প্রতিবেদন

সংসদে চলতি বাজেটের দ্বিতীয় প্রান্তিকের রিপোর্ট : প্রধানমন্ত্রীর কার্যকর ও গতিশীল নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল

নিজস্ব প্রতিবেদক : স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ৮ মে জাতীয় সংসদের ১৫তম অধিবেশনের সমাপনী দিনে ‘বাজেট ২০১৬-১৭ : দ্বিতীয় প্রান্তিক (জুলাই-ডিসেম্বর) পর্যন্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও আয়-ব্যয়ের গতিধারা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে সংসদে বাজেটের অর্ধবার্ষিক অগ্রগতির প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। প্রতিবেদনের মূল বক্তব্যে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যকর ও গতিশীল নেতৃত্বে দেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। রাজস্ব আদায়, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রবাসী আয় কমেছে। প্রবাসী আয় প্রবাহের দুর্বলতা চলতি হিসাবে ঘাটতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করছে। তবে মূলধনী হিসাব ও আর্থিক হিসাবে উল্লেখযোগ্য উদ্বৃত্ত থাকায় সার্বিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত ছিল।
উন্নয়নের মহাআয়োজনে সকলের কার্যকর অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে প্রতিবেদনে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে সীমিত সম্পদ এবং নানা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বৈরী পরিস্থিতি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যকর ও গতিশীল নেতৃত্বে সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বাংলাদেশ নিজেকে আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক চলকসমূহের অবস্থান সন্তোষজনক। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলস্বরূপ বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেল। উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশের যে গতিশীল যাত্রা, তাতে চলতি অর্থবছর (২০১৬-১৭) একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব আর দেশের মানুষের নিরন্তর প্রচেষ্টায় অচিরেই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করে আমরা পাব ‘শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’। আর এতেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আমরা প্রতিষ্ঠিত করবই।
অর্থমন্ত্রী প্রতিবেদনে আরও বলেন, বছরের প্রথমার্ধে ত্বরান্বিত হয়েছে অর্থনীতির চাকা এবং স্থিতিশীল রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতির সকল খাত; প্রধানমন্ত্রীর বিচক্ষণতায় সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে দেশে বর্তমানে যে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি সরাসরি তার সুফল ভোগ করে চলেছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি, যোগাযোগসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপের ফলে দেশের বিপুল জনশক্তির দক্ষতা ও জীবনমানে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। উন্নয়নের এই মহাআয়োজনে প্রয়োজন আমাদের সকলের কার্যকর অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে বিশ্বসভ্যতা ও জাতীয় উন্নয়নের প্রধান আশঙ্কা জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থি গোষ্ঠীদের হাত থেকে সমাজকে মুক্ত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার শূন্য সহনশীলতা নীতি (জিরো টলারেন্স) দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করছে। একদিকে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং অন্যদিকে সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থার দুষ্ট প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত রাখার লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকারের নেয়া প্রতিটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ, প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্ব আর দেশের মানুষের নিরন্তর প্রচেষ্টায় অচিরেই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করে আমরা পাব ‘শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’।
চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকায় জনজীবনে স্বস্তি নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ শতাংশ; অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা হলো ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে গত বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায় ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকারি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে সাড়ে ২৪ শতাংশ। রপ্তানি আয় বিগত অর্থবছরের প্রথমার্ধের ১৬ হাজার ৮৪ মিলিয়ন ডলার হতে বেড়ে ১৬ হাজার ৭৯৮ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। আমদানি ব্যয় ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২২ দশমিক ৬ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ১৫ থেকে ৫ দশমিক ০৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে পেশকৃত তার প্রতিবেদনে জানান, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি হলেও প্রবাসী আয়ে গতিশীলতা আসেনি। এ সময়ে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। এছাড়া বাণিজ্যিক ভারসাম্যে ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্য ঋণাত্মক ছিল। এই সময়ে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। একদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রবাসী আয় প্রবাহের দুর্বলতা চলতি হিসাবে ঘাটতি সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেছে। আশা করা যায়, মুদ্রা বিনিময় হারের এ স্থিতিশীলতা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিযোগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অর্থনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে যে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছেন, তাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত প্রবাসী আয় গত অর্থবছরের তুলনায় কমে গেছে। প্রবাসী আয় বাড়ানো বা একে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য কার্যকর কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে অর্থমন্ত্রী তার দেয়া প্রতিবেদনে কিছুই বলেননি। দেশের বিশিষ্ট অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, প্রবাসীরা দেশে তাদের পরিবারবর্গের কাছে তাদের উপার্জিত অর্থ পাঠাচ্ছেন না বলে যে প্রবাসী আয় কমে গেছে, এমন নয়। প্রবাসীরা তাদের উপার্জিত অর্থ ঠিকই দেশে পাঠাচ্ছেন, তবে তা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে না হয়ে অন্য মাধ্যমে হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে তা যোগ হচ্ছে না। তাদের মতে, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণের পাশাপাশি সাম্প্রতিক উৎপাত হিসেবে ‘বিকাশ’ রেমিট্যান্স প্রেরণে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অর্থাৎ প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ প্রেরণ না করে বিকাশের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছে। এতে প্রবাসীর আত্মীয়রা বিকাশের দেশীয় এজেন্টের কাছ থেকে ঠিকই টাকা পেয়ে যাচ্ছেন; কিন্তু দেশে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবেশ করছে না। এটা অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অর্থনীতিবিদদের অভিমত। এ বিষয়ে অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক মেজর তারিকুল ইসলাম মজুমদার (অব.) বলেন, এক অর্থবছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ১৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে যাওয়া কোনো ছোটখাটো বিষয় নয়। কেন এই প্রবাহের গতি দিন দিন কমে যাচ্ছে, তা অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের খুঁজে বের করতে হবে। প্রবাসী আয়ের বিষয়টি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারলে অর্থমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী বলা যাবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যকর ও গতিশীল নেতৃত্বে দেশ সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।