প্রতিবেদন

প্রতারণারোধে এখন থেকে বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতিতে কর্মী যাবে মালয়েশিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক : এবার দালাল ছাড়াই নিজ নিজ জেলায় নিজের নামে খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিয়ে বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া যেতে পারবে কর্মীরা। জনশক্তি রপ্তানিতে দালালদের প্রতারণা বন্ধে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর েেত্র এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানোর একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস-বায়রা। এ নিয়ে গত ১৭ এপ্রিল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকও করেছেন বায়রা নেতৃবৃন্দ।
বর্তমানে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম চলছে। বায়রার ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছে এসব কর্মী। তবে একে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের পাল্লায় পড়ে অনেককে দ্বিগুণ, তিনগুণ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া যেতে হচ্ছে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিলেও দালালরা মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের কাছ থেকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ আছে। পাসপোর্ট হাতে নেয়ার পর পর্যায়ক্রমে এই টাকা নেয়া হয়ে থাকে। এ কারণে বিদেশে যেতে কর্মীদের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অনেকে প্রতারিত হয়ে যেতেও পারে না। এ েেত্র বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি বাস্তবায়ন হলে আর সেই প্রতারণা করতে পারবে না দালালরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলমান জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে অভিবাসন ব্যয় পুনর্নির্ধারণের পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি চালু হচ্ছে। এটি চালু হলে সরকার নির্ধারিত টাকা ব্যাংকে জমা দেবেন বিদেশগামীরা। মধ্যস্বত্বভোগীরা ইচ্ছা করলেও তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিতে পারবে না।
বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতির েেত্র মালয়েশিয়ার সিনারফ্যাক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে বলে জানা গেছে। কোনো কর্মী বিদেশ যেতে চাইলে নির্দিষ্ট একটি ব্যাংকে কর্মীকে তার নামে করা অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিতে হবে। টাকা জমার সেই রসিদ নিয়ে পরে নিবন্ধন ও মেডিকেল পরীাসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বায়রার মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, দালাল সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়া যেতে দ্বিগুণের বেশি খরচ করতে হচ্ছে কর্মীদের। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে দালাল ছাড়াই মালয়েশিয়া যেতে পারবে কর্মীরা। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় একমত হলেই বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতিতে কর্মী পাঠানো শুরু হবে। বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতিতে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে বলে বায়রার মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন জানান।
বায়রার মহাসচিব জানান, মালয়েশিয়ায় একটি সফটওয়্যার তৈরি হচ্ছে। তাদের দেয়া সফটওয়্যার অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত ব্যাংকের শাখায় একটি ডিভাইস বসানো হবে। যেখানে মালয়েশিয়ায় যেতে ইচ্ছুক কর্মী নিজে টাকা জমা দেবেন। ভিসা প্রাপ্তি ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কিয়ারেন্স পাওয়ার পর তার সেই টাকা সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির অ্যাকাউন্টে জমা হবে। প্রক্রিয়া চলাকালে যদি কোনো ব্যক্তি মনে করে যে সে বিদেশে যাবে না, তাহলে ইচ্ছে করলে ব্যাংক থেকে তার টাকা তুলে নিতে পারবে। তবে ভিসা হওয়ার পর যদি সে না যায় তাহলে তার অ্যাকাউন্ট থেকে কিছু টাকা (এখনো চূড়ান্ত নয়) কেটে নেবে ব্যাংক কর্তৃপ।
জানা যায়, জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছে। তারা গিয়ে ইতোমধ্যে নিজ নিজ কাজে যোগদান করেছে। কেউ কেউ ১ মাসের বেতনও তুলেছে। মার্চ মাসে প্রায় ৪০০ কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছে। এপ্রিল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি কর্মী মালয়েশিয়া গেছে। এভাবে জ্যামিতিক হারে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার হার বাড়তে থাকবে বলে বায়রার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে তারা এও জানিয়েছেন জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে কিছুটা ত্রুটি আছে। যার ফলশ্রুতিতে একটি মধ্যস্বত্বভোগী গজিয়ে উঠেছে। তারা মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা নিরসনের জন্য বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। এই পদ্ধতি চালু হলে জিটুজি প্লাসের অর্ধেক খরচে কর্মীরা বিদেশ যেতে পারবে।
সূত্র বলছে, মালয়েশিয়ার মতো সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতির চিন্তাভাবনা চলছে। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে দেয়া হলেও সৌদি আরবের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, শুধু মালয়েশিয়া নয়, সৌদি আরবসহ আরো কয়েকটি দেশের অভিবাসন ব্যয়ও পুনর্নির্ধারণ করে দেবে সরকার। এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন ।
তবে ভুক্তভোগী এক প্রবাসীকর্মী এ কে এম আজাদ স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন, জিটুজি প্লাস পদ্ধতিই হোক আর বায়ো-রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতিই হোকÑবিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে দালালচক্রের হাত থেকে রেহাই নেই। কর্মীর কাছ থেকে দালালচক্র ঠিকই টাকা হাতিয়ে নেয়। এ কে এম আজাদ জানান, এই দালালচক্র তৈরি করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বায়রা ও জনশক্তি রপ্তানি ব্যুরোর কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দালাল চক্রের সিন্ডিকেট তৈরি করে মাঠে ছেড়ে দেয়। দালালের সাহায্য ছাড়া কোনো অফিসেই কোনো বিদেশগামী কর্মী ঢুকতে পারে না। পাসপোর্ট তৈরি করা থেকে শুরু করে বিমানের টিকিট কাটা পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই বিদেশগামী কর্মীকে দালালের শরণাপন্ন হতে হয়। দালালরা সে সুযোগটি গ্রহণ করে ওই বিদেশগামী কর্মীকে ফতুর করে ছাড়ে। দালালদের উৎপাত বন্ধ না হলে কর্মীরা কোনো সময়েই সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ে বিদেশ যেতে পারবে না। অনেকে আবার অভিযোগ করে বলছেন, সরকার বা বায়রা মুখে সুন্দর সুন্দর কথা বললেও দালাল না ধরলে বিদেশ যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে; অনেক ক্ষেত্রে যাওয়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। জনৈক সিনিয়র সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, তাঁর নিকটাত্মীয়কে বিদেশ পাঠাতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব ড. জাফর আহমেদকে অনুরোধ করা হয়েছিল। সচিব আন্তরিকভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে একটি বেসরকারি কোম্পানির সহযোগিতায় সরকার নির্ধারিত টাকার অতিরিক্ত টাকা দিয়েই তাকে বিদেশ পাঠানো সম্ভব হয়েছেÑএটাই হলো আমাদের দেশের বাস্তবতা। এখন সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে এক্ষেত্রে প্রকৃত সংকট ও এর সমাধান।