প্রতিবেদন

র‌্যাবের সাফল্যমণ্ডিত পথ-পরিক্রমা

কর্নেল মো. আনোয়ার লতিফ খান, বিপিএম, পিএসসি : সভ্যতার ক্রমবিকাশের পটভূমিতে মানুষের উদ্দীপ্ত পদচারণা একটি অনবদ্য ইতিহাস। সেই আদিম যুগ হতে শুরু করে আজকের এ বিশ্বায়নের যুগে মানবতার ক্রমবর্ধমান কর্মকা- যেন আশীর্বাদেরই নামান্তর। এ সকল প্রেক্ষাপটে আজকের মানুষ শুধু অর্থনৈতিক গ-ির বাইরে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিম-লেও সদা বিরাজমান। সমাজ ও সাংস্কৃতিতে তার নিরাপত্তাবোধ ও আভিজাত্যবোধ তথা স্থিতিশীল ও আরামদায়ক পরিবেশ ও প্রতিবেশ যেন একান্তই কাম্য। সে লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে রাষ্ট্র ও তার বিভিন্ন বিভাগসমূহ। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। উন্নয়ন, প্রগতি ও নিরাপত্তা এসব ধারণাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সুদৃঢ় নিরাপত্তা বলয়। সেজন্য দরকার হয়েছে র‌্যাবের মতো একটি এলিট ফোর্সের। সময়ের পরিক্রমায় র‌্যাব এখন একটি উজ্জীবিত আদর্শ, একটি বীরগাথা গল্প, একটি সফল এলিট ফোর্সের দীপ্তকণ্ঠ।
লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত আমাদের গৌরবোজ্জ্বল বাংলাদেশ। লাল-সবুজের এ বাংলায় সকল মানুষই সেই অতীত কাল হতে সম্প্রীতি ও সংহতির এক অপরূপ বার্তা প্রদর্শন করে এগিয়ে চলেছে স্বকীয় চিন্তা ও চেতনার আবরণে। তবুও মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাস্তবায়ন করার তাগিদে সংবিধানে বর্ণিত আছে রাষ্ট্র ও নাগরিকের দায়িত্ব, কর্তব্য, মৌলিক অধিকার ও রক্ষাকবচ সংক্রান্ত বিষয়গুলো। সরকার তার নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন সভার মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করে থাকে। এভাবে সাংবিধানিক বিধি-বিধান ও নির্দেশনার আলোকে নাগরিকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা দেয়া রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ। তাই ২০০৪ সাল ও তার পূর্ববর্তী সময়গুলোতে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদ, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি, সন্ত্রাসী কর্মকা- ও ক্রমবর্ধমান অপরাধ প্রবণতার মতো ভয়াবহ বিষয়গুলো মোকাবিলা করার জন্য র‌্যাবের মতো একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনীর প্রয়োজন অনুভূত হয়। ফলে গড়ে ওঠে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব।
বিশ্বায়ন ও উত্তরাধুনিকতাবাদের ফলে মানুষের জীবনধারণে যেমন এসেছে ভিন্নতা ও গতিময়তা তেমনি অপরাধের ধরন ও প্রকৃতিতে এসেছে বিচিত্র্যতা। সেকেলের সিঁধেল চুরি নয় বরং তথ্যপ্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটিয়ে অভিনব কায়দায় মহাচুরি করার অভিপ্রায় যেন সভ্যতার ভিতরেই লুকিয়েছিল। বস্তুত দুটি বিষয় অপরাধ বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১. দ্রুততম সময়ে অপরাধকে মোকাবিলা করা। ২. অভিনব প্রযুক্তি ও পদ্ধতিতে সংঘটিত অপরাধকে মোকাবিলা করা। ফলে এমন একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়, যা যেকোনো ধরনের অপরাধকে দ্রুততম সময়ে মোকাবিলা করতে পারবে এবং নতুন নতুন অপরাধের প্রকৃতিকে শনাক্ত করে তা মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ‘১৯৭৯ সালের দি আর্মড পুলিশ অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের যাত্রা শুরু হয়।
র‌্যাবের সাফল্যম-িত কাহিনি : র‌্যাব স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। গঠনের পর হতেই একের পর এক সাফল্যম-িত গল্পমালার অংশীদার হয়ে পড়ে র‌্যাব। একটি উন্নত ও ডিজিটাল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে আইনশৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি শর্ত। এ সকল বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব তার কার্যপরিধির মধ্য থেকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তা নিম্নরূপ :
