কলাম

নকল ডিম প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া

অধ্যাপক আ ব ম ফারুক : ১৯ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠের প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘কৃত্রিম ডিমে বাজার সয়লাব, সাবধান!Ñরিপোর্টটি প্রকাশের জন্য ধন্যবাদ। দেশের মানুষকে সতর্ক করার মধ্য দিয়ে পত্রিকাটি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট একটি সংস্থা নকল ডিমের খবরটিকে নেহাত গুজব বলে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এটি পরদিন ২০ মে ২০১৭ তারিখে পত্রিকার শেষের পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, তাদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারছি না। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে নকল ডিমের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা প্রবল হয়েছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। বাংলাদেশে আমরা যারা ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার নিয়ে কিছু কাজের সঙ্গে জড়িত তারাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিষয়টি প্রথম আমাদের নজরে আসে ২০১১ সালে যখন কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব পেনাংয়ের সভাপতি সংবাদ সম্মেলন করে মালয়েশিয়ায় নকল ডিমের ছড়াছড়ি বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি নকল ও আসল ডিম চেনার উপায় সম্পর্কেও বিশদ বক্তব্য রাখেন। এরপর আরও বিভিন্ন মাধ্যমে গণচীনের হেনান প্রদেশের লোওয়ং থেকে এসব নকল ডিমের উৎপত্তি বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন ৬ নভেম্বর ২০১২ তারিখে এ বিষয়ে বড় রিপোর্ট প্রকাশ করে জানায় যে, নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকেই গণচীনের কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান এসব নকল ডিম ব্যাপকহারে উৎপাদন করে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রি শুরু করে। বাহ্যিকভাবে দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় ক্রেতারা প্রতারিত হতে থাকে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ২০০৪ সাল থেকে গণচীনের অসাধু ব্যবসায়ীরা এগুলো নিজের দেশে বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানিও শুরু করে এবং দামে সস্তা বলে অসাধু ব্যাপারি ও দোকানদাররা বিশে^র দেশে দেশে এটি বাজারজাত শুরু করে। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ক কর্মীরা এর বিরুদ্ধে বিশ^ময় মানুষকে সচেতন করতে শুরু করেন। তাদের কাজের কিছু প্রমাণ যেকোনো সার্চ ইঞ্জিনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে সহজেই পাওয়া যাবে।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর তারিখে দি উইক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী কেরালার বাজার নাকি নকল ডিমে সয়লাব হয়ে আছে, যা নাকি গণচীন থেকে তামিলনাডু হয়ে এখানে এসেছে বলে অনেকের দাবি। স্থানীয় একটি টিভি চ্যানেল দেখিয়েছে সেখানকার ইদুক্কি জেলার বাজারগুলোতে কিভাবে নকল ডিম বিক্রি হচ্ছে। টিভির এই রিপোর্টের পর পুলিশ সেসব বাজারে হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ডিম উদ্ধারও করেছে। এ প্রসঙ্গে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কে কে শৈলজা জানান, তিনি রাজ্যের ফুড সেফটি কমিশনারকে বিষয়টি তদন্ত করে অবিলম্বে রিপোর্ট দিতে বলেছেন।
