কলাম

মুজিবনগর সরকার ও বঙ্গবন্ধু

মোহাম্মদ শাহজাহান : আমাদের মুক্তি সংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে প্রবাসী মুজিবনগর সরকার। এক বিশৃঙ্খল ও এলোমেলো পরিবেশে গঠিত হয়েছিল যুদ্ধকালীন ওই সরকার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ সারাদেশে গণহত্যা শুরু করলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই ওই রাতে হাজার হাজার নিরীহ-নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেতাদের বাড়িতে বাড়িতে হানা দেয় পাকি আর্মি। বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হলেও চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয় নেতা আমাদের সঙ্গেই আছেন। কিন্তু বাংলাদেশ আক্রান্ত ও উদ্বিগ্ন মানুষ এমনকি প্রথম সারির নেতারাও তখন জানতেন না বঙ্গবন্ধু কোথায়। বঙ্গবন্ধু জীবিত না মৃত তাও কারো জানা ছিল না। দেশ ও জাতির অনিশ্চিত পরিবেশে তাজউদ্দীন আহমদ অতিশয় দ্রুততার সঙ্গে দিল্লি গিয়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ১০ এপ্রিল ভারতের অজ্ঞাত স্থান থেকে এক দীর্ঘ বেতার ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। বিশ্ববাসী জানল, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের কথা। মোশতাক গংসহ আরো কেউ কেউ তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে চায়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ইতিহাসে স্বর্ণারে লেখা থাকবে। হাজার বছর পরে হলেও ঐতিহাসিকরা লিখবেন, তাজউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বে ছিলেন বলেই ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল। আসলে একাত্তরের মার্চেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। ৯ মাসের যুদ্ধে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীকে স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মুজিবনগর সরকার একাত্তরের ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে দেশি-বিদেশি শত শত সাংবাদিকের উপস্থিতিতে শপথ গ্রহণ করে। শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে জাতির জনকের নামে অস্থায়ী সরকারের রাজধানীর নামকরণ করেন মুজিবনগর। যুদ্ধকালীন ৯ মাস বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি থাকলেও তাঁর নামেই যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী নেতা হিসেবে শেখ মুজিবেরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বৈধ অধিকার ছিল। কিন্তু সামরিক জান্তা ২৫ মার্চ রাতে বাংলার নিরস্ত্র মানুষের ওপর অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। আর নির্বাচনে বিজয়ী নেতা হিসেবে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা ছাড়া মুজিবের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। নির্বাচনে বিজয়ী নেতা হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করার এখতিয়ার একমাত্র বঙ্গবন্ধু মুজিবেরই ছিল।
১৭ এপ্রিল হঠাৎ করে আসেনি। ২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রামের ফসল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শেখ মুজিবের মতো অনন্য সাধারণ গুণাবলি সম্পন্ন একজন নেতার জন্ম হয়েছিল বলেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। মুজিবের মধ্যে যত রাজনৈতিক গুণাবলি ছিল, বিশ্বের আর কোনো নেতার মধ্যে এককভাবে এতসব গুণাবলি ছিল না। মুজিবের দূরদর্শিতার কি কোন তুলনা হয়? ১৯৬৬ সালে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন সংবলিত ৬ দফা দাবি জাতির সামনে পেশ করেন শেখ মুজিব। নেতা জানতেন, পাকিস্তান সামরিক চক্র ৬ দফা মেনে নেবে না। আর তখনই ৬ দফা ১ দফায় পরিণত হবে। একাত্তরে মাত্র ৫ বছরের মাথায় ৬ দফা ১ দফায় পরিণত অর্থাৎ স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়। ৯ মাসের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। এলএফওর অধীনে অনেকেই সত্তরের নির্বাচনে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু নির্বাচনে প্রমাণিত হয় পূর্ব বাংলার পে কথা বলার একমাত্র অধিকার শেখ মুজিবের; যা মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। ১৯৭১-এর ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ শেখ মুজিবের নির্দেশে বাংলাদেশ পরিচালিত হয়। প্রকৃতপে ওই ২৫ দিনেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানের মতো তিনি জনগণকে বলেন, তোমরা শুধু আমার কথাই শুনবে। ২৫ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার দুই সপ্তাহের মাথায় ১০ এপ্রিল স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ বেতার ভাষণ দেন। ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়।
২৫ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ ও শীর্ষ ছাত্রনেতারা বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আত্মগোপনের প্রাণান্ত চেষ্টা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সকলকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার নির্দেশনা দিয়ে বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে অন্যত্র না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এই যে অন্যত্র পালিয়ে গেলেন না বঙ্গবন্ধু এবং নিশ্চিত মৃত্যুরঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী বীরের মতো গ্রেপ্তার হলেন, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এটাকে বলে বেড়াচ্ছেন পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ। অথচ ইতিহাস প্রমাণ করেছে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়ার সিদ্ধান্তই ছিল সঠিক। বঙ্গবন্ধু যদি পালিয়ে যেতেন বা ২৫ মার্চ রাতের আগে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন, তাহলে হানাদার পাকিস্তান ও তাদের দোসর আমেরিকা, চীন, সৌদি আরব বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করত। একাত্তরের ৯ মাসে পাকিস্তান ও তাদের দোসররা সাড়ে ৭ কোটি বাঙালির মুক্তি সংগ্রামকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যুদ্ধ’ প্রমাণ করতে কম চেষ্টা করেনি। কিন্তু দূরদর্শী বঙ্গবন্ধুর পালিয়ে না যাওয়ার সঠিক সিদ্ধান্তের কারণেই সে সময় ভারত, রাশিয়াসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের অকুণ্ঠ সমর্থন, সহযোগিতা লাভ করেছে বাংলাদেশ। একথা তো স্বীকার করতেই হবে যে, আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন না হলে ’৭১-এ বাংলাদেশ ৯ মাসে স্বাধীনতা লাভ করতে সমর্থ হতো না। আবার বঙ্গবন্ধু যদি সে সময় ভারতে অবস্থান করে প্রবাসী সরকার পরিচালনা করতেন, তখন স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বলে বেড়াত শেখ মুজিব জনগণকে পাকিস্তানিদের তোপের মুখে রেখে নিজে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন।
