প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনা : এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইট

নিজস্ব প্রতিবেদক : দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইট (উপগ্রহ) নিয়ে কক্ষপথে উৎক্ষেপণ হয়েছে ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর একটি জিএসএলভি এফ০৯ রকেট। ৫ মে নির্ধারিত সময়েই দেশটির অন্ধ্র প্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে স্যাটেলাইটটির সফল উৎক্ষেপণ হয়। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরপরই এ উপলক্ষে পাকিস্তান ছাড়া বাংলাদেশের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ও ভারতের সরকারপ্রধান নরেন্দ্র মোদিসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সরকারপ্রধান যুক্ত হন ভিডিও কনফারেন্সে। ভারত এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের উদ্যোগ নেয়ার পর ২০১৪ সালের সার্ক সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশকে এ উপগ্রহের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। পাকিস্তান ছাড়া সার্কের সব দেশই তাতে সাড়া দেয়। বাংলাদেশ নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা নিলেও সেই প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হবে না নিশ্চিত হওয়ার পর সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
ইসরোর তৈরি ৪০ কোটি ডলারের এই জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের পুরো ব্যয় বহন করেছে ভারত। এই কৃত্রিম উপগ্রহের ১২টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ১টি পাচ্ছে বাংলাদেশ। এর ফলে বিদেশি স্যাটেলাইটে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া বাবদ যে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো তা অনেকটাই কমে আসবে। আর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হলে ট্রান্সপন্ডার ভাড়া ব্যয় পুরোপুরিই কমে যাবে। উপরন্তু বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার অন্য দেশের কাছে ভাড়া দিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। বিটিআরসির চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ জানিয়েছেন, টেলি মেডিসিন, টেলি শিক্ষা, আন্তঃসরকার নেটওয়ার্ক, দুর্যোগ পরিস্থিতিতে জরুরি যোগাযোগ, টেলিভিশন ব্রডকাস্ট ও ডিটিএইচ টেলিভিশন সেবার সুবিধা পাওয়া যাবে দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। এই স্যাটেলাইটের নাম প্রথমে সার্ক স্যাটেলাইট ঠিক করা হলেও পাকিস্তান না আসায় পরে নাম বদলে রাখা হয় সাউথ এশিয়া স্যাটেলাইট। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ স্যাটেলাইটকে আঞ্চলিক সহযোগিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ায় এই দুই নেতা নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা ও আফগানিস্তানকে ধন্যবাদ জানান।
ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জনগণের কল্যাণে দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জনগণের উন্নতি ও সহযোগিতার নানাক্ষেত্র দেশগুলোর সফলভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর নির্ভর করছে।’ ৫ মে গণভবন থেকে দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ উপলক্ষে আয়োজিত যৌথ ভিডিও কনফারেন্সের বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও ভারতের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা এই ভিডিও কনফারেন্সে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অনুষ্ঠানে সূচনা ও সমাপনী বক্তৃতা প্রদান করেন। আরো বক্তৃতা করেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আশরাফ গণি, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী থেসারিং তোবগে, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিন আব্দুল গাইয়ুম, নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহাল এবং শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মৈত্রীপালা শ্রীসেনা।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এই অঞ্চলকে একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। যেখানে আমরা সুপ্রতিবেশীর মতোই বসবাস করে আমাদের জনগণের জন্য গঠনমূলক ও সময়োপযোগী নীতির বাস্তবায়ন করতে পারি, যে স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণ দক্ষিণ এশিয়ায় দেশগুলোর দৃশ্যপট বদলে দেবে। দক্ষিণ এশীয় উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং ভারত তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে স্থল, জল এবং আকাশপথ ছাড়িয়ে মহাশূন্য পর্যন্ত বিস্তৃত করলো। আমি নিশ্চিত মহাশূন্যে এই সহযোগিতা আমাদের এই অঞ্চলের স্বার্থে আমাদেরকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের উচ্চাকাক্সক্ষী পথে নিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করেন দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইট এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের জন্য ইসরোর বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য আজকের দিনটি ঐতিহাসিক, ঐতিহাসিক মুহূর্ত। এই স্যাটেলাইট আঞ্চলিক সহযোগিতার দৃষ্টান্ত এবং নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সমঅনুভূতির বার্তাই প্রকাশিত হয়েছে। এই স্যাটেলাইট প্রমাণ করেছে যে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র আকাশ পর্যন্তই নয়, আরো বহুদূর বিস্তৃত।
মোদি আরো বলেন, দুই বছর আগে ভারত দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের উন্নয়নের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণ সেই প্রতিশ্রুতির পূরণ। এর মাধ্যমে আমরা সহযোগিতার নতুন একটি ক্ষেত্র তৈরি করলাম। আমাদের মধ্যে সহযোগিতার নমুনা এখন মহাকাশে উড্ডীয়মান থাকবে।
মোদি হিন্দিতে বলেন, ‘সাবকা সাথ সাবকা ভিকাস’ (সকলের সঙ্গে সহযোগিতা এবং সকলের সঙ্গেই উন্নয়ন)। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার পথ নির্দেশক এবং ভারত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিকশিত হওয়ার জন্য সকলের সঙ্গে সহযোগিতার নীতিতেই বিশ্বাসী। তিনি তাঁর ভিশনকে সফল করতে সার্বিক সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সকল সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত থাকার জন্য ধন্যবাদ জানান। জিস্যাট-৯ (জিএসএটি) বা দক্ষিণ এশীয় স্যাটেলাইটটি দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য উপহার হিসেবে ২৩৫ কোটি রুপি ব্যয়ে ভারত সরকার তৈরি করেছে। জিএসএলভি-এফ০৯ শ্রেণিভুক্ত এই উপগ্রহটি ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ভারতের আইএসআরও’র তত্ত্বাবধানে মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করা হয়। অনুষ্ঠানে সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টার থেকে উপগ্রহটির সফল মহাকাশ যাত্রার ভিডিও ক্লিপও প্রদর্শন করা হয়। এই উপগ্রহের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যোগাযোগ, দুর্যোগকালীন সহযোগিতা, দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ম্যাপিং, টেলি মেডিসিন, টেলি কমিউনিকেশন, টেলি অ্যাডুকেশন, তথ্যপ্রযুক্তিসহ এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের জনগণের যোগাযোগ এবং দুর্যোগকালীন তথ্য সরবরাহে ব্যবহৃত হবে।