ফিচার

মেরাজের তাৎপর্য ও শিক্ষা

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম : আল্লাহতাআলা প্রত্যেক যুগেই পৃথিবীতে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ নবী হলেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি সাইয়্যেদুল আম্বিয়া তথা নবী-রাসূলদের সর্দার। আল্লাহতাআলা ইরশাদ করেন, হে রাসূল! আমি আপনাকে গোটা মানবজাতির জন্য রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি। (সূরা : সাবা, আয়াত : ২২) মহানবী (সা.)-এর নবুয়তকে শক্তিশালী করার জন্য অন্য নবী-রাসূলদের মতো তাকেও দেয়া হয়েছে অগুনতি মুজিজা; তন্মধ্যে মেরাজ অন্যতম।
ইসরা ও মেরাজের মধ্যে পার্থক্য : ইসরা অর্থ নৈশভ্রমণ, রাত্রিকালীন ভ্রমণ। আর মেরাজ অর্থ সিঁড়ি, ঊর্ধ্বলোকে গমন, সোপান, মই। মেরাজ তথা ঊর্ধ্বলোকে গমনের কথা হাদিস দ্বারা আর ইসরা তথা নৈশভ্রমণের কথা কোরআন মজিদ দ্বারা প্রমাণিত। ইসরাকে অস্বীকারকারী কাফির হবে, কিন্তু মেরাজকে অস্বীকারকারী কাফির হবে না, তবে মহাপাপী হবে।
মেরাজ কখন সংঘটিত হয় : মেরাজ কখন সংঘটিত হয় এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। হজরত মুসা ইবনে ওকবা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে মিরাজের ঘটনা হিজরতের ৬ মাস আগে সংঘটিত হয়। ইমাম নববী ও কুরতুবির মতে, মিরাজের ঘটনা মহানবী (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির ৫ বছর পর ঘটেছে। ইবনে ইসহাক বলেন, মিরাজের ঘটনা তখন ঘটেছিল যখন ইসলাম আরবের সব গোত্রে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমাম হরবি বলেন, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা রবিউস সানি মাসের ২৭ তারিখ রাতে হিজরতের ১ বছর আগে ঘটেছিল। কারো মতে, হিজরতের ১৬ মাস আগে রমজান মাসে মেরাজ সংঘটিত হয়। (আর রাহিকুল মাখতুম)
ভ্রমণের সূচনা : হাদিসের ভাষ্য মতে, মিরাজের সূচনা হয় মসজিদে হারেম থেকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) রজব মাসের ২৭তম রজনীতে আল্লাহতাআলার ঘরের হিজরের মাঝে শায়িত ছিলেন। এমন সময় হজরত জিবরাইল (আ.) এসে তাঁকে জাগ্রত করে তাঁর ব মুবারক বিদীর্ণ করে দূষিত রক্ত বের করে আবার জোড়া লাগিয়ে দেন। অতঃপর বোরাকে করে সশরীরে বায়তুল মাকদাসে নিয়ে যান। বোরাক হলো এমন একটি প্রাণী, যা গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি আকৃতির একটি জন্তু। তার দুই ঊরুতে রয়েছে দুটি পাখা। তা দিয়ে সে পেছনের পায়ে ঝাপটা দেয়, আর সামনের দৃষ্টির শেষ সীমায় পা ফেলে। প্রিয় নবী (সা.) বায়তুল মাকদাসের দরজায় খুঁটির সঙ্গে বোরাকটি বেঁধে যাত্রাবিরতি করেন এবং সব নবীর ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করেন। (আর রাহিকুল মাখতুম)।
ঊর্ধ্ব গমন : বায়তুল মাকদাসে দুই রাকায়াত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ আদায় করার পর সিঁড়ি আনা হয়, যাতে নিচ থেকে ওপরে যাওয়ার জন্য ধাপ বানানো ছিল। তিনি সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আকাশে, অতঃপর অবশিষ্ট আকাশগুলোয় গমন করেন। এ সিঁড়িটি কী এবং কেমন ছিল, তার প্রকৃত স্বরূপ আল্লাহতাআলাই ভালো জানেন। প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা রাসূল (সা.) কে অভ্যর্থনা জানান এবং প্রত্যেক আকাশে অবস্থানরত পয়গম্বরদের সঙ্গে তার সাাৎ হয়। প্রথম আকাশে হজরত আদম (আ.)-কে, দ্বিতীয় আকাশে হজরত ইয়াহিয়া ও ঈসা (আ.)-কে, তৃতীয় আকাশে হজরত ইউসুফ (আ.)-কে, চতুর্থ আকাশে হজরত ইদ্রিস (আ.)-কে, পঞ্চম আকাশে হজরত হারুন (আ.)-কে, ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.)-কে এবং সপ্তম আকাশে হজরত ইবরাহিম (আ.)-কে দেখতে পান।
