কলাম

মেগা উন্নয়নের মহীসোপানে বাংলাদেশ

ড. কাজী এরতেজা হাসান : স্বাধীনতা-পরবর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা আজ উন্নয়ন ও অগ্রগতির যে মহাসড়কে উঠে এসেছি, তা কোনো অদৃশ্য বাস্তবতা নয়, এটা দৃশ্যমান বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের যত সাফল্য একের পর এক ধরা দিচ্ছে তা এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও দেখা যায়নি। উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝিতেই বিশ্ব অর্থনীতিতে আগামী বিশ্বের বিশেষ বিশেষ েেত্র নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে বাংলাদেশ। এটা এখন দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের পরিসংখ্যান দিয়েই বলা যায়। ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইসওয়াটারহাউসকুপারস (পিডব্লিউসি)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, আগামী ২০৫০ সালে প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষ ৩ দেশের একটি হবে বাংলাদেশ। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসছে এমন চিত্তাকর্ষক সচিত্র পরিসংখ্যান। বছর কয়েক আগেও যেখানে বহির্বিশ্বের দেশগুলো আমাদের দেশটিতে বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করে আসছিল, তারাই এখন আমাদের এখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, চীন, জাপান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে উৎসাহ দেখাচ্ছে। বলা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে দেশটিতে চলছে ইতিহাসের কালোত্তীর্ণ যুগ। এরই মধ্যে দেশের যোগাযোগ খাতের ৬ মেগা প্রকল্পসহ ১৪টি বৃহৎ প্রকল্পে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশটিতে যে আমূল পরিবর্তন আসছে তাতে আগামীতে বাংলাদেশের এক বিস্ময়কর নতুন উত্থান দেখা যাবে। পরিবর্তনের এ হাওয়া বইছে এখন গোটা দেশব্যাপী। কোথায় নেই আজ সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া। ইতোমধ্যেই বাস্তবায়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া পদ্মা সেতুসহ একাধিক প্রকল্পের আশাব্যঞ্জক অগ্রগতিতে রীতিমতো চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধায় মাশুল ধার্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম উন্নয়নে। বিশেষ করে উন্নয়নের এ প্রকল্পসমূহে রয়েছে, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আওতায় ভারতের সঙ্গে করা মোটর ভেহিক্যাল এগ্রিমেন্টের অগ্রগতি, চট্টগ্রাম ও মংলা পোর্টের সমতা বৃদ্ধি, কাস্টমস সুবিধা, গৌহাটি-শিলং-সিলেট-ঢাকা বাস সার্ভিস চালু, চট্টগ্রাম-আখাউড়া-আগরতলা পর্যন্ত ট্রান্সপোর্ট সুবিধা এবং বিপরীতে মাশুল কত হবে, বাংলাদেশ-শিলিগুড়ি-ভুটান বাস সার্ভিস চালু এবং খুলনা-দিনাজপুর-বুড়িমারী-দার্জিলিং-ভুটানের মধ্যে সরাসরি বাস সার্ভিস চালু, রাজশাহী-মালদহ বাস চালু এবং খুলনা-কলকাতা ট্রেন সার্ভিস চালুর বিষয়টি অন্যতম। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে বর্তমান বিশ্বে ইন্টার কানেক্টিভিটির কোনো বিকল্প নেই। সারা বিশ্বই এখন এ সুবিধা নিতে এগিয়ে আসছে। আন্তঃবাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সরকার ভারত, চীন, রাশিয়া, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে করা বিনিয়োগ ও বাণিজ্য চুক্তিগুলোর বর্তমান অবস্থা, বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে পদপে নিয়েছে। আমরা দেখছি, কিভাবে জোর পদেেপ এগিয়ে চলছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ। পাশাপাশি মেট্রোরেলের লাইন-৬ এর নির্মাণ কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। এর সঙ্গে সমীা পর্যায়ে রয়েছে মেট্রোরেলের আরও কয়েকটি রুট। যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হওয়ায় দেশবাসী এখন থেকেই অপোর প্রহর গুনছে কবে থেকে দেশ যানজটের অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে। বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ যেভাবে এগিয়ে চলছে তাও সন্তোষজনক। চীন-বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্প কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ কাজও উদ্বোধন হয়েছে গত বছরের অক্টোবরে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে চীন আগ্রহ প্রকাশ করায় কাক্সিক্ষত প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ শুরুর প্রাথমিক পর্যায় শেষ হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান সহযোগী হিসেবে ইতোমধ্যেই ভারত, আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্য সব রাষ্ট্রকে যেন টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে বন্ধুরাষ্ট্র-চীন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রজেক্টেই আছে এখন চীন। যে দেশটি এক সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতিই দিতে চায়নি, সে দেশটিই যেন আজ তাদের সেই ভুলের কাফফারা দিতে প্রস্তুত। এরই মধ্যে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইতোমধ্যেই তারা বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করেছে বিশ্বের অত্যাধুনিক দুটো সাবমেরিন। যার মাধ্যমে দেশ আধুনিক সামরিক শক্তির যুগে প্রবেশ করতে সমর্থ হলো। এছাড়া আরেক পরাশক্তি রাশিয়ার সহযোগিতায় গড়ে উঠছে পাবনার রূপপুরে দেশের একমাত্র উচ্চ মতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পদ্মার চরে নির্মিত হতে যাচ্ছে বিশাল বাজেটের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। এছাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা বন্দর ও কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় হতে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর।
উন্নয়নের এ ধারায় আরো আছে কক্সবাজার-দোহাজারী-গুনধুম রেলপথ, পদ্মা রেলসেতু সংযোগ, বাগেরহাটের রামপালে মৈত্রী সুপার থারমাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এছাড়া দেশের গ্যাস সংকট নিরসনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উদ্দেশ্যে মহেশখালীর উপকূলে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের মতাসম্পন্ন একটি এলএনজি টার্মিনাল হতে যাচ্ছে। টার্মিনাল থেকে মূল ভূখ-ে গ্যাস আনতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন। দেশের এ দৃশ্যমান উন্নয়নের সুফল পাচ্ছে যেমন জনগণ তেমনি তার সুফল পাবে আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও। কেননা এ উন্নয়নের সকল কৃতিত্ব যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের। সম্মুখ থেকেই যার সফল পরিচালনায় রয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আর উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা ধরে রাখতেই আগামী নেতৃত্বেও অন্য কেউ নয়, শেখ হাসিনাই থাকছেনÑএটাই অনেকের মতো আমাদের কাছেও প্রত্যাশিত।