আন্তর্জাতিক

ফ্রান্সে নির্বাচন : দ্বিতীয় ধাপে ম্যাক্রন এবং লে পেন-এর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথম দফার ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপন্থি নেতা ইমানুয়েল ম্যাক্রন এবং চরম-ডানপন্থি ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেতা মারি লে পেন পরস্পরের সাথে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
ফ্রান্সের নির্বাচনি ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্বে যদি কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশ ভোট অর্জন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে অংশ নেবেন শীর্ষ দুই প্রার্থী। প্রথম পর্বের নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ৫ জন। তারা হলেন ইমানুয়েল ম্যাক্রন, মারি লে পেন, ফ্রাঁসোয়া ফিলন, বেনোয়াঁ হ্যামন এবং জঁ-লুক মেলেশন। এর মধ্যে প্রথম পর্বে ঝরে পড়েছেন ফ্রাঁসোয়া ফিলন, বেনোয়াঁ হ্যামন ও জঁ-লুক মেলেশন।
প্রথম পর্বের ভোট গণনার পর দেখা গেছে, ২৩ দশমিক ৯ ভাগ ভোট পাওয়া মধ্যপন্থি নেতা ইমানুয়েল ম্যাক্রন ২১ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট পাওয়া উগ্র-ডানপন্থি এন এফ পার্টির নেতা মারি লে পেনের সাথে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
ফ্রান্সে দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৭ মে। প্রথম দফার নির্বাচনে নিজের বিজয়ের পর ইমানুয়েল ম্যাক্রন বলেছেন, দেশকে অনিশ্চয়তা আর ভীতি থেকে পরিবর্তনের পথে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাই তার জয়ের কারণ। নির্বাচনের পর এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘গত মাসে এবং আজকেও ফরাসি জনগণের ভয়, অনিশ্চয়তা আর ােভের কথা শুনতে পাচ্ছি আমি, সেই সাথে পরিবর্তনের প্রত্যাশার কথাও। আর আজকের নির্বাচনে বড় দল দুটোকে প্রত্যাখ্যানের অন্যতম কারণ এটি।’
মারি লে পেনও এই বিজয়কে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন। নিজেকে ফরাসি জনগণের প্রতিনিধি দাবি করে তিনি বলেছেন, তাদেরকে স্বাধীন করার সময় এটি। নির্বাচনের পর এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের প্রার্থী। সত্যিকারের দেশপ্রেমিকদের প্রতি আমি ভোটের আবেদন জানাচ্ছি, তাদের শেকড় যেখানেই প্রোথিত থাকুক, যেখানেই তাদের উৎস হোক বা প্রথম দফায় তারা যাকেই ভোট দিয়ে থাকুক না কেন।’
বিজয়ী দু’জনই মধ্য-ডানপন্থি ফ্রাঁসোয়া ফিলন এবং চরম-বামপন্থি জঁ-লুক মেলেশনের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছেন। ফ্রাঁসোয়া ফিলন পেয়েছেন ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ ভোট এবং জঁ-লুক মেলেশন পেয়েছেন ১৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোট। প্রথম দফার নির্বাচনের পর নির্বাচনের অপর দুই প্রার্থী সমাজতন্ত্রী প্রার্থী বেনোয়াঁ হ্যামন এবং ফ্রাঁসোয়া ফিলন ইমানুয়েল ম্যাক্রনকে সমর্থন দিয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাদও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, ইমানুয়েল ম্যাক্রনকে। সেই সাথে ইউরোপীয় নেতারাও তাদের সমর্থন জানিয়েছেন মধ্যপন্থি নেতা ম্যাক্রনকে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের মুখপাত্র ম্যাক্রনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রশংসা করেছেন তার ইউরোপের সমর্থনে অবস্থানের জন্য। ৩৯ বছর বয়সী ম্যাক্রন এর আগে কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি। দ্বিতীয় দফার ভোটে জিতলে ফ্রান্সের ইতিহাসে তিনি হবেন সবচেয়ে কম বয়সী প্রেসিডেন্ট। ২৩ এপ্রিলের নির্বাচনে বিজয়ের পর ম্যাক্রন দেশপ্রেমিক নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে জানান, মারি লে পেনের জাতীয়তাবাদী হুমকি প্রতিরোধ করে ফরাসি রাজনীতিকে নতুন করে সাজানো হবে এবং ফ্রান্সকে আধুনিক করা হবে।
