প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

আরব ইসলামিক-আমেরিকান (এআইএ) সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সক্রিয় অংশগ্রহণ : মুসলিম উম্মায় শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান


বিশেষ প্রতিবেদক : বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম বিদেশ সফর করেন সৌদি আরবে। দেশটিতে আরব ইসলামিক-আমেরিকান (এআইএ) সম্মেলনের আয়োজন করেন সৌদি বাদশা সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদ। সৌদি বাদশার আমন্ত্রণে মুসলিম উম্মার একজন শক্তিশালী প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা এআইএ সম্মেলনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনে আরব অধ্যুষিত দেশসমূহের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানরা অংশ নিলেও মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এআইএ সম্মেলনে অংশ নিয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর দেশ বাংলাদেশ যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেÑতাও ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদসহ সব নেতাকে স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের রেশ ধরে সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মুসলিম উম্মার নেতারা ও ধর্মীয় প্রধানরা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এআইএ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সক্রিয় অংশগ্রহণ সম্মেলনটিকে সাফল্যম-িত হতে অনেকটাই সাহায্য করে। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, এআইএ’র সন্ত্রাসবিরোধী জোটে বাংলাদেশ সব সময় সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে এবং এআইএ’র পাশে থাকবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবের মধ্যে এই সম্মেলন সীমাবদ্ধ থাকার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সৌদি বাদশা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ইরাক ও সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সৌদি আরব যে সামরিক জোট গঠন করতে যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ সৈন্য প্রেরণ করবে কি না এবং বাংলাদেশ এক্ষেত্রে রাজি হবে কি না, তা ছিল একটি বড় প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রেও তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করে পুরো মুসলিম উম্মার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করে তোলেন। মুসলিম বিশ্বের একজন শক্তিশালী প্রতিনিধি হিসেবে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেন, রিয়াদ ঘোষণা অনুযায়ী ইরাক ও সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে পাশে থাকলেও সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয় বাংলাদেশ। সৌদি আরবে শুধু মক্কা-মদিনার পবিত্র দুই মসজিদ আক্রমণ হলেই বাংলাদেশ সৈন্য পাঠাতে পারে। এছাড়া অন্য কোনো জোটে বাংলাদেশ সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয়। কূটনীতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরব ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলনে বাংলাদেশ যোগ দেয়ায় রিয়াদ-ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক আরও গভীর ও সুদৃঢ় হবে।
দুই.
সৌদি আরবের রিয়াদে ২১ মে অনুষ্ঠিত আরব ইসলামিক-আমেরিকান সন্ত্রাসবিরোধী সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে ভাষণ দেন। তিনি এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান তুলে ধরেন। রিয়াদ সম্মেলনে বিশ্বের ৫৬টি দেশ অংশগ্রহণ করেছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে সামরিক জোট গঠন করা হয়, প্রধানত সেই জোটের দেশগুলোই এই সম্মেলনে অংশ নেয়। তবে এই সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যোগ দেয়ায় আরব ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলনে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে বিজয়ের পর এই প্রথমবারের মতো বিদেশের মাটিতে কোনো সম্মেলনে যোগ দিলেন। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি বেশ গুরুত্বের। কারণ বিদেশে অংশ নেয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম কোনো সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রিয়াদ ঘোষণায় ইরাক ও সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সেখানে অভিযানের জন্য প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি সৈন্যের একটি বাহিনী গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। তবে ঢাকা ও রিয়াদের কূটনীতিকরা বলছেন, রিয়াদ ঘোষণা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের যৌথ উদ্যোগে সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলা হলেও বাংলাদেশ সেখানে সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয়। সৌদি আরব তথা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পবিত্র স্থান মক্কা-মদিনার পবিত্র মসজিদ আক্রান্ত হলে এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে কোনো জোট হলে সেখানে বাংলাদেশ সৈন্য পাঠাবে। তবে অন্য কোনো জোটে বাংলাদেশ সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয়।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আইএসবিরোধী সামরিক জোটে যোগ দেয় বাংলাদেশ। আইএসবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব একযোগে কাজ করবে বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। আইএসবিরোধী জোটে থেকে সন্ত্রাস প্রতিরোধে তথ্য বিনিময়, প্রশিণ ইত্যাদি কাজে যুক্ত থাকবে বাংলাদেশ। তবে সরাসরি সেই জোটে সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয় বাংলাদেশ। ঠিক একইভাবে রিয়াদ ঘোষণা অনুযায়ী ইরাক-সিরিয়ার সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়েও সৈন্য পাঠাতে আগ্রহী নয় বাংলাদেশ। এই জোটেও বাংলাদেশ তথ্য বিনিময়, প্রশিণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় ইত্যাদি কাজে যুক্ত থাকতে চায়।
তিন.
