প্রতিবেদন

পতিসরে কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ : রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎস

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মজয়ন্তী উৎসব কবির স্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসরে উদযাপিত হয়েছে। ৮ মে পতিসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণের দেবেন্দ্র মঞ্চে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয়ভাবে আয়োজিত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী এবার উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হয়। এবার কবিগুরুর ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, ‘মানুষের ধর্ম : রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’। এ বিষয়ে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকীর এ অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী মুহা. ইমাজ উদ্দিন প্রামানিক ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব ইব্রাহিম হোসেন খান প্রমুখ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন জেলা প্রশাসক ড. মো. আমিনুর রহমান। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ মো. শহীদুজ্জামান সরকার বাবলু, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজিপি, পুলিশ সুপার মো. মোজাম্মেল হক প্রমুখ।
কবিগুরুর জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের দিকপাল। বাংলা সাহিত্যকে পূর্ণতা দিয়েছেন তিনি। তার রচনায় বাংলা সাহিত্য হয়েছে সমৃদ্ধ। আজ যখন বিশ্বের সর্বস্তরে উগ্র মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তখন রবীন্দ্রচর্চা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎস। তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি জাতির কল্যাণে কাজ করে গেছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, আমার ধারণা ছিল পতিসর অন্তত একটি ইউনিয়নের নাম। কিন্তু বাস্তবে দেখছি এটি একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা এই বাংলার একটি গ্রাম এই পতিসর। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রামে তার এই কাছারিবাড়িতে বসে প্রজাদের কথা ভেবেছেন। তিনি গ্রামের মানুষের উন্নয়নের কথা ভেবেছেন। তাই প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করতে তিনি স্কুল স্থাপন করেছেন। নিজের নোবেল পুরস্কারের প্রাপ্ত অর্থ স্থানীয় কৃষি ব্যাংকে জমা দিয়েছেন। তার অসংখ্য কবিতা, গান, কাব্য রচনা করে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশকে জাতির জনক প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসম্ভার যেমন বিশাল তেমনি আপন মহিমায় বর্ণাঢ্য। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ঠাকুর পরিবারের জমিদার। কিন্তু জমিদারি তিনি পছন্দ করতেন না। নিজে জমিদার হয়েও জমিদারকে তিনি বলেছেন জমির জোঁক-প্যারাসাইট। রবীন্দ্রনাথ সুবিধাবঞ্চিত বাঙালির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। তিনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়, বাঙালির বিশ্ববাদে দীক্ষা দিতে চেয়েছেন। তিনি দরিদ্র প্রজাদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য কৃষি ব্যাংক, সমবায় ব্যাংক, সমবায় নীতি ও কল্যাণ বৃত্তি চালু করেন। প্রতিষ্ঠিত করেন কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও কৃষি ল্যাবরেটরি।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মাঝে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ বপন করেছিলেন। তিনি নিজে মানবতাবাদী অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন। একুশ শতকের পৃথিবী যখন একটি বিশ্বগ্রামে পরিণত হয়েছে তখন রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও দর্শন হয়ে উঠেছে অতীব তাৎপর্যপূর্ণ।
এদিকে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে ৮ মে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব জমিদারি নওগাঁর পতিসরে জাতীয়ভাবে পালন করা হয় ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী। সরকারিভাবে এখানে একদিনের কর্মসূচি নেয়া হলেও স্থানীয়ভাবে নেয়া নানা কর্মসূচি ও রবীন্দ্রমেলা অন্তত ৭ দিন চলে। প্রতি বছর দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হলেও এবারের উৎসবের ঘটা ছিল ব্যাপক আকারে। কবির জন্মোৎসবের অনুষ্ঠানে এবার রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকায় উৎসবের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। রাষ্ট্রপতির উপস্থিতির জন্য অনুষ্ঠানের কলেবর বৃদ্ধির পাশাপাশি সৌন্দর্যও ছিল মনোমুগ্ধকর। কবির জন্মবার্ষিকীতে পতিসর কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণে কবিভক্তদের নেমেছিল ঢল। প্রত্যন্ত গ্রামে কবির প্রিয় সেই নাগর নদের পাড়ে কবিভক্তদের যেন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। সকাল থেকেই সেখানে সমবেত হতে থাকে রবীন্দ্রভক্তরা। নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মনিয়ারি ইউনিয়নের পতিসর কাছারিবাড়ি ও প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। কাছারিবাড়ি সংলগ্ন মনিতলা মন্দির প্রাঙ্গণে বসেছিল রবীন্দ্রমেলা। নানা রকমের মিঠাই-মিষ্টান্নসহ আকর্ষণীয় খাবারের দোকান ছাড়াও বসেছিল প্রসাধনী, শিশুদের খেলনাসহ নানা ধরনের মনকাড়া সামগ্রীর দোকান। পাকা রাস্তা ও মেঠোপথ ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে মাঠের পর মাঠ অতিক্রম করে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সকলেই সমবেত হয়েছিল কবির এই কাছারিবাড়ি প্রাঙ্গণে। হাজার হাজার কবিভক্তের পদচারণায় গোটা পতিসর যেন উৎসবে মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
এদিকে শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি মিলনায়তনে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ৩ দিনব্যাপী রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম। প্রধান অতিথি এইচটি ইমাম রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও জীবনদর্শনের ওপর আলোকপাত করেন। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মনীষী রবীন্দ্রনাথের কর্মকে ব্যক্তিজীবনে প্রতিফলন ঘটানোর জন্য অনুরোধ জানান তিনি। এ সময় সংসদ সদস্য হাসিবুর রহমান স্বপন রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এইচটি ইমাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে দ্রুত জনবল নিয়োগ করে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করা হবে।
অপরদিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে কবির স্মৃতিধন্য শিলাইদহ কুঠিবাড়ি চত্বরে শুরু হয়েছে ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। এ উপলক্ষে হানিফ বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাঙালির জীবন ও সাহিত্যে প্রবলভাবে বিচরণ করেছেন। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল অর্জন করে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে যেমন বিশ্ব দরবারে স্থান করে দিয়েছেন তেমনি বাঙালিকেও এনে দিয়েছেন মর্যাদা। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, চিত্রকর, দার্শনিক, সমাজচিন্তক ও মানবহিতৈষী।
খুলনা জেলা প্রশাসন ও রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ফুলতলার দক্ষিণডিহি ‘রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’ প্রাঙ্গণে ২৫-২৭ বৈশাখ (৮, ৯ ও ১০ মে) ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করা হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। খুলনা জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।