প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

শিক্ষার মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে কওমি সনদের স্বীকৃতি : শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্তে স্বস্তিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীকে শিক্ষার মূল স্রোতধারায় ফিরিয়ে আনতে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কওমি মাদ্রাসা শিা বোর্ডের অধীন সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের সনদ ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি সাহিত্যের মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) ডিগ্রির সমমর্যাদা পাবে। গত ১১ এপ্রিল গণভবনে কওমি মাদ্রাসার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ঘোষণা দেন। কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে এবং দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতিগুলোকে ভিত্তি করে এ মর্যাদা দেয়া হলো বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সনদের স্বীকৃতি পাওয়ায় উদ্বেলিত ও উচ্ছ্বসিত। এ ধরনের একটি সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ায় তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তাদের কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন কওমি মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস শিার্থীরা দেশে-বিদেশে মাস্টার্স পাস সমমানের মর্যাদা পাবেন। অন্য মাধ্যম থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা শিার্থীদের সঙ্গে একই চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন তারা। এত দিন স্বতন্ত্র ধারার এই শিা ব্যবস্থার সনদের কোনো স্বীকৃতি ছিল না। এখন এই স্বীকৃতি পাওয়ায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থী ও কয়েক হাজার শিক্ষকের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছে। ৩ যুগেরও বেশি সময় ধরে তারা যে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করছেন, সে আন্দোলন ফলপ্রসূ হয়েছে গত ১১ এপ্রিল।
সেদিন কওমি মাদ্রাসার আলেম-ওলামাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রথমে একটা প্রজ্ঞাপন হবে। তারপর আপনারা যেভাবে চান সব কিছু মিলিয়ে একটা আইনি ভিত্তি যেন হয় সে বিষয়ে আমরা চিন্তাভাবনা করব। এখানে আমাদের প্রাথমিক ও গণশিামন্ত্রী এবং শিামন্ত্রী রয়েছেন, রয়েছেন সচিবরা, আমার দপ্তরের মুখ্যসচিব রয়েছেন এবং অন্য কর্মকর্তারা রয়েছেন, আমি আশা করি তারা যথাযথ পদপে নেবেন। যাতে এ সনদের স্বীকৃতি দ্রুত হতে পারে। আপনাদের মতামত যেটা আমার কাছে এসেছে, সবার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে এবং দেওবন্দের যে মূলনীতি সেটার ওপর ভিত্তি করেই এটা হবে।’ উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার অনুযায়ী ১৩ এপ্রিলই এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। ১৪ লাখ শিার্থীর কথা ভেবেই কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে সাধারণ শিার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সমান স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানালেও দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেকেই এর সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন। সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, আমি নাকি হেফাজতের সঙ্গে সন্ধি করে ফেলেছি, চুক্তি করে ফেলেছি। চুক্তিটা কি করলাম? হেফাজতের সঙ্গে আমাদেরতো কোনো চুক্তি হয়নি। চুক্তির প্রশ্নই ওঠে না। গণভবনে ১৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের শুরুতে শেখ হাসিনা কওমি সনদের স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, তাদের কী মূল স্রোতধারায় নিয়ে আসব না?
