প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

১৭ এপ্রিল যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হলো ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কাজে লাগিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে রুখে দিয়ে ুধা-দারিদ্র্যমুক্ত অসাম্প্রদায়িক উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ১৭ এপ্রিল রাজধানীসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হয়েছে ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। দেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ উপলে ঐতিহাসিক এ দিনটি স্মরণে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি স্মৃতিবিজড়িত মেহেরপুরের মুজিবনগরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননেও জাতীয়ভাবে পালিত হয় নানা কর্মসূচি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন এই ১৭ এপ্রিল। ৪৬ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। রচিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস। এর পূর্বে ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। মুজিবনগর দিবস উপলে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের জনতার ঢল নামে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে দলীয় প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছুণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ সারিবদ্ধভাবে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সকাল সাড়ে ৭টায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বনানী কবরস্থানে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
২৬ মার্চ ১৯৭১ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণার ৩ সপ্তাহ পর বৈদ্যনাথতলা নামে পরিচিত ওই বিশাল আমবাগান এলাকাকেই পরে ‘মুজিবনগর’ নাম দিয়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশকে পাক হানাদার বাহিনীর দখলমুক্ত করতে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুজিবনগর সরকারের দ নেতৃত্ব ও পরিচালনায় ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিণতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে বাঙালির নিজস্ব আবাসভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। একাত্তরের ১৭ এপ্রিলের সেই মাহেন্দ্রণে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম অন্য নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে সকাল ৯টার দিকে বৈদ্যনাথতলায় পৌঁছান। গ্রামবাসীর পাশাপাশি দেশি-বিদেশি শতাধিক সাংবাদিক এবং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও আসেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক মার্ক টালি ও পিটার হেস। বহু প্রতীতি শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান শুরু হয় বেলা ১১টায়। স্থানীয় শিল্পীদের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী এবং ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে মন্ত্রিসভার সদস্য করে স্বাধীন বাংলা অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে করা হয় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। এ দিন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ ও অনুমোদন হয়। আওয়ামী লীগের চিফ হুইপ দিনাজপুরের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মো. ইউসুফ আলী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান। সেদিনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকের উপস্থিতিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ ও শপথ অনুষ্ঠান সফলভাবে শেষ হয়েছিল মেহেরপুর ও মুজিবনগরের এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর সহযোগিতায়। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বিপ্লবী সরকারের মন্ত্রিপরিষদের আনুষ্ঠানিক শপথ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়াও মুক্তিবাহিনীর কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়।
মুজিবনগর সরকার গঠনের প্রাক্কালে যে ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়েছিল তার ৬ষ্ঠ অনুচ্ছেদে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি জনগণের অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখ-তা ও মর্যাদা রার জন্য বাংলার জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান’। ঘোষণাপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, এতদ্বারা আমরা আরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদেও অধিষ্ঠিত থাকবেন। রাষ্ট্রপ্রধানই সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের মতার অধিকারী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাহেন্দ্রণটি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস আছে। আছে বীরোচিত সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের অজস্র উদাহরণ। মোটা দাগে বলা যায়Ñ’৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আশাহত বাঙালির যেই আত্মজাগরণ ও নবযাত্রার শুভ সূচনা হয়েছিল; ’৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন; ’৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন; ’৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান ও ’৭০’র নির্বাচনের মতো নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে তা-ই স্বাধীনতার মহাসমুদ্রে এসে আছড়ে পড়েছিল। ’৭১’র ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশ্ববাসী তার প্রতিধ্বনি শুনেছে। ২৫ মার্চের পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতম গণহত্যাও স্বাধীনতার মন্ত্রে জেগে ওঠা জনসমুদ্রের সেই গর্জনকে স্তব্ধ করতে পারেনি। মুজিবনগর সরকার ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ধারাবাহিকতা বা অনিবার্য পরিণতি মাত্র। এই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে ঘোষিত ও জারিকৃত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’ সেই সরকারের যৌক্তিকতা ও রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল সুস্পষ্টভাবে। স্বাধীনতার প্রায় অসম্ভব স্বপ্নকে সফল করার ল্েয জাতির এই যে অপ্রতিরোধ্য যাত্রা ও জাগরণ হাজার বছরের ইতিহাসে যার তুলনা বিরল তা সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জাদুকরী নেতৃত্বের কারণে। এমনকি তিনি যখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন, তখনও তাঁর নামেই পরিচালিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। তিনিই ছিলেন সমগ্র জাতির সকল আশা-আকাক্সা, সাহস ও প্রেরণার উৎস। এই কারণেই বৈদ্যনাথতলা রূপান্তরিত হয়েছিল মুজিবনগরে।