কলাম

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ

ড. হাবিব খান : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অসাধারণ অগ্রগতির দিনেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে মানবসভ্যতা যে কত অসহায় তা আরো একবার প্রমাণিত হলো গত ২৫ এপ্রিল ২০১৫ তারিখে হিমালয়ের দেশ নেপালে অনুষ্ঠিত প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে। ৭ দশমিক ৯ রিখটার স্কেলের সেই ভূমিকম্প বাংলাদেশ ও ভারতকেও নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। ২৫ এপ্রিলের পরেও বেশ কয়েকবার ভূমিকম্প হয়েছে সেখানে। ১০ হাজারের মতো মানুষ নিহত হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে বহু ঘরবাড়ি ও জনপদ। বাংলাদেশে নিহতের সংখ্যা ৫। আতঙ্কগ্রস্ত অনেকে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা যায়। যদি নেপালের মতো তীব্র মাত্রায় একটি ভূমিকম্প বাংলাদেশে আঘাত হানে, তবে কী হতে পারে আমাদের দেশে? ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা ও সিলেটের মতো জনবহুল শহরের বহুতল ভবন ধুলোয় মিশে যেতে হয়ত বেশি সময় লাগবে না। কত লোক যে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারাবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। একজন গবেষকের মতে, ঢাকা হবে জ্বলন্ত অগ্নিকু-। আমরা কি এ ধরনের আকস্মিক বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুত?
বাংলাদেশে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কতটুকু?
সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের ২০টি জেলা ভূমিকম্পের সর্বাধিক ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বিশ্বের ভূমিকম্প প্রবণ হিসেবে যে বিশেষ রেখা নির্ধারণ করেছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের মধ্যে ঢাকা রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। সর্বাধিক ঝুঁকিতে যে ২০টি জেলা রয়েছে তার মধ্যে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের একাংশ, পঞ্চগড়, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল অন্যতম। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো এক জেলায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হলে তার আশপাশে প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, ঢাকায় ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো ভূতাত্ত্বিক ফাটল রেখা বা ফল্ট লাইন নেই। তবে ঢাকার অদূরে মধুপুরে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো ফাটল রেখা রয়েছে; যা ঢাকার জন্য যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। ৪৫০ বছরের ভূমিকম্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঢাকা ও তার পার্শ¦বর্তী অঞ্চলে ৩টি প্লেট সক্রিয় রয়েছে। এগুলো হলোÑভারতীয় প্লেট, ইউরেশিয়া প্লেট ও মিয়ানমার মাইক্রোপ্লেট। এর মধ্যে ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়া প্লেট প্রতি বছর পরস্পরের দিকে ২ ইঞ্চি করে এগিয়ে আসছে। মিয়ানমার মাইক্রোপ্লেটটি দেশটির উত্তর-পূর্ব দিকে প্রতি বছর ১ ইঞ্চির কম করে এগিয়ে যাচ্ছে।
ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবী গঠিত হয়েছে প্লেট ও সাব প্লেট দিয়ে। এ রকম ২টি প্লেটের মাঝখানে যে ফাঁক থাকে তাকে বলা হয় ফল্ট লাইন। প্লেটগুলো গতিশীল। ২টি চলন্ত প্লেটের ফল্ট লাইনে পরস্পর সংঘর্ষ হলে অথবা হঠাৎ ফল্ট লাইনে শূন্য অবস্থার সৃষ্টি হলে ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কয়েকটি ফল্ট বা চ্যুতি রয়েছে যেমন মধুপুর চ্যুতি, বগুড়া চ্যুতি, রাজশাহীর তানোর চ্যুতি, সীতাকু-ু-টেকনাফ চ্যুতি, হালুয়াঘাট চ্যুতি, সিলেটের ডাউকি চ্যুতি। আর সীমান্তে আছে ত্রিপুরা চ্যুতি। এসব চ্যুতির কাছাকাছি ভূমিকম্প হলে আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্পের আশঙ্কা বেড়ে যায়। অতএব সঠিক বিবেচনায় বাংলাদেশ যে বর্তমানে ব্যাপক ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে অবস্থান করছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইতঃপূর্বে এতদঞ্চলে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই সিরাজগঞ্জে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার ফলে যমুনা নদীর স্রোত পরিবর্তন হয়ে যায়। ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়াক’ হয় ৮ দশমিক ৭ মাত্রায়। এতে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই ৭ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হয় শ্রীমঙ্গলে। ওই ভূমিকম্পে তৎকালীন ঢাকার পাকা ভবনের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। ভারতের ধুবরিতে আঘাত হানা ১৯৩০ সালের ২ জুলাইয়ের ভূমিকম্প বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট আসামে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। ১৯৫৪ সালের ২১ মার্চ ভারতের মনিপুরের ভূমিকম্পটি ছিল ৭ দশমিক ৪ মাত্রার। একই বছরে ৮ জুলাই আসামে আবার ভূমিকম্প হয় ৬ দশমিক ৭ মাত্রার। সাম্প্রতিককালে নেপালের ২টি ভূমিকম্পের আগে সর্বশেষ সিকিমে ভূমিকম্প হয় ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট ৬ দশমিক ৮ মাত্রার। এসব ভূমিকম্পে বাংলাদেশেও কমবেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উল্লেখ্য, বড় ভূমিকম্পগুলো জুন থেকে আগস্টের মধ্যে হয়। সবচেয়ে বেশি হয় জুলাই মাসে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ
স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই শহরের জনসংখ্যা প্রতি বছর ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেখানে জাতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২ দশমিক ২ শতাংশ। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ শহরে বাস করে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি বাস করে প্রধান ৪টি শহর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায়। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে এর অবস্থান ১১তম। কৃষি কাজ ব্যতীত অন্যত্র যেমন কলকারখানা, অফিস-আদালত ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ প্রতিনিয়ত গ্রাম ছেড়ে শহরে আসছে। আর এ কারণে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকা শহরে এই হার অন্য যেকোনো শহরের চেয়ে অনেক বেশি।
একটি গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, ঢাকা শহরের বর্তমান আয়তন ৮১৫ দশমিক ৮৫ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৪ হাজার ৬০৮ জন। দেশের গার্মেন্টস শিল্পের শতকরা ৮০ ভাগ ঢাকা শহর ও এর আশপাশে অবস্থিত। দেশের মোট জিডিপি’র ১৩ শতাংশ অর্জিত হচ্ছে এই ঢাকা শহর থেকে। সাম্প্রতিক একটি জরিপে এসেছে, ঢাকা শহরের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি। তার মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ লোক প্রতিদিন সকালে কর্মসম্পাদনে ঢাকা শহরে ঢুকছে আর বিকেলে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক জনসাধারণের আবাসস্থল এবং কর্মস্থলের জন্য যে বিপুল পরিমাণ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তা কতটুকু ভূমিকম্প সহনীয় তা আজ প্রশ্নাতীত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সক্রিয় সিসমিক জোনে অবস্থিত ঢাকা শহরের ঘরবাড়ি দুর্বল নির্মাণশৈলী এবং ভঙ্গুর হওয়ার কারণে ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মোটেই সক্ষম হবে না।
