কলাম

বেঁচে থাকার আশ্রয় পেল গৃহহীন পরিবার

মিঠুন মিয়া : অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে মানুষের এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সংবিধানে মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেয়া হয়েছে। মৌলিক অধিকার ব্যতীত মানুষ বাঁচতে পারে না। মানুষের এসব মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাসস্থান। বসবাসের জায়গা না থাকলে মানুষ জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারে না। বাসস্থান না থাকার অর্থই হলো ঠিকানাবিহীন মানুষ। দেশের গৃহহীন মানুষের আশ্রয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গৃহহীন মানুষের বাসস্থান নিশ্চিত করার জন্য বর্তমান সরকার লালমনিরহাট, পঞ্চগড়সহ ৭ জেলার ১০ উপজেলার ১১টি গুচ্ছগ্রাম উদ্বোধন করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশে একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। প্রতিটি মানুষের একটা ঠিকানা আমরা করে দেবো। এই লক্ষ্য নিয়েই আওয়ামী লীগ সরকার কাজ করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলেই এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়।’ উদ্বোধন করা গুচ্ছগ্রামগুলো হচ্ছে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলাধীন সানিয়াজং, লালমনিরহাট সদর উপজেলাধীন ১ ও ২, পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল কোট ভাজনী বালাদূতি, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বাইরাচুনা সিরাইল, দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার অন্তর্গত বাগপুর-২, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার রিফিউজি পাড়া-১, রংপুরের পীরগাছা উপজেলাধীন জুয়ান-১, রংপুরের গঙ্গাছড়া উপজেলাধীন আর্জি জয়দেব, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলাধীন সালাইপুর এবং ফরিদপুর সদর উপজেলাধীন কবিরপুর-৫। এসব গুচ্ছগ্রামে ৩৯০টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন গুচ্ছগ্রাম দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পটি ২০১৫ সালের ১ অক্টোবর শুরু হয়। ২০২০ সাল পর্যন্ত এ প্রকল্পটি চলবে। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪১ কোটি ৮১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর আওতায় দেশব্যাপী ৫০ হাজার ভূমিহীন, গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হবে। এর মাধ্যমে ছিন্নমূল মানুষ অন্তত নতুন করে বাঁচার আশা খুঁজে পেল। যারা এখনো ভূমিহীন অবস্থায় আছে তাদের তালিকা করার জন্য ডিসিদের নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী (একনেক) সভায় প্রকল্পের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শুধু খাস জমি নয়, দরকার হলে সরকারি অর্থায়নে জমি কিনে ভূমিহীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেব।’ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত আড়াই লাখ মানুষের পুনর্বাসন করবে সরকার। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমিহীন ও গৃহহীন এসব পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে। এর মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার পরিবারকে নিজ জমিতে গৃহনির্মাণ এবং ৪০ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হবে। প্রকল্পের ব্যয় ১২০ ভাগ বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের জন্য নেয়া আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের প্রাক্কলিত অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ হাজার ১৬৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এ প্রকল্প ২০১০ সালে শুরু হয়ে ২০১৪ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজের পরিধি বাড়ার কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ২০ নভেম্বর নোয়াখালী জেলার রামগতি থানায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারি খাসজমিতে পুনর্বাসন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। তারই প্রেক্ষিতে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার ৪টি গুচ্ছগ্রামে ১ হাজার ৪৭০টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে এই প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে আদর্শ গ্রাম নামে ভূমিহীনদের পুনর্বাসন কাজ অব্যাহত থাকে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো গৃহহীন মানুষগুলোকে গৃহসংস্থান এবং কর্মসংস্থান করে মূল উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় নিয়ে আসা। প্রকল্পের আওতায় দুই ধরনের ঘর নির্মাণ করা হবে। প্রথমত আরসিসি পিলার দিয়ে দুই কক্ষবিশিষ্ট ৩০০ বর্গফুট মেঝের ঘর ও ৫ রিংবিশিষ্ট স্যানিটারি ল্যাট্রিন। অপরটি প্রতি দুই পরিবারের জন্য ২৯৪ বর্গফুট বিশিষ্ট একচালা সেমিপাকা টু-ইন-ওয়ান হাউজ নির্মাণ করা হবে। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়ার সময় শেখ হাসিনা এই নির্দেশনা দেন। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। নিম্ন অসহায় মানুষদের নিজস্ব ঠিকানা করে দিতে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প অব্যাহত রাখবে সরকার। ভবিষ্যতে এ প্রকল্প আরো বাড়ানো হবে। বর্তমানে দেশের প্রায় পৌনে ৩ লাখ মানুষ গৃহহীন আছে। পর্যায়ক্রমে তাদেরও বাড়িঘর তৈরি করে দেয়া হবে। যারা সুবিধাবঞ্চিত আছে তাদের নিজের শ্রম ও মেধা দিয়ে স্বাবলম্বী হতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গৃহহীন পরিবারকে একটি করে ঘরের মালিকানা দেয়া হয়। এই মালিকানা পরিবারের গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রীর মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হয়েছে। আর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী কোনো কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ বা ছাড়াছাড়ি হলে মালিকানা থাকবে স্ত্রীর অধিকারে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, কেউ ভিক্ষাবৃত্তি করবে না। যারা ভিক্ষা করেন, তাদের জীবন-জীবিকা কিভাবে চলবে, তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কেবল তাই নয় প্রধানমন্ত্রী সব সময় গৃহহীনদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছেন। এর আগেও হতদরিদ্র মানুষদের জন্য সরকার নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প এর মধ্যে অন্যতম। যার মাধ্যমে দারিদ্র্যের হাত থেকে মানুষ মুক্তি পাচ্ছে, জীবন-জীবিকার সুযোগ পাচ্ছে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে। মানুষকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে এ রকম বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্তানুযায়ী রংপুর অঞ্চল থেকে মঙ্গা নামের শব্দটি ইতোমধ্যে দূর করা হয়েছে। বর্তমান সরকার ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছে। ছিটমহলবাসীর জীবনমান উন্নয়নে নানামুখী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সরকার এভাবে সারাদেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলস কাজ করে চলেছে।
লেখক : প্রভাষক
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়