রাজনীতি

নানামুখী তৎপরতা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বিএনপি : হতাশায় নিমজ্জিত দলের তৃণমূল নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাংগঠনিক অবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেও কাক্সিক্ষত ফল পাচ্ছে না বিএনপি। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন দলের তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত। দলের সাংগঠনিক অবস্থা চাঙা করতে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে মাথায় রেখে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফরে যাচ্ছেন। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া তার কার্যালয়ে স্ট্যান্ডিং কমিটির সঙ্গে ঘনঘন বৈঠক করছেন। ১০ মে ঘোষণা করেছেন ভিশন ২০৩০। কিন্তু এতসব তৎপরতা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বিএনপি। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সারাদেশের সকল স্তরে দল গোছাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছে দলটি। দল সুসংগঠিত হওয়ার পরিবর্তে জেলায় জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে কোন্দল। দলের পরস্পরবিরোধী গ্র“পগুলো সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। কোন্দলের কারণে কোনো কোনো জেলায় কর্মিসভা না করেই কেন্দ্রীয় নেতাদের ঢাকায় ফিরে আসতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি হাইকমান্ড তৃণমূল নেতাদের ওপর ক্ষুব্ধ। অপরদিকে দলীয় হাইকমান্ড সাংগঠনিক বিরোধ মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মীরাও কেন্দ্রের ওপর চরমভাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ।
উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করতে ২৪ এপ্রিল থেকে সারাদেশের ৭৭টি সাংগঠনিক জেলার সর্বস্তরে সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নিয়ে গঠিত ৫১টি টিম মাঠে নামে। জেলায় জেলায় গিয়ে কর্মিসভা করতে জেলা পর্যায়ে সফর শুরু করে এসব টিমের নেতারা। কিন্তু জেলায় জেলায় কর্মিসভা করতে গিয়ে নতুন করে ঝামেলায় পড়ে বিএনপি। দীর্ঘদিন তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা না থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল লক্ষ্য করা যায়নি। কিন্তু দল গোছানোর জন্য যখনই জেলায় জেলায় কর্মিসভা করা শুরু হয় তখনই দলের প্রতিপক্ষ গ্র“পগুলোর মধ্যে শুরু হয়ে যায় কোন্দল ও সংঘাত-সংঘর্ষ।
গত কয়েক বছর নানামুখী চাপ ও মামলার ভয়ে দলীয় কার্যক্রম থেকে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাকর্মী নিজেদের গুটিয়ে রাখে। কেউ কেউ দীর্ঘদিন রাজপথ ছেড়ে অনেকটা স্বেচ্ছা অবসরে ছিলেন। এখন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কেন্দ্রের নির্দেশনা মোতাবেক তারা আবার সরব হয়ে উঠেছেন। তারা আগেভাগে সাংগঠনিক পদ-পদবি রক্ষা করতে এবং নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় রাখতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তাই কেন্দ্রীয় নেতাদের সাংগঠনিক সফরকে কেন্দ্র করে দলের পরস্পরবিরোধী নেতাকর্মীদের শক্তি প্রদর্শনের মহড়া চলে। আর এ কারণেই উভয় গ্র“পের মধ্যে বেধে যাচ্ছে সংঘর্ষ।
জানা গেছে, দলীয় নেতাদের কোন্দলের কারণে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ, চট্টগ্রাম উত্তর, ঝিনাইদহ ও নীলফামারীসহ বেশ কয়েকটি জেলায় বিএনপির কর্মিসভা প- হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অন্তত ৭টি সাংগঠনিক জেলায় কর্মিসভা করার কাজ স্থগিত করা হয়েছে। বাগেরহাট জেলার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হলেও এ কমিটিকে চ্যালেঞ্জ করে বিএনপির ২ নেতা পদত্যাগ করেছেন।
