সাহিত্য

আমিনুল ইসলামের কবিতায় বঙ্গবন্ধু

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস : বাংলাদেশের কবিতায় অভিব্যক্ত হয়েছে মহিমান্বিত ও মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু। সাড়ে ৭ কোটি বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নিষ্ঠুরতা ও নির্যাতন থেকে মুক্ত করেন। স্বাধীন দেশ তারই অমরকীর্তি। জাতির জনক বাংলার মানুষকে সাহসী করে তুলেছিলেন। নিজেদের অধিকার আদায় করে নেবার জন্য পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৪৮ থেকে ধীরে ধীরে তার বিকাশ, একাধিকবার তিনি বন্দিত্ববরণ করেছেন; নির্যাতন নিপীড়ন চলেছে তাঁর ওপর। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম ঘটনার পর বঙ্গবন্ধুর মহিমাকে ভাস্বর ও দ্যুতিময় করেছেন একাধিক কবি। কবিতায় বঙ্গবন্ধুর নাম প্রথম উচ্চারিত হয় নির্মলেন্দু গুণের কবিতায়। তাঁর একাধিক কবিতা কিংবা বলা চলে সবচেয়ে বেশি কবিতায় বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে। মুজিবকে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৬৭ সালের ১২ নভেম্বর প্রথম তিনি কবিতা লেখেন ‘প্রচ্ছদের জন্য’ (পরে এটি ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ কাব্যগ্রন্থে ‘স্বদেশের মুখ শেফালি পাতায়’ নামে অন্তর্ভুক্ত); তখন শেখ মুজিব কারাবন্দি। ১৯৬৯ সালে রচিত ‘হুলিয়া’ কবিতায় নির্মলেন্দু গুণ তাঁকে নায়কের আসন দান করেন। এছাড়া সুফিয়া কামালের ‘ডাকিছে তোমারে’, সানাউল হকের ‘লোকান্তর তিনি আত্মদানে, আবুল হোসেনের ‘শিকারের কবিতা’, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ‘কোন ছবিগুলি’, শামসুর রাহমানের ‘যাঁর মাথায় ইতিহাসের জ্যোতির্বলয়’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘বীর নেই আছে শহীদ’, কায়সুল হকের ‘সমষ্টির স্বপ্নের নির্মাতা’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘পিতা তোমার কথা এখন এখানে আর’, দিলওয়ারের ‘বিতর্কিত এই গ্রহে’, বেলাল চৌধুরীর ‘রক্তমাখা চরমপত্র’, মহাদেব সাহার ‘আমি কি বলতে পেরেছিলাম’, হেলাল হাফিজের ‘নাম ভূমিকায়’, শিহাব সরকারের ‘পিতা’, অসীম সাহার ‘প্রতিশোধ’, সিকদার আমিনুল হকের ‘আত্মজের প্রতি’, আসাদ চৌধুরীর ‘দিয়েছিলো অসীম আকাশ’, আবু কায়সারের ‘সূর্যের অনল’, শান্তিময় বিশ্বাসের ‘ঝড় আর মেঘের সমান’, আখতার হুসেনের ‘আজ থেকে তুই নিজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর’, মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘যিসাস মুজিব’, রবীন্দ্র গোপের ‘আমার বুকে অর্ধনমিত পতাকা’, নাসির আহমেদের ‘গুলিবিদ্ধ বাংলাদেশ’, কামাল চৌধুরীর ‘এখনো দাঁড়িয়ে ভাই’, ত্রিদিব দস্তিদারের ‘বাঙালির ডাক নাম’, মিনার মনসুরের ‘কেউ কী এমন করে চলে যায়’ প্রভৃতি কবিতা থেকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা যায়। কেন তিনি জাতির জনক, কেন তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি সেই প্রসঙ্গও কবিরা তুলে ধরেছেন। আমিনুর রহমান সুলতানের ‘বাংলাদেশের জনক তুমি’ এবং শামীম রেজার ‘ভূর্জপাতায় লিখি নাম তার’ এ ধারারই কবিতা। আবিদ আনোয়ার ‘প্রতিরোধ’ কবিতায় ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও বঙ্গবন্ধুকে জেলে বন্দি করার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তবে কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন কবি আমিনুল ইসলাম।
২.