২০১৩ সালে বুয়েট এবং মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক শুধু ঢাকা মহানগরস্থ ভবনসমূহের ওপর ভূমিকম্প-পরিবর্তী অবস্থা এবং এতদসংক্রান্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বিষয়ক একটি জরিপ পরিচালনা করেন। জরিপে শহরের ৯১ ওয়ার্ডের মধ্যে ১০টিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গবেষণায় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডস্থ ভবনের অবস্থান, ভবনের সংখ্যা, ভবনের ঘনত্ব, ভবনের বয়স, ভবনের বাহ্যিক দৃশ্যমান অবস্থা (যেমন খুব খারাপ, মোটামুটি ও ভালো) সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। এতে দেখা যায় যে, জনসংখ্যার অতি দ্রুত বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে নগরায়ণের কাজও দ্রুত করতে হয়েছে। ফলে ভবনসমূহ তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকম্প সহনশীলতার বিষয়টি অনেকাংশেই উপেক্ষিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৫নং ওয়ার্ডে ভবনের ঘনত্ব বিপজ্জনকভাবে বেশি এবং বয়সে পুরাতন। ফলে এগুলো ভূমিকম্পের বিবেচনায় ভঙ্গুর। ১, ৬ ও ১৩নং ওয়ার্ড-এ জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান যেমন ফায়ার ব্রিগেড, পুলিশ স্টেশন ইত্যাদি থাকলেও ভূমিকম্পের বিবেচনায় বিপজ্জনক। ১৩, ১৭, ১, ৬, ১৫, ১৬, ৫৮, ৪৮নং ওয়ার্ডের ভবনগুলো অত্যন্ত দুর্বল গাঁথুনির উপর তৈরি, ফলে বিপজ্জনক। এসব ভবন সাধারণত স্থাপত্যবিদগণের পরামর্শ ব্যতীত সাধারণ রাজমিস্ত্রির দ্বারা তৈরি। ৮, ১৩, ১৭, ৪৮ ও ৫৮নং ওয়ার্ড-এ ঝুলন্ত কক্ষ অর্থাৎ মূল কাঠামোর বাইরে বর্ধিত কক্ষের সংখ্যা বেশি। এসব এলাকার কিছুসংখ্যক ভবন স্বল্প-উচ্চতার কলামের ওপর দুর্বল ভৌতিক অবকাঠামোয় নির্মিত; ফলে বিপজ্জনক। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীর দক্ষিণাংশ নগরের অপরাংশ থেকে দ্রুত নগরায়ণ, দুর্বল অবকাঠামোগত অবস্থা এবং বয়সে পুরনো হওয়ার কারণে ভবনগুলো অধিক বিপজ্জনক। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক সিডিএমপি’র একটি রিপোর্টে দেখা যায়, ভূগর্ভস্থ নরম মাটি (অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যাপক উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট), বিল্ডিং কোড না মানা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে ৭৮ হাজার। তার মধ্যে সরকারি ভবনই ৫ হাজার। কিছুদিন আগে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা ২ হাজার ৯৯৪টি ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তন্মধ্যে মাত্র ৬টি ভবন ভাঙার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আকতারের মতে, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে ঢাকা নগরের ১০ শতাংশ ভবন ভেঙে যাবে, ২ লাখের মতো মানুষ মারা যাবে, ধসে যাওয়া ভবনে আটকা পড়বে ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষ। গ্যাস লাইন ফেটে, বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে ও অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়ার আশঙ্কাও থাকবে।
অপরিকল্পিত নগরায়ণে হাউজিং ব্যবসায়ের ভূমিকা
ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ভবন নির্মাণ কাজে সরকারি, আধা-সরকারি এবং পুরোপুরি প্রাইভেটসহ অসংখ্য হাউজিং প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। এদের শতকরা ৯০ ভাগই বিল্ডিং কোড মেনে কাজ করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত ত্রুটিপূর্ণ সরঞ্জাম ও নিম্ন মানের উপাদান এবং সর্বোপরি ব্যাপক ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ভূমিকম্প-উত্তর অবস্থাকে অধিক বিপজ্জনক করে তুলছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারিতে নিয়ে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে। বড় শহরগুলোর ভূমি ব্যবস্থাপনায় রাজউক, সিডিএ, কেডিএ, আরডিএ ইত্যাদি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সৎ ও নিষ্ঠার সাথে পরিচালিত হওয়া এখন সময়ের দাবি।
