প্রতিবেদন

বাজার স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে খাদ্যশস্যসহ কোনো ফসলই মার খায়নি। উপরন্তু সরকারের নিরলস প্রচেষ্টায় কৃষি ব্যবস্থা আধুনিকায়নের ফলে একরপ্রতি খাদ্যশস্য উৎপাদনের হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। গত কয়েক বছর চালের চাহিদার পুরোটাই উৎপাদন করেছেন কৃষকরা। কোনো কোনো বছরে কিছু উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয়েছে। যার ফলে সরকার ২০১৪ সালে শ্রীলংকায় ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এ বছর হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা, দেশব্যাপী অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ধানে ব্লাস্ট রোগসহ বিভিন্ন কারণে বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে বেশ কয়েক বছর পর আবারও চাল আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আপাতত সরকার ১ লাখ টন চাল আমদানি করবে। এর মধ্যে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য খাদ্য অধিদপ্তর ৯ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। বাকি ৫০ হাজার টন আমদানিতে শিগগিরই আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হবে।
নিরাপদ খাদ্য মজুদ গড়ে তোলা ও চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে এ আমদানি করা হচ্ছে বলে জানিয়ে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম বলেন, অকাল বন্যাসহ বিভিন্ন কারণে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চালের মূল্য বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আপাতত ১ লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে পরে আরও আমদানির প্রস্তুতি রয়েছে সরকারের।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদরুল হাসান এ বিষয়ে বলেন, বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল সংগ্রহের যে লক্ষ্য নেয়া হয়েছে তা অর্জন না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর কারণ চাল সংগ্রহে যে দর ঘোষণা করা হয়েছে, সেই দরে চাল পাওয়া নাও যেতে পারে। যে কারণে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ লাখ টন চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে বছরে ২০ থেকে ২২ লাখ টন চাল সরবরাহ করতে হয়। এসব খাতে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং বাজার স্বাভাবিক রাখার জন্যই চাল আমদানি করা হচ্ছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রেখে খাদ্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে নিরাপদ মজুদ ব্যবস্থা করে থাকে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে চালের মজুদ অনেক কমে এসেছে। গত ৭ মে সরকারের খাদ্য গুদামগুলোতে ২ লাখ ৬২ হাজার টন চাল মজুদ ছিল। গত বছরের ৭ মে এই মজুদের পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার টন। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪ লাখ ১৬ হাজার টন চালের মজুদ কম রয়েছে। এদিকে হাওরে বন্যা, দেশব্যাপী অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও ব্লাস্ট রোগের কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মনে করে, এবার বোরো মৌসুমে সারাদেশে যে পরিমাণ উৎপাদন হতে পারত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তার তুলনায় উৎপাদন অনেক কম হবে। ৪৮ লাখ হেক্টর বোরো চাষ থেকে ১ কোটি ৯২ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছিল সরকার।
চলতি বোরো মৌসুমে সরকার ৭ লাখ টন সেদ্ধ আর ১ লাখ টন আতপ চাল মিলে মোট ৮ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে। এ বছর সরকার প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৩৪ টাকা আর ৩৩ টাকা কেজি দরে আতপ চাল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে। গত বছরও বোরো মৌসুমে সাড়ে ৭ লাখ টন সেদ্ধ ও ১ লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছিল সরকার। কিন্তু চাল সংগ্রহের লক্ষ্য অর্জন হয়নি। সরকার ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৬৩২ টন চাল সংগ্রহ করে। গত বছর সরকার ৩২ টাকা কেজি দরে সেদ্ধ চাল সংগ্রহ করেছে। এ বছর এরই মধ্যে চালের দাম বেড়ে গেছে। সরকারের বাণিজ্যিক সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবি’র তথ্যানুযায়ী ৯ মে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে চায়না, স্বর্ণার মতো মোটা চাল ৪২ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইজাম, লতা জাতের মতো মাঝারি মানের চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে। ফলে সরকার ঘোষিত ৩৪ টাকা দরে চাল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে চাল সংগ্রহ করতে হবে। দেশের কয়েক লাখ পরিবার সরকারের এসব কর্মসূচির সুবিধাভোগী। ওএমএস, বিশেষ ওএমএস, ইপি, ওপি, স্কুল ফিডিং, ভিজিএফ, ভিজিডি, জিআর, টিআর, কাবিখা ইত্যাদি কর্মসূচিতে চালসহ খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসব কার্যক্রমে প্রায় ২২ লাখ টন খাদ্যশস্য বিতরণ করে সরকার। এছাড়া রয়েছে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ কর্মসূচি। শুধু ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি কর্মসূচিতে ৭ লাখ টন চাল বিক্রি হয়েছে। খাদ্যমন্ত্রীর দাবি, দেশের প্রায় ৫০ লাখ পরিবার ১০ টাকায় চাল কিনছে।
এসব কর্মসূচির বাইরে এবার সরকারকে হাওরাঞ্চলের দুর্গত মানুষের মধ্যে আগামী ফসল না ওঠা পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের জোগান দিতে হবে। এ খাতে আরো অন্তত ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য বিতরণ করতে হবে। এবারের বৈরী আবহাওয়ায় ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো বড় বিপর্যয় ডেকে আনে ধানের ব্লাস্ট রোগ। ব্লাস্ট রোগের সবচেয়ে করুণ দিকটি হলো, যে জমির ধানে ব্লাস্ট রোগ দেখা দিয়েছে, সে জমিটিতে আগামী মৌসুমে কোনো অবস্থাতেই আর ধান উৎপাদন করা যাবে না। কৃষি বিভাগ এ বিষয়ে কৃষকদের কড়া নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। একই জমিতে বারবার একই ফসল উৎপাদন না করেই শুধু ব্লাস্ট রোগ নির্মূল করা যায়। সে হিসাবে আগামী মৌসুমে অন্তত ১ লাখ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদন করা যাবে না। সে দিকটি বিবেচনায় নিলে শুধু এবারই নয়, আগামী মৌসুমেও খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। আর এসব বিবেচনায় নিয়েই খাদ্য অধিদপ্তর দ্রুত চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার আশা করছে, চাল আমদানির ফলে দেশে খাদ্যশস্যের মূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই থাকবে; আর চালের বাজারও স্থিতিশীল থাকবে।