প্রতিবেদন

সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে উৎসবমুখর জনতার ভিড়

নিজস্ব প্রতিবেদক : সামরিক ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান ও ট্যাঙ্কবিধ্বংসী স্বয়ংক্রিয় কামান, অস্ত্র-গোলাবারুদ সব কিছুর সমাবেশ ঘটেছে এক জায়গায়। যুদ্ধেেত্র ব্যবহৃত এসব সরঞ্জামের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ ছবি তুলছেন। উৎসুক কেউ আবার এগুলোর ব্যবহার জানতে সমরাস্ত্রের পাশে দাঁড়ানো সৈনিকদের প্রশ্ন করছেন। সৈনিকেরাও কৌতূহল মেটাচ্ছেন হাসিমুখে। ২৩ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে উৎসবমুখর জনতার ভিড় দেখে সৈনিকরাও উদ্বেলিত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলে ২২ মার্চ রাজধানীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর সম্মিলিত সমরাস্ত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে ফিতাকেটে ও বেলুন উড়িয়ে ৭ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান প্রদর্শনী স্থানের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। এ সময় প্যারেড স্কয়ারে প্যারাট্রুপাররা সফলভাবে অবতরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন বাহিনীর বিভিন্ন স্টল ও প্যাভেলিয়ন পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন হালকা ও ভারী সমরাস্ত্র প্রত্য করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান ও সাহসিকতাপূর্ণ ঘটনা প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ৮ বছরে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন কর্মকা- স্টলে স্থান পেয়েছে। পরিদর্শনকালে বিভিন্ন স্টলে স্থান পাওয়া সমরাস্ত্র সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় মিগ-২৯ এবং মিগ-২১ যুদ্ধবিমানের বর্ণাঢ্য অ্যারোবেটিক শো প্রত্য করেন। প্রধানমন্ত্রী পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং অন্য শিল্পীদের পরিবেশিত সংগীত ও নৃত্য উপভোগ করেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে এসে পৌঁছলে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লে. জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান তাঁকে স্বাগত জানান।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২৫ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলে শেরে বাংলা নগর জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমরাস্ত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। রাষ্ট্রপতির প্রদর্শনীস্থলে পৌঁছার পর পর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কয়েকটি যুদ্ধবিমান প্রদর্শনীস্থলের ওপর দিয়ে উড়ে যায় এবং প্যারাট্রুপাররা সফলভাবে প্রদর্শনীস্থলে অবতরণ করেন। রাষ্ট্রপতি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান ও সাহসিকতার স্মারক প্রদর্শিত হচ্ছে এমন স্টলসমূহ পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে রাষ্ট্রপতি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, তিন বাহিনী তাদের নিয়মিত কর্মকা-ের পাশাপাশি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও অবদান রেখে চলেছে।
৭ দিনের সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর বিভিন্ন ধরনের সমরাস্ত্র জনসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। ২৩, ২৬, ২৭ ও ২৯ মার্চ প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এবং ২৪ মার্চ সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। ২৯ মার্চ দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সাধারণের সঙ্গে সঙ্গে স্কুল-কলেজের শিার্থীদের জন্য প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকে।
সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস, দেশ ও জাতি গঠনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা, জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম, বাহিনীর আধুনিকায়ন, বাহিনীর ব্যবহৃত সমরাস্ত্র সম্পর্কে জনসাধারণকে ধারণা দেয়া এবং এই পেশার প্রতি তরুণদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে এ প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছে বলে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে ৪৮টি স্টল রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩২টি, নৌবাহিনীর ৬টি এবং বিমান বাহিনীর ৬টি স্টল রয়েছে। এছাড়া মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ, দেশগঠন এবং জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকাসহ সাম্প্রতিক আধুনিকায়নের ওপর সম্মিলিত স্টল রয়েছে ৪টি।
প্রদর্শনীতে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ফাই পাস্ট, প্যারা ড্রপিং, র‌্যাপলিং, আন আর্মড কমব্যাট, নৌবাহিনীর সোয়াডস, সম্মিলিত ব্যান্ড ও অর্কেস্ট্রা, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনী, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা বর্ণনা ইত্যাদি। প্রদর্শনীতে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন প্রকার আধুনিক সমরাস্ত্র, সরঞ্জাম, প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের আধুনিক সরঞ্জামাদি, নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ বানৌজা বঙ্গবন্ধু ও সদ্য সংযোজিত সাবমেরিনের রেপ্লিকাসহ বিমান বাহিনীর বিভিন্ন প্রকার বিমান ও আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জামাদি প্রদর্শিত হয়।
সাঁজোয়া স্টলের সামনে লেখা রয়েছে : প্রাণ দেবো, মান নয়। সেখানে আধুনিক ট্যাঙ্ক এমবিটি-২০০, ট্যাঙ্ক-৫৯ জি-দুর্জয়, ট্যাঙ্ক-৬৯ জি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এছাড়া ফিল্ড আর্টিলারি প্রদর্শন করা হচ্ছে।
সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশন যুদ্ধেেত্রর চূড়ান্তকারী দল। আরেকটি সেনাবাহিনীর ভূগর্ভস্থ কমান্ডিং অফিস। তাদের নানা যুদ্ধ সরঞ্জাম প্রদর্শন হচ্ছে প্রদর্শনীতে। ইঞ্জিনিয়ার্স কোর যুদ্ধ জাহাজ কিভাবে উদ্ধার ও মেরামত করবে সেটা দেখাচ্ছে। ইলেট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর যুদ্ধেেত্র গাড়ি নষ্ট হলে কিভাবে ঠিক করবে সেটা দেখাচ্ছে। এছাড়া এএসপিটিএস প্রদর্শনীতে দেখানো হচ্ছে। এটি হচ্ছে অস্ত্রবিহীন যুদ্ধ। আত্মরার শেষ উপায়। অন্যদিকে সমরাস্ত্র তৈরির কারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থার ৮৬ সিগন্যাল বিষয় প্রদর্শনীতে থাকছে।
এবারের সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে প্রথমবারের মতো গণচীন থেকে কেনা সাবমেরিন জয়যাত্রা এবং নবযাত্রার মডেল উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ব্যবহৃত বিভিন্ন নেভিগেশনাল ইকুইপমেন্ট, আন্ডার ওয়াটার ও এভাব ওয়াটার ইকুইপমেন্ট, নৌবাহিনীতে ব্যবহৃত গান ও মিসাইলের মডেল, নৌবাহিনীর পোশাক, জাহাজ মেরামতের ডকিং পদ্ধতির মডেল এবং আরএএস’র একটি মডেল দর্শনার্থীদের প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। নৌবাহিনী এখন ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। গত ৮ বছরে নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে ২৩টি যুদ্ধ জাহাজ। এর মধ্যে ৫টি নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে খুলনা শিপ ইয়ার্ডে নির্মিত হয়েছে।
এ প্রদর্শনীতে বিমান বাহিনীর প্রশিণ সামগ্রী স্টলে বিভিন্ন ধরনের মডেল যেমন বিমান, হেলিকপ্টার, রাডার, বিমানবন্দর ও টাওয়ার এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি প্রদর্শিত হচ্ছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ স্টল, আকাশ প্রতিরা স্টল, ফাইটার বিমান, সমরাস্ত্র আলোকচিত্র স্টল, তথ্য স্টল, বিমান, হেলিকপ্টার রণাবেণ স্টল থাকছে। সব স্টলেই দেখা যাচ্ছে উৎসুক মানুষের ভিড়। সম্মিলিত জনতার ভিড়ে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে সমরাস্ত্র প্রদর্শনী প্রাঙ্গণ।