গত ১৭ জুন ২০১৫ তারিখে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখা যায়, রাজউক কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা কেবল নকশা অনুমোদন করে। এর বাইরে কোনো ভবনে যতটুকু নকশার ব্যত্যয় ঘটানো হয় কেবল সে অংশটুকুই ভেঙে দেয়া হয়। উচ্চ আদালতের একটি রুলের জবাবে রাজউক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনুমোদনের শর্তাবলি ভঙ্গ করে এবং অনুমোদিত নকশার বিধিবহির্ভূত পরিবর্তন সাধনের মাধ্যমে অবৈধ নির্মাণাধীন ভবনের তালিকা প্রণয়ন এবং তদানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ রাজউকের একটি রুটিন ওয়ার্ক। এক প্রশ্নের জবাবে রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান জি এম জয়নাল আবেদীন বলেন, উচ্চ আদালতে যেসব ভবনের তালিকা দেয়া হয়েছে এগুলোর সবই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব ভবন ভেঙে দেয়ার জন্য বিদ্যমান আইনটি যথেষ্ট নয়। আইনে দ্বৈধতা রয়েছে। সিটি করপোরেশন যেমন অবৈধ ভবন ভাঙে তদ্রƒপ রাজউকও কিছু কিছু ভবন ভাঙে। তিনি বলেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এবং বিএনবিসি’তে কিভাবে ভবন নির্মাণ করতে হবে তা বলে দেয়া আছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ ভবন মালিক কিংবা ডেভেলপার কোম্পানি আইনটি মানেন না।
আশার কথা
২০১৫ সালের ১৬ জুন জাতীয় সংসদে একটি প্রশ্নের উত্তরে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানীর ১২টি ভবন অপসারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। খুলনা ও চট্টগ্রাম মহানগরেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন চিহ্নিতকরণের কাজ চলছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকায় পরিত্যক্ত বাড়ির সংখ্যা ৬ হাজার ৪৬৮টি। এগুলো ব্যবহার উপযোগী করার বিবিধ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, আধুনিক নগরায়ণের জন্য পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে সুপরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের আছে। রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যানও সম্প্রতি ঢাকার বাইরে আরো ২টি উপশহর সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার কথা জানান।
শেষ কথা
ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে অল্পবিস্তর পূর্বাভাস দেয়ার সুযোগ থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কিভাবে দেয়া যায় তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা ব্যাপক গবেষণা করছেন। তারপরও আপাতত আমরা কিছু বিষয় লক্ষ্য রেখে কিছুটা সতর্ক থাকতে পারি।
১. বড় বড় ভূমিকম্পগুলো জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে হওয়ার রেকর্ড আছে। অতএব এই ৩ মাস আমরা একটু সতর্ক থাকতে পারি।
২. ভূমিকম্প হওয়ার পূর্বে অনেক জায়গায় বায়ুর চাপ কমে যায়। মনে করা হয়, বায়ু চাপ কমে যাওয়ার সাথে ভূমিকম্পের যোগসূত্র রয়েছে।
৩. অমাবস্যা ও পূর্ণিমাতে বড় রকমের ভূমিকম্প হতে দেখা যায়।
৪. প্রতি ১১ বছর পরপর সূর্যের সৌরকলংক বাড়ে। ফলে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। এই বিশৃঙ্খলার কারণে ১১ বছর অন্তর বড় ভূমিকম্প হতে দেখা যায়।
৫. কোনো স্থানে ভূমিকম্প হওয়ার পূর্বে সেখানে চৌম্বক ঝড় হয়। চৌম্বক ঝড়ের ফলে সেখানে কম্পাসের কাঁটা হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে। কম্পাসের কাঁটার এই দিক পরিবর্তন ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৬. ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার পূর্বে অনেক এলাকার গভীর নলকূপের পানিতে র‌্যাডন গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। এমতাবস্থায় আমরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।
৭. ভূমিকম্পের পূর্বে অনেক এলাকার ভূমিতে বিশেষ ধরনের বক্রতার সৃষ্টি হয়। যেমন একদিকে উঁচু হলে অন্যদিকে নিচু হয়Ñএমন পরিস্থিতিতে আমরা সতর্ক থাকতে পারি।
৮. ভবনসমূহের নিচ তলার মেঝে হঠাৎ বিনা কারণে ঘেমে যাওয়াও ভূমিকম্পের পূর্বলক্ষণ। সুতরাং এ ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।
আমার এই নাতিদীর্ঘ আর্টিকেল ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মালাদি’র একটি বক্তব্য দিয়ে শেষ করছি, ‘ভূমিকম্প মানুষ হত্যা করে না, মানুষ হত্যা করে ভবনসমূহ।’ সুতরাং এক্ষেত্রে ভবনের দিকে নজর দিতে হবে।