প্রতিবেদন

জাতীয় সংসদের ১৫তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : দেশে গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে

নিজস্ব প্রতিবেদক : মাত্র ৫ কার্যদিবস চলার পর শেষ হয়েছে জাতীয় সংসদের ১৫তম অধিবেশন। সংক্ষিপ্ত এই অধিবেশনটি শুরু হয়েছিল গত ২ মে। সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটি ৯ মে পর্যন্ত অধিবেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেও একদিন আগেই তা শেষ করা হয়। এই অধিবেশনে গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের শাস্তির জন্য আইন করার একটি প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়।
৮ মে অধিবেশন সমাপ্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করার মধ্য দিয়ে অধিবেশনের ইতি টানেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এর আগে অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য রাখেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। এ অধিবেশনে মোট বিল পাস হয়েছে ২টি। কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে ১৫১টি নোটিশ পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৯টি গৃহীত এবং গৃহীত নোটিশের মধ্যে ৩টি সংসদে আলোচিত হয়। ৭১ এর ক বিধিতে ৪৫টি নোটিশ আলোচনা হয়। অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর উত্তর দেয়ার জন্য ৫৪টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। যার মধ্যে ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তর দেয়ার জন্য ৮৪৩টি প্রশ্ন পাওয়া যায়; যার মধ্যে মন্ত্রীরা জবাব দেন ৩২৯টির।
সাম্প্রতিক সময়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ‘বাংলাদেশে সম্প্রতি মত প্রকাশের স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করা হয়েছে’ এবং প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার ‘দেশে আইনের শাসন নেই’Ñমন্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদের ১৫তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, দেশে গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বিচার বিভাগ যে স্বাধীন তার একটাই তো প্রমাণ আছে। একজন নেত্রীর একটি মামলায় ১৪০ দিন সময় দেয়া হয়। বিচার বিভাগ স্বাধীন বলেই তো এতদিন সময় দেয়া হয়েছে। আমাদের যদি ওই ধরনের মানসিকতা থাকত তাহলে নিশ্চয়ই দিতে পারত না। আমরা তো সেটা করিনি। ইচ্ছামতো সময় দিয়ে যাচ্ছেন… দিয়েই যাচ্ছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আছে বলেই তো এই সময়টা দেয়া হয়েছে। কাজেই বিচার বিভাগ যে স্বাধীন এই একটা উদাহরণই যথেষ্ট। না হলে তো দিতে পারত না। যদি ৪০-৫০টি রিট হয়, সেসব রিটের নিষ্পত্তি হয় তাহলে কিভাবে বলেন স্বাধীনতা নেই। আইনের শাসন নেই।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এখানে ৭৫০টি পত্রিকা, ৩৪টি টিভি রয়েছে। দেখলাম অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে এই দেশে বাক স্বাধীনতা নেই। যারা রিপোর্টটা করেছে তাদের বলব এই টিভিতে বসে বসে দিনরাত আমাদের বিরুদ্ধে সমানে কথা বলা হচ্ছে। টকশো, আলোচনা একেবারে স্বাধীনভাবে কথা বলছে। আমাদের সমালোচনা যখন করা হয় কই কেউ কি তাদের গলা টিপে ধরেছে? কেউ কি বলছে যে, এ কথা বলা যাবে না। সংসদ নেতা আরও বলেন, সংবাদপত্রও সমানে লিখেই যাচ্ছে। কেউ তো কিছু বলছে না। হ্যাঁ কেউ যদি হলুদ সাংবাদিকতা করে, মিথ্যা ও অসত্য তথ্য দেয়, কারও যদি চরিত্র হনন করে নিশ্চয়ই তারও অধিকার আছে যে সেখান থেকে নিজের ওপর মিথ্যা দোষারোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার। সে অধিকার সবারই আছে। তিনি বলেন, কোনো সংসদ সদস্য বা সাধারণ ব্যক্তি কেউ যদি মানহানির মামলা করে এটা দোষের হয় কিভাবে। সে যদি অপরাধই না করে তাহলে মামলা মোকাবিলা করলেই সত্য বেরিয়ে আসবে। সেটা তো করতে পারবে না কারণ হলুদ সাংবাদিকতা করে ফেলেছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এদেশের গণমাধ্যম সম্পূর্ণভাবে স্বাধীনতা ভোগ করছে, স্বাধীন আছে। বাকস্বাধীনতা ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে। স্বাধীনতা ভোগ করতে হলে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কারও অধিকার ক্ষুণœ করা স্বাধীনতা না। আমাদের দেশে কিছু লোক আছে, এই লোকগুলো এক সময় মনে করত একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এলে তাদের মূল্য বাড়বে, তারা একটা পতাকা পেতে পারেন, তারা একটা কিছু হতে পারেন। অথবা তাদের একটু তোষামুদি, খোশামুদি করা হবে। তাদের মূল্যটাও একটু বেশি থাকে। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের সুযোগটা কম থাকে। তাদের স্বাদ আছে ক্ষমতায় আসার, কিন্তু জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার সাধ্য নেই। অনেকে চেষ্টা করেও দল গঠনে মানুষের কাছ থেকে সাড়া পায়নি। এতে যদি জনগণ সাড়া না দেয় তাহলে দোষ কার। এরাই নানা কথা বলে বেড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বদনাম করা এটাই তাদের চরিত্র। মনে হচ্ছে বদনাম করতে পারলেই নাগরদোলার মতো ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। সেই আশায় তারা থাকে। সেই আশায় গুড়েবালি। এদেশে সেটা আর হবে না।
বিএনপির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্ষমতায় থাকতেও তারা মানুষ হত্যা, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, বিদেশে অর্থ পাচার ছাড়া দেশকে আর কিছু দিয়ে যেতে পারেনি। মার্কিন ফেডারেল কোর্ট এবং সিঙ্গাপুরের আদালতেও খালেদা জিয়ার পুত্রের অর্থ পাচারের ঘটনা প্রমাণ হয়েছে, পাচারকৃত কিছু টাকা আমরা ফেরতও এনেছি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অন্যের বদনাম করে তারা কী পায় জানি না। এদের কাছে জরুরি অবস্থা থাকলেই এদের (সমালোচনাকারী) বাকস্বাধীনতা থাকে। তখন কি বাকবাকুম তাদের। দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আছে তা বিএনপি নেত্রীর মামলায় একটা বড় প্রমাণ। আর দেশে আইনের শাসনও আছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের দমন করছে। আমার প্রশ্নÑ কোনো জঙ্গি নিহত হলেই বিএনপি নেত্রীসহ অন্যদের মনে এত ব্যথা লাগে কেন? তাদের সঙ্গে বিএনপি নেত্রীদের যোগ সূত্রটা কী? জঙ্গিদের হামলা ও আত্মঘাতী ঘটনার সময় কেউ কেউ মারা যাচ্ছে, এটা মানেই মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়। কারণ এরা সুযোগ পেলেই অনেক মানুষের ও দেশের সম্পদ ধ্বংস করত। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও কেন এত কথা? জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গি-সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। যারা ইসলামের নামে মানুষ হত্যা করছে তারা কখনোই বেহেস্তে যাবে না, যাবে সরাসরি দোজখে। ইসলাম ধর্ম কখনোই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও মানুষ হত্যাকে সমর্থন করে না। এদের বিরুদ্ধে পুরো দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।