প্রতিবেদন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সফল অপারেশনে ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হচ্ছে জঙ্গি কর্মকাণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক সফল অপারেশনে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে জঙ্গিদের আধিপত্য। জঙ্গি আস্তানার সন্ধানে সারাদেশে অভিযান চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তার হচ্ছে জঙ্গিরা। সাঁড়াশি অভিযানের মুখে গত প্রায় ১০ মাসে সারাদেশে অন্তত ২০টি আস্তানার সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অভিযানে নিহতের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। নিহতদের মধ্যে জঙ্গিদের স্ত্রী ছাড়াও তাদের ছোট ছোট সন্তানও রয়েছে। এসব নিহত জঙ্গিদের মধ্যে অন্তত ২০ জন আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলাকালে তারা নিজেরাই নিজেদের হেফাজতে থাকা শক্তিশালী বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলরা বলছেন, গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলার পর জঙ্গিদের আর কোনো তৎপরতা অনেকদিন লক্ষ্য করা যায়নি। শুধু উত্তরা র‌্যাব সদরদপ্তরে এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে পুলিশ চেকপোস্টে আত্মঘাতী হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হামলা চালানোর আগেই পৃথক দুটি ঘটনায় দুই আত্মঘাতী জঙ্গির মৃত্যু হয়। এরপর জঙ্গিদের আর কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি। সাঁড়াশি অভিযানের মুখে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক অনেকটাই গুঁড়িয়ে গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দশ বছরের মধ্যে দেশ পুরোপুরি জঙ্গিবাদের ঝুঁকি থেকে প্রায় শতভাগ মুক্ত হয়ে যাবে।
গত বছরের ১ জুলাই রাজধানীর অভিজাত এলাকা ও কূটনৈতিক পাড়া হিসেবে পরিচিত গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গিরা হামলা করে ১৭ বিদেশি ও ৩ বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এমন ঘটনায় নড়েচড়ে বসে সরকার। এ নিয়ে সারা দুনিয়ায় হইচই পড়ে যায়। হত্যাকা-ের পর আইএসের নামে দায় স্বীকার করে বিবৃতি প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত সেখানে সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা অভিযান চালান। অভিযানে ৫ জঙ্গির মৃত্যু হয়। কমান্ডোরা জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেন ৩ বিদেশিসহ ১৩ জিম্মিকে। সব মিলিয়ে আগে ও পরে হলি আর্টিজানের জিম্মি দশা থেকে ৩৩ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এমন ঘটনার পর বাংলাদেশে আইএসের তৎপরতা রয়েছে বলে গোটা বিশ্বে প্রচার প্রপাগান্ডা চলতে থাকে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, হলি আর্টিজানের তদন্ত করতে গিয়ে ঘটনাটি নব্য জেএমবি ঘটিয়েছে বলে বেরিয়ে আসে। এ নিয়ে সারাদেশে টানা অভিযান চলতে থাকে। এসব অভিযানে কয়েক শ’ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। এর মধ্যে অন্তত ৭৫০ জঙ্গির জবানবন্দি পর্যালোচনা করা হয়। সেই জবানবন্দিতেই মিলে জঙ্গিদের অবস্থান সম্পর্কে নানা তথ্য। সেই তথ্যের সূত্র ধরেই একের পর এক সন্ধান মিলতে থাকে জঙ্গি আস্তানার। ইতঃপূর্বে ঢাকায় বেশ কয়েকটি আস্তানার সন্ধান মিলে। গত ৭ মার্চ কুমিল্লা হাইওয়ে পুলিশের একটি চেকপোস্টে হামলাকালে গ্রেপ্তার হয় দুই জঙ্গি। দুই জঙ্গির জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসে নব্য জেএমবির আরও হামলার পরিকল্পনার তথ্য। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের সীতাকু-ে দুটি জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মিলে। সীতাকু- থেকে গ্রেপ্তারকৃত জঙ্গি দম্পতির তথ্য মোতাবেক মিলে সিলেটের আতিয়া মহলের জঙ্গি আস্তানার সন্ধান। সেখানে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো দলের নেতৃত্বে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
