রাজনীতি

নির্বাচনি চ্যালেঞ্জে মাঠে আওয়ামী লীগ : গ্রুপিং ঠেকাতে কঠোর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০১৯ সালের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনি চ্যালেঞ্জে নেমে দলটি নির্বাচনের দেড় বছর আগে থাকতেই নির্বাচনি মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের দেশের যেকোনো জায়গায় সফর হয়ে পড়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক। আওয়ামী লীগের যেকোনো অনুষ্ঠানে প্রায় সব বক্তার মুখেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তা থাকছে। শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক দলটির নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে প্রায় সব কেন্দ্রীয় নেতাই নিজেদের ঘর গোছানোর কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। অতীতে কোনো কোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কারণে আওয়ামী লীগের হেরে যাওয়াকে একটি বড় কারণ হিসেবে ধরে নিয়ে দলটির হাইকমান্ড আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূলে যেকোনো ধরনের কোন্দল-গ্রুপিং দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে দলের নেতাকর্মীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। মোটকথা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে মাঠে তীক্ষè দৃষ্টি দিয়ে কাজ শুরু করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। সাংগঠনিকভাবে দলকে প্রস্তুত করার কাজ চলছে জোরেশোরে। তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে চলা দ্বন্দ্ব দূর করতে তাদের নিয়ে বৈঠকে বসছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। এমপিদের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের দূরত্ব কমিয়ে আনতে এমপিদের ঢাকায় ডেকে এনে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এমপিদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে জরিপ কাজ চালানো হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে। দলীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন মাধ্যমে এমপিদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমপিদের এলাকায় কার কী অবস্থা, এলাকার জনগণ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেমন যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন কি নাÑএমন সব বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে। প্রার্থী বাছাইয়ের অংশ হিসেবে এ কাজ চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। জানা গেছে, বিতর্কিত কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ও জনবিচ্ছিন্ন এমপিদের আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলের হাইকমান্ড। দলের মধ্যে গুঞ্জন রয়েছে আগামী নির্বাচনে বেশকিছু আসনে পরিবর্তন আসবে। কপাল পুড়বে বিতর্কিতদের। এ জাতীয় এমপিদের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপিরা। একই সঙ্গে দলীয় মনোনয়নে অনেক নতুন মুখও দেখা যেতে পারে। তবে আওয়ামী লীগ এখনই প্রার্থীদের নাম চূড়ান্তভাবে প্রকাশ না করে সবাইকে ভোটের মাঠে সক্রিয় থাকতে বলেছে। ফলে কোনো কোনো আসনে বর্তমান এমপি, সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি, নতুন মুখ, জেলা সভাপতি, জেলা সাধারণ সম্পাদকরা ভিন্ন ভিন্নভাবে নির্বাচনি মাঠে নেমে পড়েছেন। তারা সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হওয়ার আকাক্সক্ষার কথা ব্যক্ত করছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপিদের বিষয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সর্বশেষ দলের পার্লামেন্টারি মিটিংয়ে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, যে-ই হোন না কেন, জনপ্রিয়তা না থাকলে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হবে না। আপনারা কে কী করছেন, প্রত্যেকের রিপোর্ট আমার কাছে আছে। ৬ মাস পরপর আমি তথ্য নিই। জনগণের কাছে যেতে হবে, কর্মীদের মূল্যায়ন করতে হবে। যার অবস্থা ভালো তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। মূলত দলীয় প্রধানের এমন মনোভাবের ওপর ভরসা করে অন্তত শ’খানেক আসনে মাঠে নেমে পড়েছেন একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী। যেসব জায়গায় নেতাকর্মীদের সঙ্গে এমপিদের দূরত্ব রয়েছে, জনগণের সঙ্গে দূরত্ব রয়েছে, এমন বহু আসনে একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী কাজ শুরু করে দিয়েছেন দলের মনোনয়ন পাওয়ার আশায়।
জানা গেছে, সাবেক ছাত্রনেতা, সহযোগী সংগঠনের নেতা, এমনকি জোটের শরিকদের জন্য আসন ছেড়ে দিতে হয়েছে এমন অনেকেই এলাকায় কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ লিফলেট বিলি করছেন এলাকার মানুষদের জানান দেয়ার জন্য। দেশজুড়ে রাস্তায় রাস্তায়, নগর-শহর থেকে গ্রামীণ জনপদেও টাঙানো হচ্ছে তাদের নামে ডিজিটাল ব্যানার ও রঙিন পোস্টার। প্রচারণা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমেও। জানা যায়, আওয়ামী লীগের ৬০ থেকে ৭০ জন এমপি বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন। এসব এমপির বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকা-ের তথ্য এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে রয়েছে। এদের কারও কারও জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এসব আসনের জন্য বিকল্প ভাবনার কথা প্রকাশ হওয়াতেই এক আসনে একাধিক নেতা মাঠে নেমে পড়েছেন। কোনো কোনো আসনে ১০ জন নেতাও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে নিজেকে জাহির করছেন। অনেকেই বলছেন, এই প্রবণতা নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের জন্য সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ বলছেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় গ্রুপিং আওয়ামী লীগের জন্য সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। যেসব আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নৌকার মনোনয়নের জন্য মাঠে নেমেছেন, সেসব আসনেই গ্রুপিংয়ের মাত্রা বেশি। আবার যেসব আসনে এমপিরা নব্য আওয়ামী লীগারদের নিয়ে চলাফেরা করেন, আওয়ামী লীগের প্রকৃত নেতাকর্মীদের দূরে ঠেলে রেখেছেনÑসেসব আসনেও গ্রুপিংয়ের মাত্রা বেশি। এসব আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নজরে এসেছে। ফলে তৃণমূলের গ্রুপিং নির্মূল করতে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। নরমে-গরমে গ্রুপিংয়ে জড়িতদের সতর্ক হয়ে যেতে বলছেন। কোনো কোনো জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সময়ও বেঁধে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ওই সময়ের মধ্যে গ্রুপিং-কোন্দল শেষ করতে না পারলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এমতাবস্থায়, সব দিক দেখেশুনে মনে হচ্ছে, অংশগ্রহণমূলক আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে এখন থেকেই ব্যাপক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ যদি তার অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে, গ্রুপিং পরিহার করে একটি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকরী রাজনৈতিক জোট গঠন করতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার হ্যাটট্রিক পূরণ করাটা দলের জন্য কঠিন হবে না।