প্রতিবেদন

বিএনপিকে আবারো সন্ত্রাসী সংগঠন বলল কানাডার ফেডারেল কোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক : কানাডার ফেডারেল আদালতে আবারও সন্ত্রাসী সংগঠনের তকমা পেল বিএনপি। দলটির একজন নেতার আশ্রয়ের আবেদন নিষ্পত্তি করে দেয়া রায়ে বিচারক বলেন, বিএনপি এমন একটি সংগঠন যেটি সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত ছিল, এখনও রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও লিপ্ত হতে পারে। গত ১২ মে ফেডারেল আদালতের ওয়েবসাইটে রায়টি প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি কানাডার আরেক বিচারক বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছিল। ২৪ মে কানাডার অন্টারিওর ফেডারেল আদালতের ওয়েবসাইটে মামলাটির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ পায়। মামলাটির নাম এস এ বনাম কানাডা (জননিরাপত্তা ও জরুরি প্রস্তুতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়)। বিএনপির ওই নেতাকে মামলার কার্যক্রমে শুধু এস এ নামে পরিচয় দেয়া হয়। এ বিষয়ে রায়ের শুরুতেই বলা হয়, নাম প্রকাশ হলে নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারেÑওই নেতা এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করে তা গোপন রাখার অনুরোধ করেছেন। অবশ্য রাষ্ট্রপ ওই আবেদন অযৌক্তিক বলে আপত্তি জানায়। এর আগে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবী দলের একজন কর্মীর রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত জুডিশিয়াল রিভিউর আবেদনে ফেডারেল কোর্টের বিচারক জাস্টিস ব্রাউন বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। এবার একই কোর্টের আরেক বিচারক একই ধরনের মন্তব্য করলেন। নথি থেকে জানা গেছে, ‘এস এ’ আদ্যরের ব্যক্তিটি ২০০৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র যুব শাখা জাতীয়তাবাদী যুবদলে যোগ দেয়। ২০১২ সালে তিনি বিএনপির নির্বাহী কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারির দায়িত্ব পান। ২০১৪ সালে তিনি কানাডায় এসে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে ইমিগ্রেশন ডিভিশন তার আবেদনের শুনানি করে ওই দিনই সিদ্ধান্ত জানায়। ‘এস এ’ নিজেকে বিএনপি নেতা হিসেবে দাবি করেছেন উল্লেখ করে ইমিগ্রেশন ডিভিশন তাকে কানাডায় প্রবেশের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করে। ইমিগ্রেশন ডিভিশনের সিদ্ধান্তে বলা হয়, বিএনপি সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত আছে, সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত ছিল, সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হতে পারে’Ñএটা বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। কাজেই বিএনপির সদস্য হিসেবে ‘এস এ’ ইমিগ্রেশন ও রিফিউজি প্রোটেকশন অ্যাক্ট-এর ৩৪ (১) (এফ) ধারা মোতাবেক কানাডায় প্রবেশের অযোগ্য। ইমিগ্রেশন ডিভিশনের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফেডারেল কোর্টে জুডিশিয়াল রিভিউর আবেদন করেন ‘এস এ’। ফেডারেল কোর্টের বিচারক জে, ফদারগিল আবেদনটি খারিজ করে দিয়ে রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি করেন। একই সঙ্গে ফেডারেল কোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগের আবেদনটিও তিনি নাকচ করে দেন।
রায়ের নথিতে বলা হয়েছে, আদালতের বিবেচ্য বিষয় ছিল কানাডার ইমিগ্রেশন ও রিফিউজি প্রোটেকশন অ্যাক্ট-এর ৩৪ (১) (এফ) ধারা মোতাবেক ‘এস এ’কে কানাডায় প্রবেশের অযোগ্য বলে দেয়া ইমিগ্রেশন ডিভিশনের সিদ্ধান্ত যথাযথ কি না এবং আবেদনকারীকে আপিলের সুযোগ দিতে আবেদনকারীর উপস্থাপিত তিনটি প্রশ্ন সত্যায়িত করা হবে কি না।
রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিচারক বলেন, ইমিগ্রেশন ডিভিশনের পর্যালোচনায় আমি কোনো ভুল খুঁজে পাইনি। কানাডার আইনে সন্ত্রাসের বিস্তৃত যে সংজ্ঞা দেয়া আছে তার বিবেচনায়, বিএনপির হরতাল ডাকার উদ্দেশ্য এবং ইচ্ছা, হরতালে যে সন্ত্রাস এবং স্বাভাবিক জীবনের বিঘœ ঘটেছে এবং এই কাজের (হরতালের) ফলে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে বিএনপির সচেতনতা বিবেচনায় নিয়ে ইমিগ্রেশন ডিভিশন যুক্তিসঙ্গতভাবেই উপসংহারে পৌঁছেছেন যে বিএনপি হচ্ছে একটি সংগঠন যেটি সন্ত্রাসে লিপ্ত ছিল, আছে বা সন্ত্রাসে লিপ্ত হবে।
ইমিগ্রেশন ডিভিশন দীর্ঘ দালিলিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালত এ ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তারা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে তথ্য-উপাত্ত নিয়েছেন। এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনো মহলেই কোনো বিতর্ক হয়নি। ইমিগ্রেশন ডিভিশন উপসংহার টেনেছেন,’ তাদের (বিএনপির) কাজের (হরতালের) ফলে কি ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে সে ব্যাপারে বিএনপি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিল, সচেতনতা ছিল। তাদের এই পদেেপর ফলে চরম সন্ত্রাস, নির্বিচারে মানুষ হত্যা এবং ভয়াবহ ধরনের অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। ইমিগ্রেশন ডিভিশন তাদের পর্যালোচনায় জানায় যে, বিএনপি ওইসব সন্ত্রাসের নিন্দা করেনি এবং সেটি না করে তারা সন্ত্রাসকে গ্রহণ করে নিয়েছে। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, কানাডার আদালত থেকে সন্ত্রাসী দল হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়াটা বিএনপির অতীত অপরাধেরই ফসল।
এটা কেউ অস্বীকার করবে না যে, অতীতের অপরাধ বাংলাদেশের অন্যতম একটি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে সারাণ যেন তাড়া করে ফিরছে। দলটি কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না। জানুয়ারি মাসের পর আবার মে মাসে কানাডার ফেডারেল আদালত দলটিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে অভিহিত করেছে। বিএনপির সদস্য হওয়ার কারণে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নাকচ করে দেয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জুডিশিয়াল রিভিউয়ের আবেদন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সিদ্ধান্তকে বহাল রেখে কানাডার ফেডারেল আদালতের বিচারক এই মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত মোহাম্মাদ জুয়েল হোসেন গাজী নামে ঢাকার মিরপুরের এক ব্যক্তি বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীর পরিচয় দিয়ে কানাডা সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। তার স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাসের আবেদন ২০১৫ সালে প্রাথমিক অনুমোদন পেলেও গত বছরের ১৬ মে তাকে কানাডায় প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা করেন দেশটির ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কানাডার ফেডারেল আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার আবেদন গত ২৫ জানুয়ারি খারিজ করে রায় দেন বিচারক হেনরি এস ব্রাউন। অভিবাসন কর্মকর্তা তার সিদ্ধান্তে বলেছিলেন, আবেদনকারী জুয়েল হোসেন গাজী এমন একটি সংগঠনের সদস্য, যে দল সন্ত্রাসে যুক্ত বলে মনে করার যৌক্তিক কারণ আছে।
সুতরাং কানাডার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি প্রোটেকশন অ্যাক্ট (আইআরপিএ)-র ৩৪ (১)-এর এফওসি ধারা অনুযায়ী তিনি সুরা পাওয়ার জন্য কানাডায় বসবাসের স্থায়ী অনুমতি পাওয়ার যোগ্য নন। কানাডার আইনের ওই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, যে সংগঠন সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ছিল, আছে বা ভবিষ্যতে থাকতে পারে বলে বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ আছে, তাহলে তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে কানাডায় প্রবেশের অনুমতি পাবেন না। সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার আবেদনে জুয়েল গাজী দাবি করেছিলেন, বিএনপি সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না এবং দলের গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করায় কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ারও নজির রয়েছে। কিন্তু কানাডার ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার তুলে ধরা লাগাতার হরতাল ও সহিংসতার বিবরণ তুলে ধরে রায়ে বলা হয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে আবেদনকারীর যুক্তি ‘হারিয়ে যায়’।