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে র‌্যাব
বাংলাদেশসহ সমস্ত বিশ্বের অন্যতম সমস্যা হলো জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ। জঙ্গিবাদ এটি কোনো নির্দিষ্ট ভাষা, এলাকা বা পরিচিতির নাম নয় বরং বহুরূপে, গুণে ও বর্ণে মিশ্রিত ধ্বংসাত্মক একটি মতবাদ হলো জঙ্গিবাদ। সাধারণত কোনো বিশেষ দল তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও মতাদর্শগত প্রাধান্য বিস্তার করার অভিপ্রায়ে সহিংসতা ঘটিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করে। কখনো হরকাতুল জিহাদ (হুজি), কখনো জামায়াতুল মুজাহেদিন অব বাংলাদেশ (জেএমবি) নামে তারা তাদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করে থাকে এবং জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের হামলা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এতে ৯ জন ইতালিয়ান, ৭ জন জাপানি, ১ জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, ২ জন বাংলাদেশি ও ১ জন ভারতীয়সহ মোট ২০ জন নিহত হন এবং তাদের এ আক্রমণ ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিত। তাই তারা শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং নারকীয় সেই হত্যাযজ্ঞের বীভৎস ছবি সামাজিক মিডিয়াতে ছেড়ে দিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে। এভাবে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কালো থাবা মাঝে মাঝে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। তখন বহুমাত্রিক গুণে র‌্যাবের পদচারণা দীপ্ত আওয়াজে উদিত হতে থাকে। জেএমবির প্রধান সংগঠক শায়খ আব্দুর রহমান, দ্বিতীয় নেতা মো. সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ প্রায় ১ হাজার ২৮৪ জন জঙ্গিকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও উল্লেখ করার মতো রয়েছে বর্তমান সময়ের জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের প্রধান সারোয়ার জাহান ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান। এছাড়া র‌্যাবের চৌকস অফিসারদের অনুপম অভিজ্ঞতা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষতা এবং সুনিপুণ কর্মদক্ষতা ও পরিকল্পনার কারণে গুলশান হামলার পর হতে কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার চেষ্টা পর্যন্ত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ৭২ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ও ৭ জন আত্মসমর্পণ করেছে। এছাড়াও কুমিল্লায় ওই হামলা চেষ্টার পর হতে অদ্যাবধি বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ২৯ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব, যাদের প্রত্যেকে জেএমবি সদস্য। ‘অপারেশন কিয়ার’-এর মাধ্যমে দক্ষতা ও সাহসিকতার সাথে র‌্যাব আতিয়া মহল হতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ২টি মৃতদেহ ও ৯টি বিস্ফোরকসহ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম, রাসায়নিক ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও বোমা তৈরির উপাদান উদ্ধার করার মাধ্যমে বিস্ফোরক মুক্ত করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে। গত বছরের জানুয়ারি হতে এ পর্যন্ত মোট ১১৬ জন জঙ্গিকে র‌্যাব গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ৯৪ জন জেএমবির সদস্য, ৪ জন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, ১৪ জন হুজি সদস্য, ৩ জন হিযবুত তাহরির ও ১ জন শহীদ হামজা ব্রিগেডের সদস্য। এছাড়া বিভিন্ন দেশি-বিদেশি অস্ত্র ১২টি, গোলাবারুদ ৩৫৮ রাউন্ড, গ্রেনেড/বোমা/ককটেল ১১১টি, ডেটোনেটর, বিভিন্ন প্রকার বিস্ফোরক এবং বিপুল পরিমাণ উগ্রবাদী বই/সিডি/লিফলেট/পোস্টার জব্দ করেছে র‌্যাব। ফলে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ এখন নির্জীব ও নিষ্প্রাণ প্রায়। র‌্যাবের সফল আভিযানিক সক্ষমতা ও বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দা কর্মকা-ের ফলে জঙ্গিবাদমুক্ত বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো একটি বাস্তবতা, একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য ও নিখুঁত সফলতা।
