প্রতিবেদন

২০২১ সালের মধ্যে প্রথম সারির আধুনিক বন্দর হবে চট্টগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক : চট্টগ্রাম বন্দরের সমতা দিন দিনই বাড়ছে। ২০২১ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর স্থান করে নেবে বিশ্বের সেরা ৩০টি বন্দরের তালিকায়। সরকার প্রতিবেশী দেশকে বন্দর ব্যবহারের সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে প্রস্তুত রয়েছে বন্দর কর্তৃপ। ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩০ বছর পূর্তি ও বন্দর দিবস উপলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেন বন্দর কর্তৃপরে চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল, বিএসপি, এনডিসি, পিএসসি। তিনি জানান, ২০১৫ সালে এই বন্দর ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৬৪ হাজার ৯২৯ মেট্রিক টন কার্গো এবং ২০ লাখ ২৪ হাজার ২০৭ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করে লয়েড লিস্ট প্রকাশিত বিশ্বের সেরা ১০০টি কন্টেইনার পোর্টের মধ্যে ৭৬তম স্থান দখল করেছে। পান্তরে, ২০১৬ সালে হ্যান্ডলিং হয়েছে ৭ কোটি ৭২ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ মেট্রিক টন কার্গো এবং ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৯০৯ টিইইউএস কন্টেইনার। ১ বছরে কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ১৫ দশমিক ৯ এবং প্রায় ১৭ শতাংশ। আশা করছি, লয়েড লিস্টে এ বছর বন্দরের অবস্থান আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। সরকারের রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ ও সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস ২০৩০ কে সামনে রেখে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে এ বন্দর ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রথম সারির একটি স্মার্ট পোর্টে রূপান্তরিত হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বলেন, পৃথিবীর সকল দেশই এখন রিজিয়ন নিয়ে চিন্তা করে। দুয়ার বন্ধ করে থাকার দিন চলে গেছে, দুয়ার খুলতে হবে। তবে সবকিছুই হবে নিজের স্বার্থকে অুণœ রেখে। আমদানি-রপ্তানি এবং দেশের অর্থনৈতিক গ্রোথের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বন্দরের সমতার প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বন্দরের গ্রোথ কমে গেলে তা দেশের অর্থনীতিকে অ্যাফেক্ট করবে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরকার দেশে নতুন নতুন বন্দর গড়ে তোলা এবং নৌপথ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নেও বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এর মধ্যেই নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ৩০ শতাংশ সংগৃহীত হয়েছে। ২০১৯ সালের মধ্যে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) কাজ শেষ হবে। কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনালের (কেসিটি) কাজও শেষ করা হবে। ২০২১ সালের মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত বে-টার্মিনালের প্রথম পর্বের নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এছাড়া মীরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজী ইকোনমিক জোনকে সাপোর্ট দিতে মিরসরাই ও সীতাকু-ের মাঝামাঝি স্থানে মধ্যম আকারের একটি বন্দর নির্মাণের সমীা চলছে।
ভারতের ৩ অঙ্গরাজ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, সীমান্তবর্তী ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন রাজ্যে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নসহ কার্যক্রম চলছে। গ্র্যাজুয়েলি চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নও ঘটছে। সুতরাং তেমন সিদ্ধান্ত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তুতি রয়েছে বলে তিনি জানান।
চট্টগ্রাম বন্দর দিবস উপলে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বন্দর কর্তৃপরে সদস্য (এডমিন অ্যান্ড প্লানিং) মো. জাফর আলম, সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর জুলফিকার এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ। তারাও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা এবং চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তুলে ধরেন।
২৫ এপ্রিল ছিল চট্টগ্রাম বন্দর দিবস। ১৮৮৮ সালের ২৫ এপ্রিল প্রণীত হয়েছিল পোর্ট কমিশনার অ্যাক্ট-১৮৮৭। সে হিসাবে বন্দর কর্তৃপ এবার জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করছে ১৩০তম বর্ষপূর্তি। এ উপলে বন্দর ভবনসহ পুরো এলাকা শোভিত হয় রং-বেরঙের পতাকায়। বন্দর কর্তৃপ ছাড়াও বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগেও ছিল বিশেষ ভোজের আয়োজন। এদিন অন্তত ১২ হাজার মানুষকে ভোজে আপ্যায়ন করা হয়। এছাড়া অনুষ্ঠান সূচির মধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও ছিল, যাতে সংগীত পরিবেশন করেন খ্যাতিমান শিল্পীরা। তবে এবারের নতুন এবং বিশেষ আকর্ষণ ছিল দু’দিনব্যাপী পোর্ট এক্সপো।
চট্টগ্রাম বন্দর কার শেডে ২৭ এপ্রিল শুরু হয় প্রথমবারের মতো পোর্ট এক্সপো। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ এক্সপো উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম যাতে অুণœ থাকে সে জন্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রা করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দতার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার আহ্বান জানান। পোর্ট এক্সপো উদ্বোধনকালে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর এই বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত, নেপাল, ভুটান যাতে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে পারে সে সুযোগ করে দিচ্ছি। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো বেশি সমৃদ্ধ হবে। এ েেত্র এই বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সরকারপ্রধান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখান বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগের চমৎকার একটি জায়গা। বন্দরকে উন্নত করা, আধুনিক করার েেত্র আমরা মতায় আসার পর থেকে অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। সব েেত্রই আমাদের দৃষ্টি রয়েছে। বন্দর আধুনিকায়নে গুরুত্ব দিচ্ছি। সমতা বাড়ানোর জন্য কাজ করছি। তিনি আরো বলেন, এক্সপোর মাধ্যমে সুনাম বাড়বে। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে আমরা স্বাবলম্বী করতে চাই। ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চাই। যে ল্য নিয়ে জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই, তাঁর আদর্শ নিয়েই সরকার গঠনের পর থেকে কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসাবাণিজ্য সম্প্রসারণ ও দেশকে অর্থনৈতিকভাবে আরো গতিশীল করাই আমাদের ল্য। বন্দর আমাদের দেশের জন্য বিশাল সম্পদ।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের পে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম; তিনি সমৃদ্ধির স্বর্ণদ্বার খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি মোকাবিলায় বে-টার্মিনালকে সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ৮ বছরে লয়ডস লিস্টে চট্টগ্রাম বন্দর ২২ ধাপ এগিয়েছে। অবস্থান আরো শক্তিশালী হচ্ছে। কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ শিগগিরই শুরু হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ব্ল“ ইকোনমি শক্তিশালী হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং চলমান প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল। অনুষ্ঠানে বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। ২৮ এপ্রিল পোর্ট এক্সপোর সমাপ্তি ঘটে। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।