প্রতিবেদন

২০১৮ সালের মধ্যে দেশে ইন্টারনেট সক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়বে- বিএসসিসিএল এমডি ইঞ্জিনিয়ার মনোয়ার হোসেন

বিশেষ প্রতিবেদক : দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনের মাধ্যমে দেড় হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ সুবিধাসহ নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট নিয়ে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে গোটা দেশ। কক্সবাজারে প্রথম স্থাপিত সাবমেরিন স্টেশনের চেয়ে ৮গুণ ক্ষমতাসম্পন্ন হবে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় নির্মাণাধীন এই সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনটি। এটি চালু হলে সারাদেশের মানুষ দ্রুত গতির নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা পাবেন। শুধু তাই নয়, এ প্রকল্পটি চালু হলে এর উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নেটওয়ার্কের কারণে দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ব্যান্ডউইডথ রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করাও সম্ভব হবে বলে স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের এমডি ইঞ্জিনিয়ার মো. মনোয়ার হোসেন। তিনি আরো জানান, দেশে ২০১৮ সালের মধ্যে ইন্টারনেটের ব্যবহার দ্বিগুণ হবে। এতে ব্যান্ডউইডথ (ইন্টারনেট একক) ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়বে আড়াইগুণ। পরিমাণের দিক থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার হবে ১ টেরাবাইট। জন্মলগ্ন থেকে বিএসসিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. মনোয়ার হোসেন স্বদেশ খবরকে জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা অন্তত সাড়ে ৫ কোটি। ক্রমেই এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে কক্সবাজারে একটি মাত্র সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে দেশে ইন্টারনেট সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু এ সাবমেরিন স্টেশনটির ক্যাবল (তার) লাইন কাটা পড়লে বিএসসিসিএলের কাছে নেটওয়ার্ক সরবরাহের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় গ্রাহকরা প্রায়ই চরম দুর্ভোগের শিকার হন। পটুয়াখালীর ল্যান্ডিং স্টেশনটি চালু হলে গ্রাহকদের আর এ দুর্ভোগে পড়তে হবে না। আর কক্সবাজারে নির্মিত ২০০ জিবিপিএস ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম সাবমেরিন স্টেশনটির লাইফ টাইম শেষে পটুয়াখালীর উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমেরিন ক্যাবল স্টেশন থেকে গোটা দেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সরবরাহ করা হবে। এটি চালু হলে গ্রাহকরা খুব সহজেই দ্রুত গতিসম্পন্ন নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কে ইন্টারনেট সুবিধা পাবেন।
জানা যায়, কুয়াকাটার লতাচাপলি ইউনিয়নের আমখোলা গ্রামে ২০১৩ সালের শেষের দিকে প্রায় ১০ একর জমির ওপর ৬৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে প্রকল্পটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে সাগরের তলদেশ দিয়ে ফ্রান্স থেকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত ২৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যাবল লাইনের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ইউরোপ থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে আসা সঞ্চালন লাইন সংযুক্তির জন্য ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কুয়াকাটার স্টেশন থেকে মাত্র সাড়ে ৯ কিলোমিটার দূরত্বে উপকূলের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে আসা লাইনটির সংযোগ স্থাপনের কাজ শেষ করেই চালু করা হবে দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন স্টেশনটি।
বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেডের এমডি ইঞ্জিনিয়ার মো. মনোয়ার হোসেন স্বদেশ খবরকে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশন। দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল সংযুক্ত হওয়ায় দেশে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ পাওয়া যাবে। ভবিষ্যতে এই ক্যাবলের মাধ্যমে আরও ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ ৪০০ জিবিপিএসের বেশি। এই ৪০০ জিবিপিএসের মধ্যে ১২০ জিবিপিএস বিএসসিসিএলের প্রথম সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে আসছে। বাকি ২৮০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ আইটিসির মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা হচ্ছে।
বিএসসিসিএল এমডি বলেন, বর্তমানে কুয়াকাটা-ঢাকা ব্যাকহোল লিংক স্থাপন হয়েছে। তবে ব্যাকহোল লিংক স্থাপনের কাজে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন বলে জানান। ব্যাকহোলের ক্যাবল মাটির নিচ দিয়ে না নিয়ে অনেক জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে আনা হয়েছে। এতে ওই ক্যাবল মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এরপরও বিএসসিসিএল ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ টেস্টিং কাজ শেষ করেছে। পুরোপুরিভাবে দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের কাজ শেষ হলে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা ল্যান্ডিং স্টেশনের ট্রান্সমিশন লিংক স্থাপনের কাজ দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে বলে বিএসসিসিএল এমডি জানান।
ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো (আইএসপি) জানিয়েছে, দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দেশে ইন্টারনেট সেবার ক্ষেত্রে আরেক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। এতে করে একটি ক্যাবল কোনো কারণে বিকল হলে অন্য ক্যাবলটি ব্যাকআপ হিসেবে কাজ করবে। দেশে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা থাকবে। ফলে ব্যবসাবাণিজ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজকর্মে গতি বাড়বে। দেশে বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলে যুক্ত হওয়ার ফলে এখন একটা নিশ্চিত ব্যাকআপ তৈরি হলো।
বিএসসিসিএল এমডি জানান, প্রতিটি সাবমেরিন ক্যাবলের লাইফ টাইম ১০ থেকে ১৫ বছর। এখনই উচিত তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের চিন্তা করা। ভারত অন্তত ২০টি সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সদস্য দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর, ইতালি, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া ও ফ্রান্স। সি-মি-উই-৫ কনসোর্টিয়ামে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরবসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিয়ে। দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের মালিকও দ্বিতীয় কনসোর্টিয়ামের সদস্য দেশগুলো।
উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ব্যান্ডউইডথের পরিমাণ প্রায় ৪২১ জিবিপিএস। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে ১৬০ ও বেসরকারি পর্যায়ে ২৬০ জিবিপিএসের মতো ব্যান্ডউইডথ ব্যবহৃত হয়ে থাকে।