চট্টগ্রামে কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে বিএনপির দু’গ্র“পের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও ভাঙচুরসহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের ২৩ জন আহত হয়। গাড়ি ভাঙচুর ও রক্তারক্তি বেধে যায়। ২ মে চট্টগ্রাম মহানগরের নাসিমন ভবনে উত্তর জেলা বিএনপির কর্মিসভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু কর্মিসভাকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুই নেতার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষে উভয়পক্ষের ৮ জন আহত হয়। এ সময় কর্মিসভা মঞ্চে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনসহ বিএনপির অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কর্মিসভা প- হয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে ফিরে যান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। একই দিনে ঝিনাইদহ শহরের ডা. কে আহম্মদ পৌর কমিউনিটি সেন্টারে কর্মিসভাকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্র“পের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। ৩ মে পটিয়া পৌরসভা সদরে ইন্দ্রপুল এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টারে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির কর্মিসভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু কর্মিসভা শুরুর আগেই দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গাজী মোহাম্মদ শাহজাহান ও সহসভাপতি এনামুল হকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।
গত বছর ১৯ মার্চ জাতীয় কাউন্সিলের পর পূর্ণাঙ্গ নির্বাহী কমিটি করতে না পারাসহ বিভিন্ন কারণে তৃণমূলে কমিটি পুনর্গঠনের কাজ থেমে যায়। এ পরিস্থিতিতে এ বছর ২৪ এপ্রিল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশে দলের সিনিয়র নেতাদের দিয়ে ৫১টি সাংগঠনিক টিম গঠনের মধ্য দিয়ে সারাদেশে দল গোছানোর কাজ শুরু করা হয়। এ সময় কর্মিসভা করার পাশাপাশি তৃণমূলে দল পুনর্গঠন, পরবর্তী আন্দোলন ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রস্তুতি নিতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া কোন এলাকায় কে যোগ্য প্রার্থী সে বিষয়েও কেন্দ্রীয় নেতারা খোঁজখবর নেন।
উল্লেখ্য, এর আগে দলের জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে ২০১৫ সালের ৯ আগস্ট কেন্দ্র থেকে চিঠি দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএনপির সকল সাংগঠনিক জেলা ও প্রতিটি জেলার বিভিন্ন ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন করতে বলা হয়। এর মাসখানেক পর ১৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করার আগে গুলশান কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বৈঠককালে তিনি বারবার দলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা সবাই মিলে তৃণমূল পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের কাজে সহযোগিতা করবেন। খালেদা জিয়া লন্ডন সফরে গিয়ে ছেলে তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ২ মাস অবস্থান করে দেশে ফেরার পরও তৃণমূলে বিএনপির কমিটি করতে না পারায় দলের সিনিয়র নেতারা তোপের মুখে পড়েন। এখন আবার একই পদক্ষেপ নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফরে গিয়ে কর্মিসভা না করেই ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিএনপি হাইকমান্ড মনে করছে দল গুছিয়ে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার করতে না পারলে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সুবিধা করা যাবে না। বিশেষ করে এ সরকারের বিরুদ্ধে আগের ২ দফা আন্দোলন কর্মসূচিতে ব্যর্থতার পর পরবর্তীতে বুঝেশুনেই মাঠে নামতে চায় বিএনপি। এছাড়া আন্দোলন সফল না হলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি যাতে ধীরে ধীরে জোরদার করা যায় সে বিষয়েও দল গোছানোর প্রক্রিয়াটি মাথায় রাখা হচ্ছে। কিন্তু সাংগঠনিক জেলা সফরে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা দলীয় গ্রুপিং-কোন্দল দেখে থমকে যান। আবার তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিপ্রীতি লক্ষ্য করেন। তারা দেখেন কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো কোনো নেতা তারেক রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেন, আবার কেউ খালেদা জিয়াপন্থি নেতাদের পক্ষ নেন। এতে দলের তৃণমূল নেতাকর্মী-সমর্থকরাও বিভ্রান্ত এবং হতাশ।