প্রথম দফা ভোটের ফল বের হয়ে আসার পর থেকেই বিভিন্ন সংস্থার করা জরিপে দেখা যায়, প্রথম দফায় মারি লে পেনকে পেছনে ফেলা ম্যাক্রন দ্বিতীয় দফা ভোটে ফ্রান্সের পছন্দনীয় প্রার্থী। বিশ্লেষকরাও বলছেন, মারি লে পেনের কট্টরপন্থি দলকে মতা থেকে দূরে রাখতে প্রতিপ অনেক রাজনৈতিক দলেরই ম্যাক্রনের সমর্থনে একজোট হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ ফ্রান্সের নির্বাচনি ইতিহাসে বরাবরই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বে সব দল তাদের কোন্দল ভুলে ডানপন্থিদের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে কাজ করেছে। এবারও তাই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুটি বড় দল ইতোমধ্যেই ম্যাক্রনকে সমর্থন দিয়েছে। সাবেক ব্যাংকার ম্যাক্রনকে রাজনীতির বাইরের লোক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওলাদের অর্থমন্ত্রী ছিলেন ম্যাক্রন। কিন্তু নিজ দল গঠন করার জন্য মন্ত্রিত্ব ছাড়েন। বর্তমানে এন মার্শে (অন দ্য মুভ) নামের একটি উদার মধ্যপন্থি দলের নেতা তিনি। গত বছর দলটি গঠন করা হয়। ম্যাক্রন জিতলে আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বড় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী না হয়েও প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন তিনি।
অন্যদিকে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে আসা মারি লে পেন ২০১১ সালে তার বাবার কাছ থেকে কট্টর ডানপন্থি দল এফএনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে এফএন দলটি ফ্রান্সের আঞ্চলিক নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পায়। আর দলটি গত ১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। মারি লে পেনের দল অবৈধ অভিবাসীদের বহিষ্কার ও বৈধ অভিবাসীদের রাশ টেনে ধরতে চায়, অবাধ বাণিজ্যের ওপর যবনিকা টানতে চায় এবং ইউরোপের সঙ্গে ফ্রান্সের বর্তমান সম্পর্ক আমূল পাল্টাতে চায়। এদিকে, ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম দফা নির্বাচনের ফল পাওয়ার পর শত শত বিােভকারী রাজধানী প্যারিসের রাস্তায় নেমে এলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এক পর্যায়ে পুলিশ বিােভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। প্রথম দফা ভোটে বিজয়ী দুই প্রার্থী ইমানুয়েল ম্যাক্রন এবং মারি লে পেনের বিরুদ্ধে এ বিােভ হয়। পুলিশ জানিয়েছে, প্যারিস থেকে তারা শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা চালানোর অভিযোগে এদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিােভকারীরা গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাট ভাঙচুর করে ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দিকে বোতল ছুড়ে মারে। সংবাদমাধ্যম জানায়, কয়েক শ লোক রাস্তায় নেমে প্রথম দফা ভোটে বিজয়ী দুই প্রার্থী ইমানুয়েল ম্যাক্রন এবং মারি লে পেনের বিরুদ্ধে বিােভ করে। ফ্যাসিবাদবিরোধী ও পুঁজিবাদবিরোধী এই বিােভ প্যারিস ছাড়াও ফ্রান্সের লিওন, বোদু, নাঁতে, রেনেসহ কয়েকটি শহরে হয়েছে।