শ্রম বাজারের দিক থেকে সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সৌদি আরবে প্রায় ২৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। দেশটির শ্রম বাজারে আধা দ ও দ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ সৌদি আরবে আরও অধিক হারে জনশক্তি রপ্তানি করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সৌদি আরব সফরের মধ্যে দিয়ে সেদেশে জনশক্তি রপ্তানির পথ আরও প্রশস্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনেক আগে থেকেই জনশক্তি রপ্তানির জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর ও বন্ধুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ সেজন্যই সৌদি আরবকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তাই এই সম্মেলনও সৌদি আরব আয়োজন করলে বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই এতে সাড়া দেয়।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, সৌদি আরবে আরব ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলনে যোগ দেয়াটা বাংলাদেশের জন্য সঠিক ও ইতিবাচক পদপে। সৌদি আরবের এই সম্মেলনে যোগ দেয়ার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে; বরং বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান আরও জোরালো হয়েছে। তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশের অনেক জঙ্গি সংগঠনের অর্থ আনার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জেএমবির বিরুদ্ধেই এই অভিযোগ বেশি। এছাড়া আরও অনেক সংগঠন আছে, যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ আনছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মেলনে যেসব ঘোষণা দিয়েছেন, তার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের জঙ্গিদের প্রভাব কমে আসবে। সৌদি সম্মেলন থেকে ইরানবিরোধী যেসব ঘোষণা এসেছে, সে ঘোষণায় বাংলাদেশ ও ইরান সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না। কেননা ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ইরানও সেটা বোঝে। চীন-ভারত দ্বিপীয় সম্পর্ক খুব ভালো নয়। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সমান সুসম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সব সময় জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। আগামীতেও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই অগ্রসর হবে। তাছাড়া আরব ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলনে অংশ নেয়ার ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে।
চার.
প্রথম আরব ইসলামিক-আমেরিকান শীর্ষ সম্মেলন ২০ মে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বাদশাহ আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হয়। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদ শীর্ষ সম্মেলন উদ্বোধন করেন। শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানকারী অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব-আমিরাতের আমির, বাহরাইনের বাদশাহ, ব্র“নাই দারুসসালামের সুলতান, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বেনিন, লেবানন, মৌরিতানিয়া, তিউনেশিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক ও নাইজারের প্রেসিডেন্ট, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, আলজেরিয়া পার্লামেন্টের চেয়ারম্যান এবং উগান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সৌদি বাদশাহর উদ্বোধনী ভাষণের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বক্তব্য রাখেন। আমন্ত্রিত বিশ্ব নেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শীর্ষ সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। শীর্ষ সম্মেলনের মূল ল্য হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠা, সহিষ্ণুতা ও সৌহার্দ্যরে সম্প্রসারণ এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টা জোরদার করা।
পাঁচ.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোরভাবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা নিশ্চিত করতে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও অর্থায়নের জোগান বন্ধে বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সৌদি আরবের রাজধানীতে কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আরব ইসলামিক-আমেরিকান সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমরা অবশ্যই সন্ত্রাসীদের হাতে অস্ত্র সরবরাহ ও অর্থের উৎস বন্ধ করতে চাই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি বন্ধ ও শান্তির নীতি অবলম্বনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংলাপে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটি সকলের জন্য উইন উইন পরিস্থিতি তৈরি করবে। অনুষ্ঠানে সৌদি আরবের বাদশাহ ও দেশটির দু’টি বড় মসজিদের খাদেম সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহের সরকার ও রাষ্ট্র প্রধানগণ বক্তব্য রাখেন। শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস ও চরমপন্থা বিশ্বের শান্তির জন্য কেবল বড় হুমকিই নয়, এটি উন্নয়ন ও মানব সভ্যতার জন্যও প্রধান প্রতিবন্ধক। এটি যেকোনো দেশ, ধর্ম ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ সকল প্রকার চরমপন্থার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং সর্বদাই যেকোনো ধরনের একক বা সম্মিলিত সন্ত্রাস ও উৎসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। ইসলামকে সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম, বিশ্বাস বা মৌলিক পরিচয় নেই, তারা যেকোনো ধর্ম থেকে আসুক না কেন।’ ইসলামকে শান্তির ধর্ম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ইসলাম কখনো সহিংসতা বা হত্যাকা- সমর্থন করে না এবং আমরা যেকোনো ধরনের চরমপন্থা ও সহিংসতায় ধর্মকে ব্যবহারের পক্ষপাতী নই।
