প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিমি দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : মেরিন ড্রাইভওয়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে


নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নির্মিত কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভওয়ে গত ৬ মে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেরিন ড্রাইভওয়েটির শুভ উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন ১৯৯৩ সালে এই মেরিন ড্রাইভ সড়কটির নির্মাণ কাজ শুরু করে। ১৯৯৪ সালে সেনাবাহিনী প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পুনরায় প্রকল্পটির কাজ হাতে নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সরকার সম্পূর্ণ প্রকল্পটিকে ৩টি ভাগে ভাগ করে অর্থায়ন করে এবং তা নির্মাণের নির্দেশনা প্রদান করে। ২০১৮ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস আগে ২০১৭ সালের এপ্রিলে মেরিন ড্রাইভওয়েটির কাজ সম্পন্ন হয় এবং ৬ মে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।
সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন সাগর থেকে সড়কটি রক্ষায় ইট, সিমেন্ট, আর লোহা দিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি টেট্রাপড ব্যবহার করে। এই টেট্রাপড ব্যবহারের প্রেক্ষিতে গত বছরের মে মাসে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে হিমছড়িকে রক্ষা করা সম্ভব হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে এর সাথে সংশ্লিষ্ট সেনা সদস্যদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে প্রায়ই রাস্তাটির ভাঙন ছিল মূল সমস্যা। অন্যদিকে পাহাড় বেয়ে নেমে আসা পানির ঢল সড়ক বাঁধকে ক্ষতিগ্রস্ত করছিল। যে কারণে রাস্তাটিকে প্রতিনিয়তই পুনঃনির্মাণ করতে হয়েছিল। প্রকল্প এলাকায় নির্মাণ সামগ্রী পৌঁছানোও ছিল যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।
লবণাক্ত আবহাওয়ায় রড, প্রকৌশল যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সংবেদনশীল ধাতুতে মরিচা ধরে যাওয়ায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ঝড় ও প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে হয়েছিল সেনাসদস্যদের। উল্লেখ্য, প্রকল্প বাস্তবায়নকালে ২০১০ সালের ১৫ জুন পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে সেনাবাহিনীর ৬ জন সদস্য মৃত্যুবরণ করেন। মেরিন ড্রাইভওয়েটির শুভ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টি স্মরণ করে বলেন, এই মেরিন ড্রাইভওয়ে নির্মাণের জন্য আমাদের সেনাবাহিনী যে কষ্ট করেছে, তারা সেই ২০১০ সালে যখন কাজ শুরু করলো, এখানেতো কাজ করতে গেলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতি দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই কাজ করতে হয়। এখানে কাজ করতে গিয়েই পাহাড় ধসে মাটি চাপা পড়ে আমাদের সেনাবাহিনীর ৬ জন সদস্য জীবন দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, আমার খুব কষ্ট লাগছে, আবার একদিকে আমরা আনন্দিত। আমার এতগুলো মানুষ এখানে জীবন দিয়েছেন, যারা এখানে ক্যাম্প করে ছিলেন। কিন্তু তারা সেখানে মাটিচাপা পড়ে জীবন দিয়ে যান। তাদের কথা সব সময়ই আমার মনে হয়। এত বাধাবিঘœ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই আমাদের সেনাবাহিনী বিশেষ করে ১৬ ইসিবি এটাকে সুন্দর করে নির্মাণ করে দিয়েছেন। এ জন্য তিনি এই কর্মের সঙ্গে সংযুক্ত সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকলে খুব আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন বলেই এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মেরিন ড্রাইভওয়েটি বাস্তবায়নের ফলে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ সৃষ্টি হলো। ফলে এ এলাকার জনগণের জীবনযাত্রার মান, কর্মসংস্থান, শিক্ষার হার বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের পর্যটন শিল্পে বড় সম্ভাবনার সূচনা হবে এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে মেরিন ড্রাইভওয়েটি। দেশের একমাত্র মেরিন ড্রাইভওয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার, স্থানীয় সংসদ সদস্য, সামরিক/অসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
৮০ কিমি দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের সড়ক পথটি ৪-লেন করার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিতে কক্সবাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সকাজার সড়কটিও ৪-লেন করার ঘোষণা দিয়ে বলেন, এই মেরিন ড্রাইভওয়ে ’৭৫ এর পর থেকে দীর্ঘদিন অবহেলিত কক্সবাজারের সৌন্দর্য অবলোকনে শুধু পর্যটকদের আকর্ষণই করবে না বরং এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত এই মেরিন ড্রাইভটি নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস আগেই নির্মাণ কাজ শেষ করে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তৃতা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এন সিদ্দিক।
শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে একটি আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানিয়ে কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নের নানা পরিকল্পনার কথাও ভাষণে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের এই রাস্তাটিকে ৪-লেনে উন্নীত করা হবে। কারণ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ৪-লেন আমরা করেছি। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার এই রাস্তাটিকেও ৪-লেনে উন্নীত করে যোগাযোগের ব্যবস্থা করবো। কক্সবাজার এয়ারপোর্টে যাতে প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে অন্তত একটা ফ্লাইট আসতে পারে আপাতত সেই ব্যবস্থাটা আমরা করে দিচ্ছি। কক্সবাজার বিমানবন্দরটিকে একটি আধুনিক বিমানবন্দর হিসেবেই গড়ে তোলা হবে। সেই প্রকল্পও আমরা শুরু করেছি। আপাতত একটি টার্মিনাল ভবন থেকে শুরু করে সবকিছুর কাজ আমরা শুরু করবো।
এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর যে সমস্ত মানুষ এই এলাকায় থাকতো- আপনারা জানেন, প্রায় ৪ হাজারের মতো মানুষ তাদের জন্য আমরা আলাদাভাবে কর্ণফুলী নদীর ওপারে ঘর-বাড়ি ও ফ্ল্যাট তৈরি করে দিচ্ছি। এদের অধিকাংশই শুঁটকি তৈরি করেন, শুঁটকি বিক্রি করেন। তাদের জন্য সেখানে শুঁটকির হাটও করে দেয়া হবে। শুঁটকি মাছ শুকানোসহ তাদের বাসস্থানেরও জায়গা করে দেয়া হবে। ইতোমধ্যে সেই উন্নয়নের কাজও চলছে এবং নদীর ওপরে শিগগিরই ব্রিজ বানানো হবে। এখানকার মানুষগুলোকে সেখানে পুনর্বাসনের পাশাপাশি আমরা বিমানবন্দরের জন্য নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ করবো এবং রানওয়েটাকেও আরো প্রশস্ত ও দীর্ঘ করা হবে। এটা যেহেতু আন্তর্জাতিক এয়ার রুটে পড়ে তাই ভবিষ্যতে যেকোনো দেশ থেকে এখানে এসে যেন বিমান রিফ্যুয়েলিং করতে পারে তার ব্যবস্থাও করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ বছর পর দেশসেবার সুযোগ লাভের পর থেকেই দেশের সার্বিক উন্নয়নে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কক্সবাজার সব সময়ই অবহেলিত ছিল, এত সুন্দর আমাদের একটা সমুদ্র সৈকত। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এবং দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ আসে। কাজেই এই অঞ্চলটাকে আরো সুন্দর ও আকর্ষণীয়ভাবে গড়ে তোলাটা আমাদের কর্তব্য বলেই আমরা মনে করি। এই কক্সবাজারে আমি অতীতে বহুবার এসেছি, শুধু যে বেড়াতে এসেছি তা নয়, ’৯১-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর আমরা এখানে এসে দিনের পর দিন থেকেছি। বিভিন্ন দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়িয়েছি। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না, মাছের ট্রলারে করে ঘুরে বেড়িয়েছি, সাম্পানে করে বা কেউ একটু লঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে সেভাবে ঘুরেছি। পায়ে হেঁটে প্রত্যেকটি অঞ্চল ঘুরে রিলিফ ওয়ার্ক করেছি এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। সব সময়ই একটা চিন্তা ছিল যে, কিভাবে এই দরিদ্র মানুষগুলোর ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাব। আজকে যে মেরিন ড্রাইভ উদ্বোধন হলো সেই মেরিন ড্রাইভের মধ্য দিয়ে যেমন মানুষ সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবে সেই সাথে সাথে এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নেরও বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ অঞ্চলের মানুষের সার্বিক উন্নয়নের একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি আমাদের এই দেশটাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাব। ইতোমধ্যে আমরা অনেক উন্নয়ন কাজ করেছি। তবে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই খারাপ অবস্থায় রয়েছে যে, তা বলার মতো নয়। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্যই কক্সবাজারের যোগাযোগ অবকাঠামোর সার্বিক উন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মেরিন ড্রাইভওয়ের উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে একযোগে ৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ৯টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম থেকে প্রধানমন্ত্রী একযোগে এই প্রকল্পগুলো উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ, কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ছাত্রীনিবাস, কক্সবাজার সরকারি কলেজের একাডেমিক ভবন-কাম-এক্সামিনেশন হল, কক্সবাজার সরকারি কলেজের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট ছাত্রীনিবাস, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিব মহিলা কলেজ, উখিয়া, কক্সবাজার-এর দ্বিতল একাডেমিক ভবন এবং মহেশখালী-আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন পাইপ লাইন উদ্বোধন করেন।