তিনি সাহাবায়ে কেরামের কাছে হজরত ঈসা ও মুসা (আ.)-এর আকৃতিও বর্ণনা করেছেন। নবীদের স্থানগুলো অতিক্রম করে তিনি এক ময়দানে পৌঁছেন। যেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তারপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা গমন করেন, যেখানে আল্লাহতাআলার নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি এবং বিভিন্ন রঙের প্রজাপতি ইতস্তত ছোটাছুটি করছে। ফেরেশতারা স্থানটি ঘিরে রাখছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সেখানে হজরত জিবরাইল (আ.)-কে তার স্বরূপে দেখেন। তার ৬০০ পাখা। সেখানে তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের রফরফ দেখতে পান। রফরফ হলো সবুজ রঙের গদিবিশিষ্ট পালকি। রফরফের মাধ্যমে তিনি স্বীয় রবের কাছে গমন করেন। এ সফরে তাকে কয়েকটি জিনিস দেখানো হয়। তাকে দুধ ও মদ দেয়া হয়েছিল। তিনি দুধ গ্রহণ করেন। এটা দেখে হজরত জিবরাইল (আ.) বলেন, আপনি স্বভাবগত বস্তু গ্রহণ করেছেন। আপনি মদ গ্রহণ করলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত। তাকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হয়। জাহান্নামিদের শাস্তিও তিনি অবলোকন করেন।
মেরাজ কি সশরীরে হয়েছে : মহানবী (সা.)-এর মেরাজ সশরীরে হয়েছে। তার দেহ ও আত্মা উভয়ই মেরাজে গমন করেছে। কেননা আল্লাহতাআলা প্রিয় নবী (সা.)-এর মেরাজ গমনকে তার এক বিশেষ মুজিজা হিসেবে গুরুত্বসহকারে কোরআন মজিদে বর্ণনা করেছেন। যদি মেরাজ গমন কেবল আধ্যাত্মিক হতো, তবে তা তার মুজিজা হতো না। কেননা মুজিজা কখনো গাইরে নবী থেকে প্রকাশ পেতে পারে না। অথচ বেহেশত, দোজখ, আরশ, কুরসি পর্যন্ত কোনো কোনো আউলিয়াও আধ্যাত্মিভাবে সফর করতে পারেন। কোরআন মজিদে বর্ণিত আয়াতের শব্দের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে মহানবী (সা.)-এর মেরাজ গমন সশরীরেই সংঘটিত হয়েছিল।
আকাশের পরিম-ল কিভাবে অতিক্রম করেছেন : যে মহাশক্তির মালিক আল্লাহ, তার এই মতাও আছে যে তিনি ণিকের জন্য তার হাবিবকে আকাশের ঠা-া ও গরম সব পরিম-ল পার করার সময় শীতম-ল সাময়িকভাবে গরম করতে পারেন এবং অগ্নিম-ল ঠা-া করতে পারেন। যেমন হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জন্য নমরুদের অগ্নিকু- ঠা-া করে দিয়েছিলেন। মহানবী (সা.)-কে তার প্রতিপালক শীতম-ল ও অগ্নিম-ল এত দ্রুত পার করে নিয়ে গেছেন যে তাকে আগুন স্পর্শই করতে পারেনি। আর বিশ্বনবী (সা.)-এর চলার গতি ছিল বিদ্যুতের গতি থেকেও দ্রুত।
মেরাজের শিা : মেরাজের ঘটনা থেকে মুমিন খুঁজে পায় সঠিক পথের দিশা, লাভ করে আল্লাহর অপার অনুগ্রহ ও দ্বীনের অবিচলতা। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) যে আল্লাহতাআলার কাছে কত দামি ও মর্যাদার অধিকারী, তা এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। তাকে এমন মর্যাদা দান করা হয়েছে, যা অন্য কোনো নবীকে দান করা হয়নি। এ ঘটনার ফলে মুমিনের ঈমান মজবুত হয় এবং হৃদয়ে বিশ্বনবী (সা.)-এর ভালোবাসা সুগভীর হয়।
লেখক : প্রধান ফকিহ
আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া
কামিল মাদ্রাসা, ফেনী