প্রতিবেদন

এরশাদের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক জোট : ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : অর্ধশতাধিক ইসলামি দল নিয়ে ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ (ইউএনএ) নামে নতুন রাজনৈতিক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। ৭ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টি প্রধান এরশাদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশের অংশ হিসেবেই ঝানু রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ সম্মিলিত জাতীয় জোট গঠন করেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে এই জোট নিয়েই এরশাদ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে আবারো দরকষাকষিতে নামবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো জাতীয় পার্টিও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে জাপাপ্রধান এরশাদ এককভাবে নির্বাচনের কথা বলে এলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন, সারাদেশে ৩০০ আসনে এককভাবে নির্বাচন করার সাংগঠনিক সক্ষমতা তার দলটির নেই। ফলে জোট করা ছাড়া এরশাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে এসব করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নিকট জাপার গুরুত্ব তুলে ধরাই এরশাদের মূল কাজ এবং সুযোগ বুঝে যেকোনো একটি বৃহৎ দলের দিকে ঝুঁকে পড়া। সমালোচকরা বলছেন, এরশাদ যতটি দল নিয়ে ইউএনএ গঠন করেন তার ১০ ভাগের ১ ভাগ দলের নাম নিজেও বলতে পারবেন না। তিনি মূলত জোটটি গঠন করেন দরকষাকষির জন্য। যত বড় জোট দরকষাকষি তত পোক্ত। আর দরকষাকষি যত পোক্ত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ততটাই পাকাপোক্তÑএই নীতিতে এরশাদ ঢাউস সাইজের এ জোট গঠন করেন।
বিএনপির একটি সূত্র বলছে, এরশাদের এই জোট গঠন নিয়ে তাদের দল মোটেও বিচলিত নয়। কারণ তারা মনে করে তাদের ২০ দলীয় জোটে যেসব ইসলামি দল আছে সেগুলোকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল টুকিয়ে-টাকিয়ে কোনোরকম সংগ্রহ করেছিলেন। ২০ দলীয় জোটের ইসলামি দলগুলোর যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে এরশাদের জোটের ভবিষ্যৎ তারই আমলের আ স ম আব্দুর রবের ৭০ দলীয় জোটের মতোই হবে, তা বিএনপি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। আর এ নিয়ে আওয়ামী লীগের একটি সূত্র বলছে, এরশাদ যত দল নিয়েই জোট গঠন করুক না কেন, তাদের দল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, এরশাদ কোনোদিনই বিএনপির সঙ্গে হাত মেলাবে না। কারণ এরশাদের ওপর যত ধরনের অত্যাচার-অবিচার আছে, সবই চালিয়েছে বিএনপি। এরশাদকে জেলের ভাত খাইয়েছে বিএনপি, দুর্নীতির মামলায় জর্জরিত করেছে বিএনপি; যার জের এখনো তাকে বহন করতে হচ্ছে এবং সর্বোপরি ’৯১ থেকে ’৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকার সময় এরশাদের দলটিকে বিএনপি তছনছ করে ছেড়েছে। এত কিছু করার পরও এরশাদ বিএনপির সঙ্গে যায় কি করে?
এরশাদের নতুন জোট নিয়ে রাজনৈতিক ময়দানে যে যাই বলুক না কেন কার্যত দুটি দল ও দুটি পৃথক জোটের সমন্বয়ে এরশাদ ‘ইউএনএ’ গঠন করেন। যাতে নিবন্ধিত দল মাত্র দুটিÑজাপা ও বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্ট। এর বাইরে থাকা দুটি জোট হলো ‘জাতীয় ইসলামি মহাজোট’ ও ‘বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)’। এই দুটি জোটে দল আছে ৫৫ থেকে ৬০টির মতো; এর সবগুলোই অনিবন্ধিত। ঘোষিত জোট ‘ইউএনএ’-তে সব মিলিয়ে ঠিক কতটি দল আছে সেটিও নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ। ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬৭-এরকম একাধিক সংখ্যার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে জাপার দায়িত্বশীল নেতাদের বেশির ভাগই জানিয়েছেন, সর্বমোট দল ৫৬ থেকে ৫৮টির মতো হবে। তাই সংখ্যার বিচারে এটি এখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট। উল্লেখ্য, দেশে এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ এবং বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট রয়েছে।
অনুমানের ওপর ভর করে জাপার দেয়া তথ্যানুযায়ী ‘ইউএনএ’র শরিক জাতীয় ইসলামি মহাজোটে আছে ৩৪টি ইসলামি দল আর বিএনএ-তে রয়েছে ২২টি দল। জাপার পাশাপাশি এরশাদ নতুন এই জোটেরও চেয়ারম্যান। জোটের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। প্রসঙ্গত, মাসখানেক আগে ৩৪টি ইসলামপন্থি সংগঠন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে ‘জাতীয় ইসলামি মহাজোট’। ২০১৫ সালে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে বিএনএ, পরে তাকেই অব্যাহতি দিয়ে সেকান্দার আলী বিএনএ’র নেতৃত্ব নেন।
নতুন জোটের ঘোষণা দিয়ে ‘ইউএনএ’ চেয়ারম্যান এরশাদ বলেন, রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শের দিক থেকে আমরা সবাই স্বাধীনতার চেতনা, ইসলামি মূল্যবোধ তথা সকল ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আদর্শের অনুসারী। আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে এই জোটে কোনো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির জায়গা হবে না। দেশ ও জাতির প্রয়োজনে এই জোট। এরশাদ বলেন, জোট গঠনের জন্য দু’ভাবে জোটের শরিক নির্বাচনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। যেসব দল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত তারা সরাসরি জোটের শরিক হিসেবে থাকবে। যেসব দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে কিংবা নিবন্ধিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে, তাদের সমন্বয়ে মোর্চা বা জোট গঠন করে সেই জোটকে শরিক হিসেবে বৃহত্তর জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জাপার পক্ষে এরশাদ, ইসলামি ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মান্নান, জাতীয় ইসলামি মহাজোটের চেয়ারম্যান আবু নাছের ওয়াহেদ ও বিএনএ’র চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী নতুন জোটের ঘোষণাপত্রে সই করেন।
জোটগতভাবে জাতীয় ও সব পর্যায়ের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সরকার গঠন এবং দেশের উন্নয়নে কাজ করা এ জোটের উদ্দেশ্য। জোটের অন্তর্ভুক্ত দলের ক্ষেত্রে যেকোনো নির্বাচনে নিবন্ধিত দলের প্রতীক ব্যবহারের বিষয়টি উন্মুক্ত থাকবে।
জোটের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, এই জোট নির্বাচনি ফলাফল মেনে নেবে। ফল যা-ই হোক না কেন, জোট বহাল থাকবে। জোটের স্থায়িত্বের জন্য রাজনৈতিক বিপদে-আপদে, সুদিনে-দুর্দিনে শরিকরা একে-অপরের পাশে থাকবে। স্বার্থের কারণে কোনো দল জোট ছেড়ে যাবে না।
জাপা চেয়ারম্যানের দাবি, জোটের বাইরে থাকা আরো দুটি নিবন্ধিত দলের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। তারাও জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
এদিকে নতুন এই জোটের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকায় ব্যাপক শোডাউন করেন ঢাকা-৪ আসনের জাপা দলীয় এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। অন্য আসনের নেতাদেরও প্রেসক্লাব এলাকায় সক্রিয় দেখা যায়। প্রেসক্লাব এলাকার অনেকেই মন্তব্য করেন, জাতীয় পার্টির নেতারা এই শো-ডাউন করেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে দেখানোর জন্যই।