সুন্দরবন এবং জেলেদের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় র‌্যাবের অবদান : দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। অনুপম পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীব-বৈচিত্র্য আর অপার সৌন্দর্যের ডালিতে পরিপূর্ণ এ বিশ্ব ঐতিহ্যের বনভূমি। সুন্দরবন একদিকে যেমন বিশ্বের সেরা রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর মনোমুগ্ধকর হরিণের আবাসস্থল তেমনি নানা প্রজাতির পাখি ও মাছের উৎকৃষ্ট আশ্রয়স্থল। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক দিক থেকে এ বন বাঙালি ও বাংলাদেশের কাছে অতীব আপন ও অর্থবহ। এখানকার জেলেজীবন ও জীবিকাপ্রণালি মিলে গড়ে ওঠে একটি সুন্দর মেলবন্ধন। কিন্তু তাতে ব্যাঘাত ঘটায় বনদস্যু, জলদস্যু আর কিছু ডাকাতের নীলনকশা। তাই সুন্দরবনের উপকূলীয় মানুষ ও পেশাজীবী তথা কাঠুরে ও জেলেদের ওপর চলে আসে নির্যাতনের অমোঘ খড়গ। তাদের বন্দি করে চাওয়া হতো মুক্তিপণ নতুবা হত্যা করা হতো। নিঃস্ব করে ফেলা হতো এসব হতদরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে। পাশাপাশি সুন্দরবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হতে থাকে। ফলে র‌্যাবের উপস্থিতির প্রয়োজন ঘনীভূত হতে থাকে। তখন স্থলের পাশাপাশি জলেও র‌্যাবের মহিমা উদ্ভাসিত হতে থাকে। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে প্রজ্ঞাপনের আলোকে র‌্যাবের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে ২০১২ সালে গঠন করা হয় টাস্কফোর্স। এ পর্যন্ত র‌্যাবের ১০৮টি সফল অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে ২৪৩ জন জলদস্যু গ্রেপ্তার, ৫৮৭টি অস্ত্র ও ১৫ হাজার ৫১৪ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া আরও ৭২টি সফল অভিযান পরিচালনা করে ৬৬ জন বনদস্যুকে গ্রেপ্তার, ৩০৩টি অস্ত্র ও ৭ হাজার ৭০৩ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে র‌্যাব। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সচেতনতা সৃষ্টির কাজে বিশেষ অবদান রাখায় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক র‌্যাব ফোর্সেসকে (ইধহমধনধহফযঁ অধিৎফ ঋড়ৎ ডরষফষরভব ঈড়হংবৎাধঃরড়হ-২০১৫) প্রদান করা হয়। এছাড়া সম্প্রতি ১০টি জলদস্যু বাহিনীর ১০৭ জন সদস্য ২ হাজার ১৬টি অস্ত্র এবং ১১ হাজার ৩৮০ রাউন্ড গুলিসহ র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ করানো ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সুন্দরবন এখন দস্যুদের অভয়ারণ্য নয়, বরং এটি একটি নিরাপদ জনপদ, যেখানে মনোরম পরিবেশে সুবিশাল জলের কলকাকলি, পাখির কূজন ও মানব জীবনের মধুময় জীবনযাত্রার ছন্দময় গতি সমান্তরালে প্রবাহিত হচ্ছে শান্তি ও স্বস্তির সুবাতাসে।
চরমপন্থি দমনে র‌্যাবের ভূমিকা : দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা তথা কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মেহেরপুর এলাকা এক সময় চরমপন্থিদের দখলে ছিল। সন্ত্রাস চাঁদাবাজি, রাহাজানি, খুন লুটতরাজ ছিল এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব তার চিরচেনা ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে থাকে। গ্রেপ্তার করে চরমপন্থি দলের শীর্ষ নেতাদের এবং উদ্ধার করে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ। ফলে এলাকার মানুষের মধ্যে ফিরে আসে শান্তির সুবাতাস ও স্বস্তির আবহ। নিরীহ জনগণকে চাঁদাবাজি আর লাল চিঠির দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত করার এ সাফল্য গাথা এখন এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে উচ্ছ্বাসিত ও সূর্যের আলোর মতো দেদীপ্যমান। ফলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এখন একটি শান্ত জনপদের নাম। যার ফলে এ অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য আর প্রাণের উচ্ছ্বাস। র‌্যাবের এ অবদান সত্যিই প্রশংসনীয় ও যুগোপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে র‌্যাব