চলতি বছরের ১৫ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামের সীতাকু-, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, মৌলভীবাজারের বড়হাট ও নাসিরপুর এবং কুমিল্লার কোটবাড়ীতে ৫টি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার সন্ধান মিলে। আস্তানাগুলোতে অভিযানে ৫ শিশু, ৫ নারীসহ ১৯ জন নিহত হয়। এদের মধ্যে ১৬ জনই আত্মঘাতী ছিল। প্রতিটি আস্তানা থেকে প্রচুর পরিমাণ বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়।
প্রসঙ্গত, আতিয়া মহলে সেনাবাহিনীর অভিযান চলাকালে ২৫ মার্চ সিলেটে জঙ্গিরা নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেই জোড়া বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায়। বোমা হামলায় নিহত হন র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ ৭ জন। এছাড়া গত ১৭ মার্চ ঢাকার আশকোনায় র‌্যাব সদরদপ্তরের ব্যারাকে এবং ২৪ মার্চ আশকোনা পুলিশ বক্সের কাছে দুটি আত্মঘাতী হামলায় দুই আত্মঘাতী জঙ্গি নিহত হয়।
এরপর গত ২২ এপ্রিল ঝিনাইদহ ও ২৬ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুইটি জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। তবে ঝিনাইদহের আস্তানায় কোনো জঙ্গিকে পাওয়া যায়নি। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের আস্তানাটি ছিল জঙ্গিদের বিস্ফোরক দ্রব্যের ভা-ার বা স্টোর হাউজ। এ অভিযানে ৪ জনের মৃত্যু হয়। তারা আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয় বলে অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান।
সর্বশেষ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বেণীপুর গ্রামে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। ‘সান ডেভিল’ নামের ওই অপারেশন চলাকালে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে এক নারীসহ ৫ জন নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে ৪ জন একই পরিবারের সদস্য। এ ঘটনায় আব্দুল মতিন নামে একজন ফায়ার সার্ভিস কর্মীও নিহত হন।
জঙ্গি আস্তানা অভিযান সংক্রান্ত নানা বিষয়ে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, কোনো কোনো ঘটনায় কোনো কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সবক্ষেত্রে নয়। কোনো কোনো জঙ্গির কাছ থেকে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে সংগঠনে অর্থায়ন করার তথ্যও মিলেছে। আবার কেউ কেউ চাকরি করে সংগঠনের তহবিলে অর্থের জোগান দিয়ে থাকেন। আবার বিদেশ থেকেও কিছু লোক জঙ্গি অর্থায়ন করে থাকে। যারা বিদেশ থেকে জঙ্গি অর্থায়ন করছেন, তারা বাংলাদেশি। এদের অনেকেই বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। আবার অনেকেই চাকরি বা অন্য কোনো কাজে বিদেশে থাকেন। জেএমবি জাল মুদ্রা ব্যবসার মাধ্যমে সংগঠনে অর্থায়ন করে থাকে। একটি বিশেষ দেশে জাল মুদ্রা তৈরি হয়। এর মধ্যে ভারতীয় জাল মুদ্রার পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সম্পৃক্ততার কথা বিভিন্ন সময় তদন্তে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দূতাবাসের একাধিক কর্মকর্তাকে জঙ্গি অর্থায়নের দায়ে প্রত্যাহার করেও নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক অভিযানগুলোর পর জঙ্গিদের সক্ষমতা অনেকটাই কমেছে। জঙ্গিদের বেশ কয়েকজন সংগঠক এখনও পলাতক। তাদের সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে। সিলেটে জঙ্গি আস্তানা থেকে কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। সেগুলো মানসম্মত নয়। হলি আর্টিজানে হামলার সময়ও তাদের কাছ থেকে একে-২২ এর মতো স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক সদস্য স্বদেশ খবরকে বলেছেন, জঙ্গিদের কর্মকা- সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে মনে হচ্ছে জঙ্গিদের অস্ত্রের ভা-ারে টান পড়েছে। বর্তমান সরকারের কঠোরতায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে জঙ্গিদের কর্মকা-।