প্রতিবেদন

এ বছরই শেষ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নির্মাণ কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নির্মাণের কাজ ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। তবে পূর্বনির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী আগামী ১৬ ডিসেম্বরের পরিবর্তে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে এটি উৎক্ষেপণ করা হবে বলে জানা গেছে। সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন, বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ। স্বদেশ খবরকে তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বরের আগেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নির্মাণ কাজ শেষ হবে। কিন্তু ওই দিন বিজয় দিবসে অনেকগুলো রাষ্ট্রীয় আয়োজন থাকায় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে না। এ কারণে জানুয়ারি মাসে উৎক্ষেপণের জন্য নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হবে। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসটি আরো স্মরণীয় করে রাখার জন্য ওই দিনই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে; যাতে তারিখটি বাংলাদেশের স্যাটেলাইট জগতে প্রবেশের মাইলফলক হয়ে থাকবে। শিগগিরই চূড়ান্ত তারিখ ঠিক করা হবে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ব স্যাটেলাইট ক্লাবে প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও বিকাশে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে। তিনি জানান, সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রকল্প পরিচালক পদে পরিবর্তন আসছে। বর্তমান প্রকল্প পরিচালক গোলাম রাজ্জাকের পরিবর্তে বিটিআরসির একজন পরিচালককে এ পদে নিয়োগের প্রস্তাব বিটিআরসি থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই নতুন প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নেয়ার কথা। এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ‘প্রকল্পকে স্বচ্ছ ও গতিশীল রাখার স্বার্থে প্রয়োজন হলে প্রকল্প পরিচালক বদল করা হবে।’
জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ-পরবর্তী তত্ত্বাবধান এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোম্পানি নামে নতুন একটি কোম্পানি গঠন করা হচ্ছে। এ কোম্পানি বাণিজ্যিক কার্যক্রমও পরিচালনা করবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে একাধিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হলে তার দায়িত্বও পালন করবে এই কোম্পানি। বঙ্গবন্ধু-২ ও ৩ স্যাটেলাইট নির্মাণেও সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যায়। জানা যায়, এরই মধ্যে এ কোম্পানি গঠনের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। কোম্পানি আইনে এটি পরিচালনার জন্য আইন মন্ত্রণালয় ইতিবাচক মতামত দিয়েছে। খুব দ্রুত এ কোম্পানির জনবল নিয়োগ এবং কার্যক্রম শুরু করা হবে। নতুন এই কোম্পানি হচ্ছে টেলিযোগাযোগ খাতের ষষ্ঠ রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি। জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোম্পানির এমডি হিসেবে নিয়োগ পেতে এরই মধ্যে একাধিক কর্মকর্তা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেডের বর্তমান এমডি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএসসিসিএলকে ঈর্ষণীয় সাফল্যের দিকে নিয়ে যাওয়ায় সরকারের পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকেই আছেন প্রকৌশলী মনোয়ার হোসেন। তাছাড়া স্যাটেলাইটের সাথে শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতায় দারুণ মিল আছে বিএসসিসিএল এমডি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেনের।
স্যাটেলাইট মহাকাশে কক্ষপথে পাঠানো হলে নিজের অক্ষে ঘুরতে থাকে। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানচিত্র নির্ধারণ, ছবি তোলা, আবহাওয়ার চিত্র, স্যাটেলাইট টিভি দেখতে বেতার তরঙ্গ পরিচালনায় ব্যান্ডউইডথ সঞ্চালনসহ ইত্যাদি কাজ করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশ যে স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করছে, সেটি মূলত ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইট। এর মধ্য দিয়ে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় তথ্য আদান-প্রদান এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক সম্প্রচার মাধ্যমের জন্য ব্যান্ডউইডথ দেয়া সম্ভব হবে। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণের লক্ষ্যে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালেস এলেনিয়া স্পেসের সঙ্গে চুক্তি করে বিটিআরসি। চুক্তি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূস্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও নির্মাণে ঋণের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব পালন করছে ফরাসি প্রতিষ্ঠানটি। নির্মাণ শেষে এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি স্পেস এক্স।
বিটিআরসি জানায়, এরই মধ্যে নির্মাণ কাজ ৭০ শতাংশ শেষ। আগামী ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যেই ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হবে। নভেম্বরের মধ্যেই উপগ্রহটি উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত হবে। এটি নির্মাণে মোট ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ ১ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। বাকি টাকার জোগান দেবে চুক্তিবদ্ধ ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালেস।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য প্রাইমারি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণে গাজীপুরে প্রায় ১৪ একর ও সেকেন্ডারি গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের জন্য রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় বিটিসিএলের নিজস্ব জমিতে ৫ একর জায়গায় দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ কাজ চলছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডার ক্যাপাসিটি থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। এছাড়া বাংলাদেশে টেলিভিশনের সম্প্রচারের জন্য বিদেশি স্যাটেলাইট ভাড়া বাবদ প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশের অরবিটাল স্লটে। আর ভারতের উদ্যোগে সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে ৪ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এ কারণে এ দুটি স্যাটেলাইটের অবস্থান কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইটে থাকছে ১২টি ট্রান্সপন্ডার। বাংলাদেশ এরই মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় ওই স্যাটেলাইটে যোগ দিয়েছে। একটি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের জন্যও থাকছে। একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও ট্রান্সপন্ডারের মালিক হবে। ফলে সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইট বাংলাদেশের মালিকানাধীন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।