নারী-পুরুষ, জাতি ও ধর্ম ভেদাভেদে সবাই সমান অধিকার ও মানবাধিকার পাবে এটা মহান সংবিধানে বর্ণিত আছে। রাষ্ট্র এটাই বাস্তবায়ন করে থাকে। তাই অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার অন্যতম প্রধান কাজ। এ লক্ষ্যে র‌্যাব ১০ হাজার ১১৭ জনকে অস্ত্র সংক্রান্ত বিষয়ে গ্রেপ্তার করেছে এবং উদ্ধার করেছে ১৩ হাজার ৫৭৬টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭৫৭ রাউন্ড গোলাবারুদ, ১৮ হাজার ৯৯৩টি ককটেল/বোমা/গ্রেনেড এবং ৫ হাজার ৬০১ দশমিক ৫৪ কেজি বিস্ফোরক ও ৩৩৪টি ট্যাংক বিধ্বংসী উচ্চ বিস্ফোরক। র‌্যাবের এ কর্মদীপ্ত অভিযানের ফলে দেশে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসছে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের প্রতি জিরো টলারেন্স মনোভাব নিয়ে র‌্যাব সদা জাগ্রত। র‌্যাবের ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান একদিকে যেমন সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতাকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে তেমনি দাগী ও তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হচ্ছে। র‌্যাব এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৭৭ হাজার ১৬২ জনকে বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দায়ে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
মাদকদ্রব্য ও র‌্যাবের জনমুখী ভূমিকা
মাদকের ভয়াল ছোবলের কবলে গ্রাস হচ্ছে অনেক মানুষের জীবন, যৌবন ও সংসার। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামাজিক প্রতিষ্ঠানে, রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক আঙ্গিনায়ও। তাই মাদকের এ ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় র‌্যাব সর্বদা অকুতোভয় ও নির্ভীক। এ পর্যন্ত র‌্যাব কর্তৃক মাদক সংক্রান্ত বিষয়ে ৬৩ হাজার ৭৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৪৬১ দশমিক ২৫৮ কেজি হেরোইন, ২৯ লাখ ৪০ হাজার ৫৭৫ বোতল ফেন্সিডিল, ১ কোটি ৬৮ লাখ ৬০ হাজার ৭২৬ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১ লাখ ৫৭ হাজার ১৩২ বোতল বিদেশি মদ, ৩৫ লাখ ৭০ হাজার ৪৮৭ লিটার দেশি মদ, ৭১ হাজার ৪৩ কেজি গাঁজা, ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬০ ক্যান বিয়ার উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ২৭ কেজি কোকেন, ২৫ হাজার ৭২৯ কেজি আফিম, ৭৬ লাখ ৫৮ হাজার ৯৪৪টি ভায়াগ্রা ট্যাবলেট, ৫ হাজার ৯২টি আইসপিল ট্যাবলেট, ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫৬২টি নেশা জাতীয় ইনজেকশন ও ২ লাখ ৮০ হাজার ৬০৯টি সেনেগ্রা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে। মাদকের বিস্তার রোধ ও উদ্ধার অভিযানে র‌্যাবের সাফল্য সত্যিই অবিস্মরণীয়। র‌্যাবের চৌকস কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতার ফলে এ বিশাল দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।
অপহরণ : সংঘবদ্ধ অপরাধীদের কাছে অপহরণ একটি চমকপ্রদ কৌশল। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করা তাদের অন্যতম প্রধান কাজ। র‌্যাবের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও চৌকস গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক-এর মাধ্যমে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে এবং ভিকটিমকে উদ্ধার করা হচ্ছে। র‌্যাব এ পর্যন্ত ২ হাজার ২৮৪ জন অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার এবং ১ হাজার ৩৯৯ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