বিচারক সরকার পরে আইনজীবীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সরকার প সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য দিয়েছেন যে, বিএনপি নেতৃত্ব একবারই সন্ত্রাসের নিন্দা করেছেন যখন বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানোর দায়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিএনপি তার কর্মীদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের নিন্দা করেছে তার কোনো প্রমাণ এই আদালতের সামনে নেই।
কানাডার আদালত যে রায় দিয়েছে তা যথারীতি সরকারের সাজানো নাটকের অংশ বলে দাবি করে বিএনপি বলছে, নির্বাচনের আগে জনগণের মাঝে ধোঁয়াশা সৃষ্টির জন্য সরকার এ ধরনের পরিকল্পিত ঘটনা তৈরি করেছে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেন, এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও সাজানো। মতাসীনদের দ্বারা পরিচালিত মিডিয়াগুলোতে এটি প্রচারের ধুম পড়ে গেছে।
প্রশ্ন হলো রায়টি কি আসলেই বানানো, সরকারি দলের লোকজন দ্বারা প্রভাবিত? এই রায়ের পুরো বিবরণ কিন্তু কানাডার ফেডারেল কোর্টের ওয়েবসাইটে আছে। আর কানাডার আদালত কি এ দেশের গ্রাম্য সালিশ যে, ইচ্ছে করলেই রায় প্রভাবিত করা যায়? বিএনপির গত কয়েক বছরের কর্মকা-, বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে যারা সন্ত্রাস সংঘটনে ইন্ধন দিয়েছে, সক্রিয়ভাবে নাশকতায় জড়িত থেকেছে এবং সহিংসতাকে রাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত করেছে তারা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কানাডার আদালতের তকমাকে খ-াবে কিভাবে?
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে হঠানোর জন্য ৯২ দিন ধরে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান এবং ৮৯ দিন ধরে চলা নেতিবাচক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। এ কর্মসূচি সফল করার ল্েয বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডাররা পেট্রোল বোমাসহ বিভিন্নভাবে নাশকতা চালিয়ে প্রায় দেড়শ মানুষ হত্যা করেছে। শুধু পেট্রোল বোমার আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে ৭০ জন। পেট্রোল বোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রায় ১ হাজার নিরীহ মানুষ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন। এ কর্মসূচি চলাকালে সহস্রাধিক যানবাহন আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় কয়েক হাজার যানবাহন। আন্দোলনের নামে চলন্ত যানবাহনে পেট্রোল বোমা নিপে, রেলে আগুন দেয়া, রেললাইন উপড়ে ফেলাÑযেসব নাশকতামূলক কর্মকা- বিএনপি চালিয়েছে তাতে সাধারণ মানুষই বেশি তিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব কারণে সাধারণ মানুষ বিএনপি-জামায়াতের প্রতি ুব্ধ হয়েছে।
বিএনপি-জামায়াতের এসব সন্ত্রাসের কাহিনি সব আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেই ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। কাজেই কানাডার ফেডারেল আদালতে উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তকে মিথ্যা বলার কোনো সুযোগ নেই বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
বিদেশি একটি আদালত যখন সরাসরি বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, তখনও দলের নেতারা আত্মবিশ্লেষণ না করে মিথ্যা সাফাই গাইছেন। তারা বিদেশি আদালতকেই ভুয়া বানানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু মিথ্যা বললেই কি আর সব কিছু মিথ্যা হয়ে যায়?