২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়ার সিদ্ধান্ত যে কত সঠিক ছিল তার প্রমাণ হলো বায়াফ্রা। সেই কয়েক যুগ আগে স্বাধীনতা ঘোষণা করে জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন না পাওয়াতে বায়াফ্রা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। তাছাড়া জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত রয়েছেÑকোনো রাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো গোষ্ঠীকে সমর্থন করতে পারবে না। পাকিস্তান ’৭১-এ মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধ’ হিসেবে প্রমাণ করতে। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণে তারা তখন সফল হয়নি। উল্লেখ্য, গত ছয় দশকে একমাত্র বাংলাদেশই সংগ্রাম করে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান যথার্থই বলেছেন, একাত্তরের ৯ মাসে বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও তিনি ছিলেন বাঙালির নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে। বঙ্গবন্ধুই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা। তাঁর নামেই স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। ’৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য যে প্রবাসী সরকার গঠিত হয় সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সবাই জানতেন, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি। তিনি জীবিত না মৃত, এটাও তখন অজানা। তারপরও শেখ মুজিবের মতো জননন্দিত, সুযোগ্য এবং স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য অন্য কোনো দ্বিতীয় নেতা সে সময় আওয়ামী লীগে বা বাংলাদেশে ছিল না।
’৭১-এর ২৫ মার্চ রাতের ভয়াবহ হামলার পর ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠন করার সকল কৃতিত্ব না হলেও অন্তত সিংহভাগ কৃতিত্বই ছিল তাজউদ্দীন আহমদের। দেশি-বিদেশি অসংখ্য সাংবাদিক ও বহু নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কর্নেল এমএজি ওসমানী (অব.)কে প্রধান সেনাপতি করে সরকার গঠন করা হয়। এর আগে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচিত এমএনএ ও এমপিএগণ স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন প্রধান সেনাপতি ওসমানী ও মাহবুব উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একদল তরুণ সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা। অথচ গত সাড়ে চার দশক ধরে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতকারী একদল বিকৃতমনা মানুষ প্রধান সেনাপতি ওসমানীকেই সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বলে অপপ্রচার করে আসছে। শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের রাজধানীর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামে ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র রচনা করেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অন্যতম তৎকালীন হুইপ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মুজিবনগর সরকার গঠন এবং শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে তাজউদ্দীন আহমদও অন্যদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দখলকৃত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মেহেরপুরে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করে মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘পাকিস্তানি কর্তৃপরে বিশ্বাসঘাতকতা ও অন্যান্য অনুরূপ ঘটনাবলির প্রেেিত, বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলার মানুষের ন্যায়সঙ্গত স্বাধিকারের জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।’ ঐতিহাসিক সেই ঘোষণাপত্রে আরো লেখা হয়, ‘আমরা, যারা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ওপর যে গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করেছে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলনে আমরা একটি গণপরিষদ গঠন করলাম এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এবং বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সাম্য, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার জন্য, বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি ঘোষণা করছি এবং যে পর্যন্ত না একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয় সে পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকবেন এবং প্রেসিডেন্ট, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক থাকবেন এবং তিনি রাষ্ট্রের সমুদয় নির্বাহী ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য মতাসহ মতা প্রদানের মতা প্রয়োগ করতে পারবেন।… আমরা আরো ঘোষণা করছি যে, স্বাধীনতার এই ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হতে কার্যকর হবে।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আরো বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন।’ উল্লেখ্য, পাকিস্তানি বাহিনীর পৈশাচিক হামলার কয়েক ঘণ্টা পরেই ’৭১-এর ২৭ মার্চ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা ত্যাগ করেন। ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাাৎ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেন। কয়েকদিনের মাথায় দ্বিতীয়বার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাাতের পর ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে নবজাত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন। বেতারে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের ভাষণের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বিশ্ববাসী জানতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত মুজিবনগর সরকার কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার হিসেবেই যুদ্ধ পরিচালনা করে। এই সরকারের দ্বারা পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্বাধীনতা যুদ্ধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিরা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রধান সেনাপতি ওসমানী, উপ-প্রধান সেনাপতি এ কে খোন্দকার, চিফ অব স্টাফ আবদুর রবের পরিচালনায় মুজিবনগর সরকার সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করে।
তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের সফল নেতৃত্বে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাঙালি জাতি বিজয় অর্জন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকারের অমূল্য অবদান জাতি চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক দিনে মুজিবনগর সরকারের নেতৃবৃন্দসহ মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।