আন্তর্জাতিক

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইমানুয়েল ম্যাক্রনকেই বেছে নিলেন ফ্রান্সের জনগণ

স্বদেশ খবর ডেস্ক : প্রেমিক পুরুষ ইমানুয়েল ম্যাক্রনকেই তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিলেন ফ্রান্সের জনগণ। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মধ্যপন্থি ম্যাক্রন ফ্রান্সের কনিষ্ঠতম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দিগি¦জয়ী নেপোলিয়ন বোনাপোর্টের পর এন মার্শ (অন দ্য মুভ) আন্দোলনের নেতা ম্যাক্রনই হতে যাচ্ছেন ফ্রান্সের সবচেয়ে কম বয়সী শীর্ষ নেতা। তার বিজয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন। জয়ের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ইমানুয়েল ম্যাক্রনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনও। ম্যাক্রন ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কট্টরপন্থি মারি লে পেন পেয়েছেন ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। নির্বাচনি ফলাফল আসতে শুরু করার পর দ্রুতই পরাজয় মেনে নিয়ে ম্যাক্রনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন লে পেন।
ম্যাক্রন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় ফ্রান্সের ফার্স্ট লেডি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ৬৪ বছর বয়সী ব্রিজিত ট্রোগনিউক্স। ইমানুয়েল ম্যাক্রনের চেয়ে ২৫ বছরের বড় ব্রিজিত। তিনি সাবেক স্কুল শিক্ষিকা। ম্যাক্রনের বয়স যখন ১৫ বছর তখন ব্রিজিতেরই ছাত্র ছিলেন তিনি। ওই সময়েই ব্রিজিতের প্রেমে পড়েন ম্যাক্রন। ম্যাক্রনের বয়স যখন ১৭ তখন ব্রিজিতকে সরাসরি বলে ফেলেন, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। ব্রিজিত তখন ৩ সন্তানের মা। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্রিজিত তার পূর্বের স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে বিয়ে করেন ইমানুয়েল ম্যাক্রনকে। সেই ভালোবাসার উপহার হিসেবে ব্রিজিতকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিসি প্রাসাদে উঠাতে যাচ্ছেন ম্যাক্রন। ব্রিজিত এখন ৮ নাতিপুতির নানি-দাদি। তাকে নিয়ে আগ্রহ চারদিকে। বলা হচ্ছে, তিনি অন্যদের মতো নন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামার মতো জোরালো ভূমিকা রাখবেন তিনি। বিশেষ করে শিক্ষার সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকায় তিনি এ খাতে নজর দিতে পারেন।
নির্বাচনে বিশাল জয় পেলেও ম্যাক্রনের সামনে রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ। একে তো উগ্রবাদ ও মধ্যপন্থায় বিভক্ত ফরাসি সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সেতুবন্ধ হিসেবে তাকে কাজ করতে হবে, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে দেশটির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের যুদ্ধে। ব্যর্থ হলে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। অথচ ১ মাস পরই দেশটির সংসদ নির্বাচন। সেটি মাথায় রেখেই আগামী দিনগুলো গুনতে হবে ম্যাক্রনকে।
ফ্রান্সের ইইউবিরোধী কট্টর জাতীয়তাবাদী ন্যাশনাল ফ্রন্টকে আপাতত ধরাশায়ী করেছেন ম্যাক্রন। তবে তারা যে দেশটিতে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে নিয়েছেন, তা এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে দিয়েছে। লে পেনের চাপের পাশাপাশি দেশটির মূলধারার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও এরই মধ্যে এবারের তুমুল পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে জুনের সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করেছে। লে পেন ৩৪ শতাংশ ভোট প্রাপ্তিকে দলের জন্য বড় জয় উল্লেখ করে সংসদ নির্বাচনে আরও বড় জয় কেড়ে নিতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ৫৭৭ আসনবিশিষ্ট সংসদ নির্বাচনের ভোট ১১ ও ১৮ জুন দুই দফায় অনুষ্ঠিত হবে।