প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের শিার েেত্র কওমি মাদ্রাসার অবদান রয়েছে এটাকে অস্বীকার করা যাবে না। দেওবন্দ যে কওমি মাদ্রাসা, যারা প্রথম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু করে তাদের হাতেই তৈরি, তারাই করেছিল। সেখানকার যে কারিকুলাম সেটা কিন্তু ভারত গ্রহণ করেনি। ভারতে যদি আপনারা খোঁজ নেন তাহলে দেখবেনÑকলকাতায় যেসব মাদ্রাসা আছে সেখানে হিন্দু-মুসলমান সকলেই লেখাপড়া করছে। এরকমও মাদ্রাসা আছে যেখানে ৪০ ভাগ হিন্দু শিার্থীও রয়েছে। আমাদের কওমি মাদ্রাসার শিাটা ৬টি বোর্ডে বিভক্ত। তাদের কারিকুলাম আলাদা। এখানে যে কি পড়ালেখা হচ্ছে তার খবরটা কেউ কোনোদিন রাখেনি। তারা সেখানে ফার্সি, আরবি, উর্দু প্রভৃতি ভাষা শেখায়। পাশাপাশি অনেক মাদ্রাসায় আবার কমপিউটারসহ আধুনিক অনেক কিছুই শেখাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা একবার চিন্তা করে দেখেন ১৪ লাখ শিার্থী এই ৭৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় শিা লাভ করছে। তাদের কারিকুলাম কী, কী তারা শিখছে কেউ বলতেই পারছে না। সেই জায়গাটায় আমরা এটা উদ্যোগ নিয়েছি, যে উদ্যোগটা আমাদের বহু আগের নেয়া; তাদের কারিকুলামটা ঠিক করে দেয়া। যাতে করে তাদের শিাটা যেন মানসম্পন্ন হয় এবং এই যে শিার্থীরা প্রতি বছর ওইখানে শিা গ্রহণ করে সেই শিাটা যেন সঠিক পথে অর্জিত হয়। আর এই শিার মাধ্যমে তাদের যেন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাটা হয়। জীবনজীবিকা নির্বাহ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।
শেখ হাসিনা বলেন, এ জন্য আমি ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পরে যখন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতে ছিলাম সে সময় এই শিাটা নিয়ে মাদ্রাসার শিকদের নিয়ে বসি, আলাপ-আলোচনা করি এবং তাদের ওপর দায়িত্ব দিই-আপনারাই ঠিক করেন আপনাদের কারিকুলামটা কী হবে, আমরা একটা সনদ দিতে চাই। কারণ সংবিধানেই আছে শিাটা সার্বজনীন এবং শিাকে সব থেকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকারটা আমাদের সংরণ করতে হবে। এটা হলো বাস্তবতা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ জন্য আমি আলেম-ওলামাদের নিয়ে একটি কমিটি এবং পরে একটি কমিশন গঠন করি। তাদেরই দায়িত্ব দেয়া ছিল আপনারা একটা জায়গায় বসে একটি সমঝোতায় আসেন। তাদের সনদ দেয়ার জন্য আমরা আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ও করে দিয়েছি। যেখান থেকে তারা সনদটা পেতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর ৬টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের লোকজন এক হয়ে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে তারা কারিকুলামটা গ্রহণ করবেন। শেখ হাসিনা বলেন, যখন তারা এক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তখনই আমরা ঘোষণা দিলাম যে, আমরা সনদ দেব। আর তাদের কারিকুলামগুলো কেমন হবে সেটির জন্য একটি কমিটিও গঠন করে দেয়া হয়েছে। তাদের অফিসও দেয়া হয়েছে, তারা সেখানে বসে এই কারিকুলামটা ঠিক করবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এখানে বলব, এই যে ১৪ লাখ শিার্থী মূল স্রোতধারার বাইরে পড়ে ছিল তাদের আমরা মূল শিা ব্যবস্থার মধ্যে এনে শিা ব্যবস্থাটাকে ইনকুসিভ করতে চাই। কাজেই যারা এটা নিয়ে নানা কথা ছড়াচ্ছেন তাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন এই ১৪ লাখ শিার্থীর দোষটা কোথায়? এখানে কার সঙ্গে কার সন্ধি হয়ে গেল, চুক্তি হয়ে গেল এসব কথার মানেটা কী?
উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলে কওমি মাদ্রাসার যাত্রা শুরু হয়। সারাদেশে প্রায় ৭৫ হাজার কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিার্থী পড়াশোনা করে। আওয়ামী লীগ সরকার কওমি মাদ্রাসার শিা সনদের স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নেয়ার পর ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিা কর্তৃপ’ গঠনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু মাদ্রাসাগুলোর সবাই একমত না হওয়ায় তা এখনো ঝুলে আছে। তবে শিগগিরই বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিা কর্তৃপ গঠিত হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র স্বদেশ খবরকে নিশ্চিত করেছে।