আর যে ৯টি প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, সেগুলো হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প (১ম পর্যায়), এলজিইডি অংশ-এর আওতায় কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলাধীন বাকখালী নদীর উপর খুরুস্কুল ঘাটে ৫৯৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে পিসি বক্সগার্ডার ব্রিজ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কক্সবাজার আইটি পার্ক, এক্সিলাটে এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেড কর্তৃক নির্মিতব্য মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, সামিট এলএনজি টার্মিনাল কো. (প্রা.) লিমিটেড কর্তৃক নির্মিতব্য কক্সবাজার মহেশখালীতে দ্বিতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় এসপিএম (ইনস্টলেশন অব সিংগেল পয়েন্ট মুরিং) প্রকল্প, নাফ ট্যুরিজম পার্ক, কুতুবদিয়া কলেজের একাডেমিক ভবন এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস ভবন। এরপর কক্সবাজারের শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কক্সবাজার শাখা আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাদক এক একটা পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। এই মাদকের ছোবলে এক একটা মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়। কোনো বাবা-মা চায় না যে তার সন্তান এভাবে অকালে মৃত্যুর পথে চলে যাক। এভাবে শেষ হয়ে যাক, কাজেই এই মাদকদ্রব্য থেকে আমাদের সন্তানদের রক্ষা করার জন্য সমাজের সকল স্তরের জনগণের কাছে আমি আহ্বান জানাচ্ছি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারের বদনাম রয়েছেÑএখান থেকে নাকি ইয়াবা সারা বাংলাদেশে সরবরাহ হয়। এই ইয়াবা সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদেরকে শাস্তি পেতেই হবে। তাদের কোনোরকম রেহাই দেয়া হবে না।
জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে উত্তরণে দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা একটা জিনিসই চাই সারাদেশের ইমাম, মুয়াজ্জিন, ওলামা-মাশায়েখ শিক্ষকসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যারা আছেন এই কক্সবাজারবাসী সবাইকে আমি বলব সারাদেশে আমাদের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সনদের মান সম্পর্কে বলেন, আমাদের ১৪ লাখ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী রয়েছে তাদের মূল ধারার বাইরে রেখে কখনও সমগ্র দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। অতীতে তাদের কোনো কারিকুলাম না থাকায় এবং এই শিক্ষার কোনো স্বীকৃতি না থাকায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছিল। কাজেই এই শিক্ষার্থীদের সনদের একটি স্বীকৃতি দানের জন্য কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের দিয়েই একটি কমিটি করে তাদের জন্য নিজস্ব কারিকুলাম তৈরির নির্দেশ দিয়েছি, যাতে তাদের সনদের একটা স্বীকৃতি প্রদান করা যায়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের উদ্যোগে দেশে আরবি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন।
এর আগে মেরিন ড্রাইভওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে সমুদ্রের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে উখিয়া উপজেলায় ইনানী বিচে সমুদ্রজলে হাঁটেন শেখ হাসিনা। খালি পায়ে তিনি হেঁটে বেড়ান বালুকাবেলায়। ইনানীর বে ওয়াচ রিসোর্টের সামনে সৈকতের বেলাভূমিতে তৈরি করা মঞ্চে হয় মেরিন ড্রাইভওয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠান। দুপুরে অনুষ্ঠান শেষ হলে শেখ হাসিনা সোজা সৈকতে নেমে যান। সেখানে কিছুক্ষণ খালি পায়ে হাঁটেন তিনি, নামেন পানিতেও। বে ওয়াচ রিসোর্টেই মধ্যাহ্নভোজ সারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সমুদ্রের বিশালতা মানুষকে মুগ্ধ করে, কাছে টানে। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উচ্ছ্বাস-আনন্দে সমুদ্র দর্শন করেন। ঝিনুকফোটা সাগরবেলায় তিনি অনেকটা সময় খালি পায়ে হাঁটেন। মন ভেজান সমুদ্রের ঢেউয়ের তালে। অনুষ্ঠানের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রথম সমুদ্র দেখার অভিজ্ঞতার কথা জানান। ইনানীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিও। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসনামলে অরণ্যঘেরা ইনানীর চেংছড়ি গ্রামে বেশ কিছু দিন ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।