বিএনপির আচরণে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনেকে হতাশা প্রকাশ করছেন, বিব্রত হচ্ছেন; অনুতপ্তও হচ্ছেন কেউ কেউ। কানাডার ফেডারেল আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করার পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা থাকার পরও একটি দল যে যারপর নাই দুর্ভোগের সীমাহীন শিকারে পরিণত হতে পারে, তার প্রমাণ বিএনপি নামের একটি দল। স্বাধীনতাবিরোধী একটি দলের সাথে জোট বাঁধার কারণে দলটি আজ শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে। সন্ত্রাসী দল না হয়েও শুধু অপপ্রচারের কাছে পরাস্ত হয়ে কানাডার মতো একটি দেশের ফেডারেল আদালতের চোখে সন্ত্রাসী দল হিসেবে পরিগণিত হওয়া কিছুতেই চাট্টিখানি কথা নয়।
ছাত্রদলের সাবেক ওই নেতার মতে, কোনো অপপ্রচারেই এমন বড় একটি অপবাদ বিএনপির মতো দলটিকে নিতে হতো না, যদি তারা স্বাধীনতাবিরোধী ওই দলটির সাথে কোনো প্রকারের রাজনৈতিক জোট না বাঁধতো।
ছাত্রদলের ওই নেতার বক্তব্যের সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির গাঁটছড়া বাঁধা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে পরিচালিত সহিংস আন্দোলন বিএনপির রাজনীতিকে সীমাহীন প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গত প্রায় এক দশক ধরে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে শুধু জোটবদ্ধ রাজনীতি করছে না, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা নিয়ে জামায়াত যে অপরাধ করেছে, তার দায়ও বিএনপি তাদের কাঁধে নিচ্ছে। অথচ একাত্তরের কোনো দায় বহনের যৌক্তিক কারণ বিএনপির নেই। একাত্তরে বিএনপি নামের দলটির অস্তিত্বই ছিল না। তাছাড়া বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকারই তাকে বীর উত্তম উপাধি দিয়েছে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে এখন বিএনপি যে রাজনীতি করছে সেটা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পরে হলেও একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর বিএনপি এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত না জানিয়ে যেভাবে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে প্রকারান্তরে বিরোধিতা করেছে, সেটা বিএনপির রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানকে দেশের মানুষের সামনে দুর্বল করে তুলেছে। মানুষ মনে করছে, বিএনপি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তি বলে দাবি করলেও কার্যত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতের প অবলম্বন করে রাজনৈতিক অসততার পরিচয়ই দিয়েছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর জন্য জামায়াত বিভিন্ন সময়ে যে সহিংস কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল বিএনপি তারও বিরোধিতা করেনি। বরং জোটসঙ্গী হিসেবে জামায়াতের কর্মসূচির প্রতি বিএনপির এক ধরনের নৈতিক সমর্থন ছিল বলেই মানুষের কাছে মনে হয়েছে। বিএনপি কখনোই নিজেদের জামায়াতের থেকে আলাদা করতে চায়নি।
শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর জামায়াত এখন অনেকটাই বিধ্বস্ত একটা দলে পরিণত হয়েছে। এই ধসে যাওয়া জামায়াতের ওপর বিএনপির নির্ভরতা যে দলটিকে ক্রমেই দুর্বল করে ফেলছে এটা যদি এখনও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উপলব্ধিতে না আসে তাহলে বলতে হবে দলটির জন্য কোনো সুসংবাদ সহসাই অপো করছে না। বরং দুঃসংবাদ হিসেবে কানাডা বা অন্য কোনো দেশের আদালত থেকে এর চেয়ে ভয়ঙ্কর কোনো রায়ও বিএনপির জন্য আসতে পারে।