আমিনুল ইসলাম দীর্ঘদিন যাবৎ কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ এবং সংগীত বিষয়ক নিবন্ধ লিখছেন। তবে তিনি প্রধানত কবি হিসেবে বেশি পরিচিত। ‘প্রণয়ী নদীর কাছে’ তাঁর গত বছর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। তবে ২০০২ সাল থেকে নিয়মিত কবিতার বই প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর। ‘তন্ত্র থেকে দূরে’ (২০০২), ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ (২০০৪), ‘শেষ হেমন্তের জোছনা’ (২০০৮), ‘কুয়াশার বর্ণমালা’ (২০০৯), ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ (২০১০), ‘স্বপ্নের হালখাতা’ (২০১১), ‘প্রেমসমগ্র’ (২০১১), ‘জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার’ (২০১২), ‘শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ’ (২০১৩), ‘কবিতাসমগ্র’ (২০১৩), ‘জোছনার রাত বেদনার বেহালা’ (২০১৪), ‘আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট’ (২০১৫)। কাব্যের বিচিত্র সুর, সংগীত ও ব্যঞ্জনার পরিসরের বাইরেও আমিনুল ইসলামের ছড়া গ্রন্থ ‘দাদুর বাড়ি’ (২০০৮), ‘ফাগুন এলো শহরে’ (২০১২), ‘রেলের গাড়ি লিচুর দেশ’ (২০১৫) এবং প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘বিশ্বায়ন বাংলা কবিতা ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১০) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনা। সরকারি চাকরিজীবী হলেও আমিনুল ইসলামের একমাত্র টার্গেট কবিতা। তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন সাহিত্যচর্চায় এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন। আমিনুল ইসলামের একাধিক কবিতায় বঙ্গবন্ধু উদ্ভাসিত হয়েছেন। তবে তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতায় জাতির পিতা সমুজ্জ্বল। নব্বইয়ের পর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিচার নিয়ে যখন বিচারকদের বিব্রতকরণ ও শেখ হাসিনা, শেখ রেহানার জীবন হুমকির সম্মুখীন তখনও তিনি পীড়িত হয়েছেন। বিশেষত সেই সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নীরব ভূমিকা দেখে মর্মাহত হন তিনি। ‘আমার মুক্তিযোদ্ধা হতে পারা না পারার গল্প’ (জলচিঠি নীল স্বপ্নের দুয়ার) কবিতায় ৭ মার্চের ভাষণের প্রসঙ্গ আছে, দেখেছেন মেঘের মিনার ছোঁয়া আঙুলের ইশারা। ‘উত্তরের একাত্তর’ কবিতায় তির্যকভাবে উপস্থাপন করেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার নিয়ে ষড়যন্ত্র ও বিচারকদের ভূমিকার নেতিবাচকতা। অবশ্য কবির কাছে ৭ মার্চের ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয়। তিনি বঙ্গবন্ধু ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। দেখিয়েছেন নজরুল যেমন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা ১৯২২ সালে দাবি করেছিলেন তেমনি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কণ্ঠে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ডাক এসেছিল। আমিনুল ইসলামের কাছে বিদ্রোহী নজরুলের রাজনৈতিক সংস্করণ হলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণ সেই বিদ্রোহী কবিতারই আরেক রূপ। ‘জয় বাংলা’ শব্দটিও বঙ্গবন্ধু নজরুল থেকে পেয়েছিলেন। আমিনুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতায় লিখেছেন ‘আঙুল ছুঁয়েছে আকাশ।’ (প্রণয়ী নদীর কাছে) এ কবিতায় রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অবাধ সাংস্কৃতিক বিকাশ এবং সর্বশ্রেণির মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা আছে।
৩.
মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু একীভূত আমিনুল ইসলামের কবিতায়। মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য কেবল নয় তিনি নিজে দেশের ইতিহাস বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের যথার্থ রাস্তায় তুলে এনেছেন কবিতার মাধ্যমে। আমিনুল ইসলামের কবিতায় প্রতীক, চিত্রকল্প বৈচিত্র্যময় ও রহস্যখচিত। তিনি প্রতীক নির্মাণ করেছেন, ইতিহাস থেকে, পূর্বসূরি কবিদের প্রকাশভঙ্গির সূত্র ধরে কখনো প্রাণিবাচক বিশেষ্য শব্দ দিয়ে, বৃক্ষের নামবাচক শব্দ দিয়ে, বিশেষণ দিয়ে এবং কখনো কখনো রঙের ব্যবহারের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত কবিতায় তারই সাক্ষ্য রয়েছে। তবে তিনি সাহসী উচ্চারণে কাব্য শরীর নির্মাণে বেশি আগ্রহী। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচারের দীর্ঘসূত্রতার প্রসঙ্গে রচিত নিচে উদ্ধৃত কবিতায় তিনি নির্ভীক কবি ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন
তিরিশ বছর যায়
স্বাধীনতার স্বাদ চেটে খায় লুটেরার দল
বাতাসে স্মৃতির গন্ধ
কেঁদে যায় একাত্তর, ভাষাহীন
পা দোলায় রাজাকার
নতশির বীরোত্তম, পথভ্রষ্ট, যুদ্ধাবসানে
পরাজিত অন্তরে-বাহিরে।
খুনের বিচার চেয়ে বিড়ম্বিতা বোন
ঘাতকের হুংকারে কাঁপে তার বুকের আঁচল
বিব্রত বিচারক-ঈশ্বরের প্রতিনিধি
হতভম্ব সংসার, আল্লাহর আরশ!