নারী ও শিশু অধিকার রক্ষায় র‌্যাবের ভূমিকা একটি সুষম উন্নয়ন প্রতিষ্ঠায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সমান অংশগ্রহণ ও সুযোগ নিশ্চিতকরণ জরুরি। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার বেড়াজালে এ ধরনের সুষম উন্নয়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সব সময় সম্ভব হয় না। তাই বরাবরই নারী ও শিশু নির্যাতিত হয় এবং অধিকার বঞ্চিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই র‌্যাব নারী ও শিশুর অধিকার রক্ষায় সোচ্চার। ইভটিজিং ও যৌন হয়রানির অভিযোগে র‌্যাব এ পর্যন্ত ২৭৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
মানব পাচার প্রতিরোধে র‌্যাবের ভূমিকা বিশ্বায়নের এ যুগে অপরাধ ও অপরাধমূলক অপতৎপরতা শুধু রাষ্ট্রীয় গ-ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের সর্বত্র। ট্রান্সন্যাশনাল অপরাধগুলো এভাবে দেশ ও জাতিকে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে। মানবপাচার এরকম একটি জঘন্য ঘৃণ্যতম অপরাধ। কখনো দারিদ্র্যের চাপে কিংবা উন্নত জীবনের স্বপ্নে ভিন দেশে পাড়ি জমাতে চায় কিছু সহজ সরল নাগরিক। একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিদেশে পাঠানোর নামে এদেরকে জিম্মি করে ফেলে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে র‌্যাব এ পর্যন্ত ১৬৫টি অভিযান পরিচালনা করে ৪৭১ জন মানব পাচারকারীকে গ্রেপ্তার এবং মানব পাচারের শিকার ৭২৭ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
ভেজালবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের ভূমিকা
সুস্থ দেহ ও মন সকল প্রশান্তির উৎস। আর এর পেছনে যেসব উপাদানের ভূমিকা অপরিসীম সেগুলো হলো বিশুদ্ধ খাবার ও টেকসই মেডিকেয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু কিছু মুনাফালোভীদের নীলনকশায় এ খাতগুলো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে ভেজাল খাদ্য, পানীয় ও ওষুধের বিরুদ্ধে র‌্যাব ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে যুুগোপযোগী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিচ্ছে। অদ্যাবধি খাদ্য, ওষুধ ও অন্যান্য পণ্যের ভেজাল সংক্রান্ত অপরাধে র‌্যাবের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১৫ হাজার ৭৯৩টি মামলায় ১১৫ কোটি ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৯১৭ টাকা জরিমানা ও ৯ হাজার ৮৭৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- প্রদান করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে র‌্যাবের এ পথচলা আনন্দের, গৌরবের ও প্রশংসার; যা টেকসই উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
শেষ কথা : জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান এবং মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ প্রত্যেকটি সরকারের অন্যতম প্রধান কাজ। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানসমূহ এসব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের মাধ্যমে এগুলো নিশ্চিত করে থাকে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে র‌্যাব তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ আইনানুগভাবে এবং সুচারুরূপে সম্পন্ন করছে। ফলে দেশে একদিকে যেমন জঙ্গি, মাদক ও সন্ত্রাসের দৌরাত্ম্য কমেছে তেমনি খুন, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- হ্রাস পেয়েছে। র‌্যাবের এ সকল কর্মপ্রচেষ্টা বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে এবং টেকসই উন্নয়নের অব্যাহত ধারাকে ত্বরান্বিত করতে সক্রিয় সহায়তা করছে।
লেখক : র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস)
হিসেবে বর্তমানে কর্মরত