প্রতিবেদন

রমজানে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক : পবিত্র মাহে রমজান সংযমের মাস হলেও চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী এ মাস শুরুর অনেক আগে থেকেই দেশের ব্যবসায়ীরা অসংযমী হয়ে পড়েন। অতি মুনাফার লোভ পেয়ে বসে তাদের। রমজানের আগের দিন যে শসার কেজি থাকে ২৫ টাকা, রমজানের প্রথম দিন তা হয়ে যায় ৮০-১০০ টাকা কেজি। টমেটোর কেজি এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে যায়। রোজার ইফতার সংশ্লিষ্ট সবগুলো আইটেমের দামই বিনা কারণে দ্বিগুণ-তিনগুণ বেড়ে যায়। রমজানে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফালোভী প্রবণতা সরকারের গৃহীত কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমেই নিরসন সম্ভব নয়। এটা নির্ভর করে ব্যবসায়ীদের মানসিকতার ওপর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রতিবারই রমজানের আগে দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার লক্ষ্যে ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে একাধিক বৈঠকে বসেন। ব্যবসায়ী নেতারাও বাণিজ্যমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন, কোনো অবস্থাতেই দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল হতে দেবেন না। কিন্তু মন্ত্রীর সামনে দেয়া প্রতিশ্রুতি কোনো কালেই আর ঠিক থাকে না। সকালে এক দাম তো বিকেলে আরেক দাম। কাওরান বাজারে এক দাম তো, ঠাঁটারি বাজারে আরেক দাম। পণ্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত একটি সংস্থাও আছে। সেটি হলো ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবি। কিন্তু লোকবলের অভাবে এবং টিসিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে খালাসি পর্যন্ত সবার সীমাহীন দুর্নীতির কারণে এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পণ্যমূল্যের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে খুব একটা প্রভাব বিস্তার করে না। তারপরও বাণিজ্য মন্ত্রীর অনুরোধ-উপরোধের বাইরে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে টিসিবিরই দ্বারস্থ হতে হয়। এবারও রমজানে পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে টিসিবির মাধ্যমে বেশ কিছু সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রমজান উপলক্ষে সরকারি বাণিজ্যিক সংস্থা টিসিবি সাশ্রয়ী মূল্যে চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, খেজুর ও সয়াবিন তেল বিক্রি করবে। সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে প্রতি কেজি চিনি ৫৫ টাকা, ছোলা ৭০ টাকা, মসুর ডাল ৮০ টাকা, খেজুর ১২০ টাকা ও ৮৫ টাকায় প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। ১৫ মে থেকে এই দামে পণ্যগুলো বাজারে পাওয়া যাবে বলে ৯ মে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে টিসিবি।
টিসিবি জানিয়েছে, ঢাকাসহ সারাদেশের ১৮৫টি স্থানে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে এসব পণ্য বিক্রি করা হবে। ১৫ মে থেকে শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের ৬ দিন নির্ধারিত মূল্যে এসব পণ্য কিনতে পারবেন ভোক্তারা। ঢাকায় ৩০টি, চট্টগ্রামে ১০টি স্থানে, অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ৫টি করে এবং বাকি জেলা সদরগুলোতে দুটি স্থানে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রি করা হবে। এছাড়া টিসিবির নিজস্ব ১০টি খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র ও ২ হাজার ৮১১ জন পরিবেশকের কাছ থেকেও ভোক্তারা পণ্য কিনতে পারবেন। একজন ভোক্তা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪ কেজি চিনি, ৩ কেজি মসুর ডাল, ৫ লিটার সয়াবিন তেল, ৫ কেজি ছোলা ও ১ কেজি খেজুর কিনতে পারবেন।
দৈনিক ট্রাকপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি চিনি, ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি মসুর ডাল, ৩০০ থেকে ৪০০ লিটার সয়াবিন তেল, ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি ছোলা এবং ২০ থেকে ৩০ কেজি খেজুর বরাদ্দ থাকবে। এছাড়া নিয়মিত পরিবেশকরা ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চিনি, ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি মসুর ডাল, ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি সয়াবিন তেল, ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি ছোলা পাবেন।
টিসিবি জানিয়েছে, ঢাকায় টিসিবির ভ্রাম্যমাণ বিক্রিয় কেন্দ্র থাকবে সচিবালয়ের গেট, প্রেস ক্লাব, কাপ্তান বাজার, ছাপরা মসজিদ ও পলাশী মোড়, সায়েন্সল্যাব মোড়, নিউমার্কেট বা নীলক্ষেত মোড়, শ্যামলী বা কল্যাণপুর, ঝিগাতলা মোড়, খামারবাড়ি, কলমীলতা মোড়, রজনীগন্ধা সুপার মার্কেট, কচুক্ষেত, আগারগাঁও তালতলা ও নির্বাচন কমিশন অফিস, আনসার ক্যাম্প, মিরপুর পাইকপাড়া, মিরপুর-১ নম্বর মাজার রোড, শান্তিনগর বাজার, মালিবাগ বাজার, বাসাবো বাজার, বনশ্রী, বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বর, মহাখালী কাঁচাবাজার, শেওড়াপাড়া বাজার, দৈনিক বাংলা মোড়, শাহজাহানপুর বাজার, ফকিরাপুল বাজার, মতিঝিল বক চত্বর, খিলগাঁও তালতলা বাজার, রামপুরা বাজার, মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর, আশকোনা হাজিক্যাম্প, মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজার, দিলকুশা ও মাদারটেক নন্দীপাড়া কৃষি ব্যাংকের সামনে। এসব স্থানে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে করে টিসিবি পণ্য বিক্রি করবে। টিসিবির বাইরে এবার পণ্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকার আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার বাজারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় থাকবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত বাজারে পণ্যমূল্য কঠোরভাবে মনিটরিং করবে। তাছাড়া পণ্যে ভেজাল দেয়া, ওজনে কম দেয়া এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত অত্যন্ত কঠোর থাকবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার রমজানে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের ভ্রাম্যমাণ আদালতও বাজারে সক্রিয় থাকবে। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বাজারে পণ্যমূল্যের বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করবে।