ে ন্যাটো ও রাশিয়া পরস্পরের মুখোমুখি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ধনে ন্যাটো ইউক্রেনে সৈন্য পাঠানোর অনুমোদনের বিষয়টি নিয়ে ােভে ফেটে পড়েছিল রাশিয়া। সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনে রুশ সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ভাদিমির পুতিনের এক অনুরোধ অনুমোদন করেছিল রুশ পার্লামেন্টের উচ্চক। আর এরপরই ইউক্রেনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং রুশ হস্তেেপর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিশ্বে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে। জাতিসংঘ ইউক্রেনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সীমান্তে অবৈধভাবে সামরিক হেলিকপ্টার ও মালবহনকারী বিমান পাঠানোর অভিযোগ করেছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও সীমানার অখ-তা ভঙ্গ করা হলে তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটাবে। বিশ্বের সমর বিশারদরা বলছেন, গত দেড় বছর ধরে যুদ্ধাশঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছিল বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক চাপ। বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কায় ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনার পারদও চড়তে থাকে। যার পরিপ্রেেিত বিশ্বের বড় দুই সামরিক পরাশক্তিকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানায় বিভিন্ন বৈশ্বিক সংগঠন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে পুতিনের হটলাইনে যোগাযোগের ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এ সময় অবশ্য ইইউয়ের নেতারা উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখেন। ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপ্রধানদের একান্ত চেষ্টায় সেবারের অবশ্যম্ভাবী রাসায়নিক যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়। তবে আগামীতে এটি না-ও ঘটতে পারে। ইরাকের মসুলে ও সিরিয়ায় যে রাসায়নিক অস্ত্রের খেলা শুরু হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে জড়িয়ে যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। এই দুই শক্তিধর রাষ্ট্রই রাসায়নিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ হওয়ায় বিশ্ববাসীর আশঙ্কা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন এবং সে যুদ্ধেই রাসায়নিক অস্ত্র তথা শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে গোটা পৃথিবী।