তবে আশার কথা হলো, দেশটির ভোটারদের একটি চিরাচরিত রীতি রয়েছে। বলতে গেলে, বরাবরই নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতকেই শক্তিশালী করে থাকেন ভোটাররা। সাধারণত নতুন প্রেসিডেন্টের দলই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে থাকে। ম্যাক্রন ঘোষণা দিয়েছেন, সংসদে দলের অর্ধেক প্রার্থীই হবেন রাজনীতিতে নবাগত ও অনভিজ্ঞ তরুণ। বামপন্থি সোশ্যালিস্ট ও ডানপন্থি রিপাবলিকান দল থেকে বেরিয়ে আসা নেতানেত্রী এবং মধ্যডানপন্থি মডেম পার্টির নেতারা বাকি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ম্যাক্রনের দল এন মার্শের জোটসঙ্গী মডেম পার্টি। এ পর্যন্ত দু’টি জরিপে দেখা গেছে, জুনের সংসদ নির্বাচনে প্রথম দফা ভোটে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবেন ম্যাক্রনের প্রার্থীরাই। তবে আশঙ্কার কথা হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবারই প্রথম এমন একজন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হলেন, যার দলটি শুধু আকারে ক্ষুদ্রই নয়, নতুন ও অনভিজ্ঞ। বড় কোনো দল যদি তার পেছনে থাকতো, তাহলে হয়ত সংসদে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া অনেকটাই নিশ্চিত হতো। দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান ও সোশ্যালিস্ট পার্টি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফাতে নজিরবিহীনভাবে ভোটারদের প্রত্যাখ্যানের শিকার হলেও তাদের ক্ষমতা চালানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারাও সংসদ নির্বাচনে ম্যাক্রনকে এক হাত নিতে মরিয়া হয়ে উঠবে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ম্যাক্রনের জয়কে রাজনৈতিক ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারা বলছেন, ম্যাক্রন সব হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়েছেন। তিনি মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন। প্রথমে তিনি পরাজিত করেছেন মধ্য বাম এবং মধ্য ডানপন্থিদের এবং সবশেষে পরাজিত করেন উগ্র ডানপন্থিদের।
বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাক্রন ছিলেন সৌভাগ্যবান। মধ্য ডানপন্থি প্রার্থী ফ্রাঙ্কো ফিলো নির্বাচনের লড়াই থেকে আগেই ছিটকে পড়েছিলেন। সোশ্যালিস্ট প্রার্থী বেনোট হ্যামনেরও একই অবস্থা হয়েছিল। ফরাসি বিশ্লেষক মার্ক অলিভার বলেন, তিনি (ম্যাক্রন) ছিলেন খুবই সৌভাগ্যবান। কারণ তিনি সম্পূর্ণ একটি অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন। তবে শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে তিনি জয়ী হননি। তিনি বেশ কৌশলীও। মার্ক অলিভার জানান, ম্যাক্রন সোশ্যালিস্ট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তিনি বুঝতে পারছিলেন, সোশ্যালিস্ট পার্টি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এবং সে দল থেকে নির্বাচন করলে জয়লাভ সম্ভব নয়।
তাছাড়া স্পেন এবং ইতালির মতো কোনো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি ফ্রান্সে গড়ে ওঠেনি। সেজন্য ২০১৬ সালে ম্যাক্রন গড়ে তোলেন ভিন্ন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এবং একই সঙ্গে তিনি প্রেসিডেন্ট ওলাদের সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ম্যাক্রন নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়েছেন। ২০০৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে স্ত্রী মিশেলকে নিয়ে বারাক ওবামা যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেটি অনুসরণ করেছে ম্যাক্রনের রাজনৈতিক দল। প্রেমিক পুরুষ ম্যাক্রনও তার চেয়ে ২৫ বছরের বড় স্ত্রী ব্রিজিতের পরামর্শে তার রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম সাজিয়েছেন। শিক্ষক ও স্ত্রীর দিকনির্দেশনাই ম্যাক্রনকে এলিসি প্রাসাদে ঢোকার ছাড়পত্র দিয়েছে বলে বেশির ভাগ বিশ্লেষকের অভিমত।