প্রতিবেদন

ব্লু-ইকোনমি বাস্তবায়নের পথে অনেক দূর এগিয়েছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে নতুন করে সমুদ্রসীমা পাওয়ার পর থেকেই সরকার ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর পাশাপাশি ব্লু ইকোনমিসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে বলা হয়েছে। এরই প্রেেিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। এই কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সম্প্রতি এক বৈঠকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
জানা গেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে অফশোর অঞ্চলে সিসমিক সার্ভে কার্যক্রমে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণের জন্য আবারো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। মূল্যায়ন কার্যক্রম শেষ হলেও স্বারের কার্যক্রম এখনো বাকি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ আইনের আওতায় গভীর সমুদ্র অঞ্চলে ব্লক ১২, ১৬ ও ২১ হতে তেল গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কার্যক্রম চলছে। নতুন সমুদ্রসীমা অর্জনের ফলশ্রুতিতে অফশোর এলাকায় নতুন বিডিং রাউন্ড আহ্বানের জন্য সময়োপযোগী মডেল পিএসসি ২০১৫-এর সংশোধনের খসড়া এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মধ্য মেয়াদে কার্যক্রমে মডেল চুক্তি অনুসরণে অফশোর নন-এক্সকুসিভ সার্ভে কার্যক্রম আগামী ২৪ মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদের পরিকল্পনার েেত্র রয়েছে মডেল পিএসসি ২০১৫ চূড়ান্ত হলেই মাল্টিকাইন্ট সিসমিক সার্ভের ডাটা পাওয়া যাবে। আর এই ডাটা পাওয়া গেলে অফশোর বিডিং আহ্বান করা যাবে। সমুদ্রের কোন কোন এলাকায় কী কী খনিজ সম্পদ ও মূল্যবান সম্পদ রয়েছে তা দ্রুত সার্ভে করার জন্য নিজস্ব জাহাজ কেনা হবে কিংবা ভাড়া করা হবে। এর জন্য ইতোমধ্যে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে।
ব্লু ইকোনমির অন্যতম আরো একটি উৎস হচ্ছে মৎস্য সম্পদ। এেেত্র মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সমুদ্রের কোন কোন এলাকায় কী কী মৎস্য সম্পদ রয়েছে, তা দ্রুত সার্ভে করার জন্য নিজস্ব জাহাজের পাশাপাশি ভাড়ায় জাহাজ সংগ্রহের পদপে নিচ্ছে এই মন্ত্রণালয়। এর পাশাপাশি মেরিন ফিশারিজ ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্প থেকে সম্ভাব্য জরিপের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমায় বিদেশি ট্রলার, জাহাজের অননুমোদিত ফিশিং ও অবৈধ ট্রলার-জাহাজের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে মনিটরিং কার্যক্রম ও সার্ভেল্যান্স কার্যক্রম জোরদার করার পদপে নেয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ফিশিং ট্রলারের রেজিস্ট্রেশন ও ফিশিং লাইসেন্স ইস্যু করার আগে সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের প্রতিনিধির সমন্বয়ে যৌথ জরিপ পরিচালনা করা হবে। যে সব জেলে মাছ ধরতে গিয়ে বিভিন্ন কারণে বিদেশি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে কিংবা বিদেশি জেলে বন্দি অবস্থায় রয়েছে তাদের দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে। অল্প সময়ে যোগাযোগ স্থাপনে প্রতিটি মৎস্য ট্রলারে যোগাযোগ যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি সমুদ্রসীমায় মৎস্য সম্পদ আহরণের জন্য দ জনবল তৈরির পদপে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিদেশে ১০ জন ও দেশে ৯৯০ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিণ দেয়া হচ্ছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সমুদ্রের কাছাকাছি কিংবা নিকট দূরত্বে জেগে ওঠা চরগুলোর ভূমি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সন্দ্বীপ এলাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় ক্রশড্যাম নির্মাণের সমীা চালানো হচ্ছে। প্রতি বছর রুটিন করে নদী শাসন ও নদী ড্রেজিং করে নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার পদপে নেয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন নদী পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বেসামরিক বিমান পবিরহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় নদীভিত্তিক পর্যটন শিল্প বিকাশের জন্য কার্যকর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক রুট সীমিতভাবে নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর পাশাপাশি আরো ৫টি রুট সৃষ্টি করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে। এসব রুট থেকে প্রতিবার যাওয়া আসা বাবদ ৪৫০ মার্কিন ডলার মাশুল আদায় করা হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ৬টি ইনস্টিটিউটের চলমান ট্রেডের আধুনিকায়নসহ বেশ কিছু বিষয়ে প্রশিণ দেয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে। এর পাশাপাশি আগামী ১ বছরের মধ্যে মেরিন রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড রিকন্ডিশনসহ বিভিন্ন কারিগরি প্রশিণ চালু করবে। এদিকে শিা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ে কোর্স চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনির্ভাসিটি নামে একটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ও সম্ভাব্য েেত্র কলেজ পর্যায়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিষয়ে বিভিন্ন কোর্স চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে মেরিন ফিশারিজ ইনস্টিটিউট স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ কক্সবাজার, টেকনাফ ফোর লেনবিশিষ্ট মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিচ্ছে। মেরিন ড্রাইভ ও সাগর তীরের মধ্যে কোনো হাইরাইজ ভবন নির্মাণ করা হবে না।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নের েেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, দেশের সমুদ্রসীমা বিদেশি ট্রলার বা জাহাজের অননুমোদিত ফিশিং ও অবৈধ ট্রলার, জাহাজের অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। এর পাশাপাশি মনিটরিং ও সার্ভেল্যান্স কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। নৌবাহিনীর প্যাট্রল এয়ারক্র্যাফট দিয়ে সমুদ্র এলাকায় নিয়মিতভাবে সার্ভেল্যান্স মনিটরিং করা হচ্ছে। দুটি মেরিটাইম হেলিকপ্টার ও দুটি মেরিটাইম প্যাট্রল এয়ারক্র্যাফট ও বেশ কিছু ফ্রিগেট, করভেট ও প্যাট্রল ক্র্যাফট নৌবাহিনীতে সংযোজন করা হয়েছে।
সমুদ্রবিশারদরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরের যে অংশটি ভারত ও মিয়ানমারের কাছ থেকে বাংলাদেশ পেয়েছে সে অংশটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি টুনা মাছের নিবিড় আবাসস্থল। টুনা গভীর পানির মাছ। সাগরের ২০০ মিটার নিচে তাদের অবস্থান। অথচ বাংলাদেশের জেলেরা যে জাল ব্যবহার করে তা ২০ মিটার গভীরে যেতে পারে। সমুদ্রবিশারদদের মতে, এই একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তাহলে কেবল টুনা মাছ রপ্তানি করেই বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। এ জন্য তাদের পরামর্শ হলো চট্টগ্রাম মেরিন ফিশারিজ একাডেমিকে আরো আধুনিক ও সক্রিয় করা। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমেই সাগরের গভীর থেকে টুনা মাছ তুলে এনে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরো পাকাপোক্ত করতে পারে।