শেখ হাসিনা বলেন, ইরাক ও সিরিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহের অভিযান এবং সদস্য সংগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর যুক্তরাষ্ট্রের মার্শাল পরিকল্পনা অনুসরণে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সংকটের কারণে সন্ত্রাস ও সহিংসতা বেড়ে যেতে পারে। কারণ শরণার্থী সংকট সন্ত্রাস ও সহিংসতার একটি সম্ভাবনাময় উৎসে পরিণত হতে পারে। সমুদ্র সৈকতে পড়ে থাকা ৩ বছরের শিশু আয়নালের লাশের ছবি অথবা আলেপ্পোতে ওমরানের রক্তাক্ত মরদেহ প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। একজন মা হিসেবে আমাকেও নিষ্ঠুর এ ছবি কঠিনভাবে নাড়া দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, শরণার্থীদের বেদনা আমি বুঝি। কারণ আমিও শরণার্থী ছিলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবারের বন্দিত্ব এবং ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের শাহাদতবরণের পর প্রবাস জীবনের কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ৬ বছর আমি ও আমার ছোট বোন বিদেশে শরণার্থী ছিলাম। তাই শরণার্থীদের বেদনার বাস্তবতা আমি বুঝতে পারি।
শেখ হাসিনা বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও বঞ্চনা নতুন প্রজন্মের মনে অন্যায়-অবিচারের প্রতি ঘৃণার মনোভাবের সৃষ্টি হয়। তাই একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় আমাদেরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো প্রস্তুত এবং অস্ত্রসহ যথাযথ প্রশিণ প্রাপ্ত। তারা দেশে গজিয়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের কার্যকরভাবে মোকাবিলা করছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে তাঁর সরকার জনগণকে যুক্ত করে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও জানান শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, আমরা কার্যকরভাবে দেশে গজিয়ে ওঠা উগ্রবাদীদের মোকাবিলা করছি। বেশ কয়েকটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব গোষ্ঠী কোনো কোনো মহল থেকে সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়ে আসছিল। পাশাপাশি সরকার এদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যাপক প্রচারাভিযান চালাচ্ছেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সমাজের সকল শ্রেণি বিশেষ করে জনপ্রতিনিধি, শিক, ছাত্র এবং দেশব্যাপী মসজিদের ইমামদের সঙ্গে সভা ও মতবিনিময় করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত আরব ইসলামিক-আমেরিকান শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত। তাঁকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তিনি সৌদি বাদশাহ সালমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা রিয়াদে ইসলামিক কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়ার জন্যও বাদশাহ সালমানকে ধন্যবাদ জানান। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হতে পেরে সন্তুষ্ট ও গর্বিত।
ছয়.
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ পৌঁছানোর পর তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেয়া হয়। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সউদের আমন্ত্রণে আরব ইসলামিক আমেরিকান (এআইএ) সম্মেলনে যোগ দিতে ৪ দিনের সরকারি সফরে ২০ মে প্রধানমন্ত্রী রিয়াদ পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সফরসঙ্গীদের নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের ফাইটটি স্থানীয় সময় রাত ১১টা ১৫ মিনিটে বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সৌদি শূরা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ ফয়সাল বিন আবু সাদ এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান। পরে মোটর শোভযাত্রাসহকারে শেখ হাসিনাকে রিয়াদের মোভেনপিক হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সৌদি আরব সফরকালে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।
সৌদি আরব সফরকালে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি বাদশাহর নিমন্ত্রণে এক ভোজসভায়ও যোগ দেন। ভোজসভায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ এআইএ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের নেতারাও যোগ দেন।
প্রধানমন্ত্রী মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের ল্েয ২২ মে বিমানে মদিনার উদ্দেশে রিয়াদ ত্যাগ করেন। মদিনায় বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে প্রধানমন্ত্রী হারেম শরিফে পবিত্র ওমরা পালনের জন্য মক্কায় যান এবং ২৪ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন।