কলাম

সদ্যসমাপ্ত আইপিইউ সম্মেলন ও সংসদীয় কূটনীতি

ফনিন্দ্র সরকার : ভালোয় ভালোয় সমাপ্ত হলো ১৩৬তম ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মেলন। ৫ দিনব্যাপী (১-৫ এপ্রিল ২০১৭) বর্ণাঢ্য এ আয়োজনের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য বলেই কলম ধরেছি। বাংলাদেশে এই প্রথম এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন নির্বিঘেœ সমাপ্ত হওয়ায় বিদেশি অতিথিরা এ দেশের সমতার প্রশংসা করছেন এবং অভিভূত হয়েছেন। বিশ্বের ১৭২টি দেশের পার্লামেন্টারি এ সংগঠনের ১৩২টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। বিভিন্ন দেশের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকারসহ প্রায় ১ হাজার ৪০০ ডেলিগেট সম্মেলনে অংশ নিয়ে গোটা অনুষ্ঠানকে সাফল্যম-িত করেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলÑসমাজের বৈষম্য নিরসনের মাধ্যমে সবার মর্যাদা ও মঙ্গল সাধন। বিষয়টি সভ্যতা বিকাশের েেত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জন্য খুবই গৌরব ও অহঙ্কারের বিষয় যে, আমাদের দেশের পার্লামেন্টের একজন সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী আইপিইউর প্রেসিডেন্ট। তিনি কিছুদিন আগে সর্বসম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সানুগ্রহে আমাদের দেশে এ ধরনের আয়োজন করা সম্ভব হয়। সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আমাদের রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করতে ৫ দফা ঢাকা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত আন্তর্জাতিক মানের এ সম্মেলনের ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংসদীয় কূটনীতির ত্রেকে আরও প্রসারিত ও বহুমাত্রিকতায় পর্যবসিতকরণে এ ধরনের সম্মেলন অপরিহার্য।
উল্লেখ্য, পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের শাসন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এক সময় গোটা বিশ্বই ব্রিটিশরাজরা শাসন করেছে। একান্তই গোষ্ঠী ও ব্যক্তি স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে স্থানভেদে নানারকম শাসন ও বিচার ব্যবস্থা চালু করেন। কালের প্রবাহে তাদের শাসন-শোষণ ভেঙে যায়। বিভিন্ন দেশের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে উঠতে থাকলে জন্ম নিতে থাকে একেকটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। তারপরও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক চর্চা কোনো কোনো রাষ্ট্রে অব্যাহত থাকে। ফলে স্বাধীন কোনো রাষ্ট্রও মোড়লগিরির কবলে পড়লে সাধারণ মানুষের অধিকার ুণœ হয়। জাতিভেদে, কখনো ভাষাভেদে আন্দোলন সৃষ্টি হয়, যা এখনো বিশ্বের অনেক দেশেই অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রথমে ব্রিটিশ, পরবর্তীকালে পাকিস্তানি শাসনের কবল থেকে মুক্তি লাভ করলেও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলন এখনো চলমান রয়েছে। আইপিইউর সম্মেলনের যে মর্মার্থ আমরা ল্য করলাম তা আমাদের অনুরণিত করলেও বাস্তবিক অর্থে কতটা সফল হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা বাংলাদেশে যারা পার্লামেন্ট মেম্বার তাদের একটি বৃহৎ অংশই সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন না। অধিকাংশের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তারাই বারবার সংসদ সদস্যের পদ অলঙ্কৃত করে আসছেন। গানের শিল্পী, লুটেরা ধনিক ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাজনীতিবিদ সেজে প্রকৃত রাজনীতিবিদদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করেছেন। এসব কারণেই দেশে অর্থনৈতিক সীমাহীন বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। এ বৈষম্যই গণতন্ত্র উত্তরণে প্রকৃত বাধা হয়ে আছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে কত সময় লাগবে তা কেউ বলতে পারবে না। তারপরও আমরা আশাবাদী। এ সম্মেলন আমাদের প্রত্যাশাকে বিশ্বাসের জায়গা দেখিয়ে দিয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের শিা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য অনন্য এক পরিচয়ে পরিচিতি লাভ করেছে। আইপিইউ কী এটা বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছিল অপরিচিত। অথচ এটা অনেক পুরনো সংগঠন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ এই সংগঠনের সদস্যপদ লাভ করে। আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সংসদীয় কূটনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির মেলবন্ধন প্রতিস্থাপনের ল্েয এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয় ও বিকাশমান সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে হলে এ ধরনের সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিকল্প নেই। তার উত্তরসূরি শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরিতে যেসব কর্মসূচি পালন করা দরকার তার অংশ হিসেবেই বাংলাদেশের মাটিতে এ ধরনের সম্মেলনের আয়োজন। সংসদ ভবনের দণি প্লাজায় আইপিইউর সম্মেলন উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনে আইপিইউর বিভিন্ন কমিটিতে বেশ কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেমন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের হস্তপে বন্ধের প্রস্তাব এবং কয়েকটি দেশের দুর্ভিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রস্তাব। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমাতে মানবাধিকার সুরায় আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণে নিশ্চিত বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব। অন্যদিকে ৫ দফা ঢাকা ঘোষণায় রয়েছে সব জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ, শিা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ। ুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা, শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করা, নারী-পুরুষ শ্রমিক মজুরি বৈষম্য কমানো ইত্যাদি। বিভিন্ন অধিবেশনে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নিয়ে আলোচনা হয়। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ কোনো দেশ এবং বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়। এটাকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের ওপর যে পরিবেশগত কু-প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে, এ থেকে বেরিয়ে আসতে এক প্রক্রিয়া অবলম্বন করা উচিত, তা বিভিন্ন বক্তার আলোচনায় উঠে আসে।
সমাপ্তি অধিবেশনে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত করতে তরুণ নেতৃত্বকে আহ্বান জানানো হয়। সংসদে তরুণদের বেশি করে সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেয়া হয়। কেননা তারুণ্যের শক্তি ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। শিতি মেধাবী তরুণরা যাতে সংসদ সদস্য হয়ে আসতে পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশের বেশি তরুণ। এই তরুণদের দেশ ও জাতির কল্যাণে জেগে উঠতে হবে। পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধানে তরুণরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে সম। দুর্গন্ধময় রাজনীতিকে স্বচ্ছ করতে তরুণ যুবকদের বিকল্প নেই।
আইপিইউ সম্মেলনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন। বিশ্বের সব দেশেরই সঠিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করতে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান রাখা হয়। গণতন্ত্র যাতে অন্য কোনো তন্ত্রের কাছে বন্দি হয়ে না যায় তার ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখা বর্তমান বাস্তবতায় খুবই জরুরি। গণতান্ত্রিক যাত্রায় রাজনৈতিক নেতাদের খাই খাই স্বভাবের পরিবর্তনও অপরিহার্য। যে মূলমন্ত্রের ত্রে ধরে আইপিইউ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো সেই মন্ত্রে দীতি হয়ে রাজনীতিবিদদের কাজ করতে হবে। তা না করতে পারলে এই সম্মেলন হয়ে যাবে অর্থহীন। সম্মেলনে জনগণের যে টাকা খরচ হয়েছে তা বৃহৎ তিতে পরিণত হবে, যা কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়। তাই সফল সম্মেলনের বীজমন্ত্র যেন পৌঁছে যায় প্রতিটি গণতন্ত্রমনা মানুষের হৃদয় মন্দিরে।