এ বছরের ৩১ মার্চ ইন্ডিয়া টুডে কলকাতার বাজারে এসব নকল ডিমের লভ্যতা বিষয়ে খবর প্রকাশ করে জানায় যে, জনস্বাস্থ্যের ওপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাকে মাথায় রেখে এ বিষয়ে তদন্ত করতে কলকাতা পৌর করপোরেশন একটি শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ বছরের একই দিন ৩১ মার্চ ইন্ডিয়া টাইমস বিস্তারিত খবর প্রকাশ করে যে, কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকা থেকে মো. শামীম আনসারী নামের এক দোকানদারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে প্লাস্টিকের তৈরি নকল ডিম বিক্রি করছিল। কলকাতা পৌর করপোরেশন তার মেয়র-ইন-কাউন্সিল (স্বাস্থ্য) অতীন ঘোষকে প্রধান করে যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে তারা নগরীর বিভিন্ন বাজারে হানা দিয়ে এ ধরনের আরও নকল ডিম উদ্ধার করেছে। কমিটি জানতে পারে যে, গ্রেপ্তারকৃত দোকানদার আনসারী এসব নকল ডিম কিনেছে নগরীর মুচিপাড়া পাইকারি বাজার থেকে। বিপুল পরিমাণ নকল ডিম উদ্ধার করা হয়েছিল তা অনুমান করা যায় এই তথ্য থেকে যে, আনসারী এখান থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার রুপির নকল ডিম কেনার পরেও আরও বিশাল মজুদ তারা উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করেছে। এর পরদিন অর্থাৎ ১ এপ্রিল ২০১৭ টাইমস অব ইন্ডিয়া তার নগর সংস্করণে জানায়, কলকাতা সিটি করপোরেশনের মেয়র শোভন চ্যাটার্জী এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার উভয়ই এরকম উদ্বেগজনক ঘটনার একেবারে গভীরে গিয়ে তলিয়ে দেখতে নিজ নিজ দপ্তরকে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ সন্দেহ করছে গণচীনের তৈরি এসব নকল ডিমের চালান অন্ধ্র প্রদেশ হয়ে কলকাতায় ঢুকেছে।
বাংলাদেশের বাজারে নকল ডিমের উপস্থিতির বিষয়ে যমুনা টিভিসহ আরও একটি টিভি চ্যানেলের প্রচারিত রিপোর্ট আমি দেখেছি। তাদের রিপোর্টকে আমার কাছে গুজব বলে মনে হয়নি। কারণ আমি নিজে ঢাকার পলাশী বাজারের সেলিমের দোকান থেকে ২ বছর আগে ১ ডজন ডিম কিনে তার মধ্যে ৫টি নকল ডিম পেয়েছি। দোকানে গিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েও আমি কোনো প্রতিকার কিংবা ডিম/টাকা কোনোটাই ফেরত পাইনি। প্রায় একই সময় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় এলাকার ফুলার রোডে অবস্থিত একটি মুদি দোকানকে নকল ডিম বিক্রির অভিযোগে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপ বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশে যারা নকল ডিমের অস্তিত্বকে স্রেফ গুজব বলে অভিহিত করতে চান তাদের বিনীতভাবে অনুরোধ জানাব, বিষয়টির শুধু ব্যবসায়িক দিক বিবেচনায় না নিয়ে সঠিকভাবে খোঁজখবর নিয়ে তারা যেন মতামত প্রকাশ করেন। নকল ডিমের বিরুদ্ধে কথা বললে, কোনো গণমাধ্যমে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে কিংবা সরকার এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাইলে দেশের পোলট্রি শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবেÑএমন যুক্তি আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের অর্থনীতিতে আমাদের পোলট্রি শিল্পের ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি কখনও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি হয় তখন যথাযথ প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে শিল্পরার দোহাই দিলে চলবে না। শিল্প অবশ্যই রা করতে হবে, তবে জনগণের স্বাস্থ্যকে আমলে নিতে হবে সবার আগে। তাই পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ, বাজারে নকল ডিমের উপস্থিতির সমস্যাকে এড়িয়ে না গিয়ে বরং আসুন সমস্যার মুখোমুখি হই, সমস্যাকে উপলব্ধিতে নিই এবং ব্যবসার নামে অতিলোভী অসাধু আমদানিকারক/চোরাকারবারি, পাইকার ও দোকানদারদের বিরুদ্ধে নিজেরাই সোচ্চার হই এবং এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে সহযোগিতা করি। কেবল এভাবেই পোলট্রি শিল্পের প্রতি জনগণের আস্থাকে অব্যাহত রাখা যাবে এবং শিল্প ও জনগণ উভয়ই বাঁচবে। ওষুধ ও খাদ্যে নকল-ভেজাল-নিম্নমান প্রতিরোধে বর্তমান সরকার সব সময়ই আন্তরিক বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। নিশ্চয়ই সরকার জনস্বাস্থ্য রায় এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবে। আসুন রবি ঠাকুরের সেই চরণগুলোকে স্মরণ করি, ‘ভালোমন্দ যাই আসুক/সত্যরে লও সহজে/সে কখনো করে না বঞ্চনা।
লেখক : অধ্যাপক
ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়