আন্তর্জাতিক

ম্যানচেস্টারে সন্ত্রাসী হামলা : আতঙ্কে ব্রিটেনজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা

নিজস্ব প্রতিবেদক : যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ সরকারের তরফ থেকে সন্ত্রাসী হামলার সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ ‘ক্রিটিক্যাল’ বা ‘সংকটপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদার করতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ব্রিটেনে আরো সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা রয়েছে। ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাম্বার রাড বলেছেন, সন্দেহজনক হামলাকারী ২২ বছর বয়সী সালমান আবেদি একা এ হামলা চালায়নি বলে মনে করা হচ্ছে। তার সঙ্গে আরো অনেকেই রয়েছে বলে ধারণা। এ কারণেই বাড়তি এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্যের পুলিশ, সরকারি বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত জয়েন্ট টেরোরিজম অ্যানালিসিস সেন্টার এ সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে মাত্র দুইবার যুক্তরাজ্যজুড়ে এই স্তরের নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিগোষ্ঠী দাবি করে, তাদের একজন সমর্থক এই হামলা চালিয়েছে।
পুলিশ সালমান আবেদির যে পরিচয় প্রকাশ করেছে তাতে জানা যায়, লিবীয় বংশোদ্ভূত এই মুসলিম তরুণ ম্যানচেস্টার শহরেই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে। হামলার মাত্র কয়েক দিন আগেই বিদেশ থেকে দেশে ফেরে সে। বহু বছর ব্রিটেনে বসবাসের পর তার পরিবার লিবিয়ায় ফিরে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের খবর মতে, সালমান এক সময় ম্যানচেস্টারের সলফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ছিল। তবে পড়াশোনা চালু রাখেনি সে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাম্বার রাড জানান, হামলা চালানোর আগে সালমান আবেদি গোয়েন্দা রাডারে ধরা পড়েছিল। পুলিশ ২৪ মে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আগের দিন ২৩ মে সালমান আবেদির ২৩ বছর বয়সী এক ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সালমান আবেদি ‘সম্ভবত’ সিরিয়ায়ও গিয়েছিল। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরার্ড কলোম্ব বিএফএম টিভিকে বলেন, ‘সালমান আবেদি ব্রিটেনে বড় হয়েছে। লিবিয়া এবং সম্ভবত সিরিয়া থেকে ফিরে এসে হঠাৎ করেই সে মৌলবাদী হয়ে উঠেছে এবং এই হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, আইএসের সঙ্গে যে আবেদির যোগাযোগ রয়েছে সেটা প্রমাণিত।
গত ২২ মে রাতে ম্যানচেস্টার শহরে মার্কিন পপ তারকা আরিয়ানা গ্রান্দের একটি কনসার্ট শেষে চালানো ওই আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২২ জন নিহত ও ৬৪ জন আহত হয়। সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানায়, ম্যানচেস্টারে হামলার পর যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী হামলার সতর্কতা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসী হামলার হুমকির এই মাত্রাকে বলা হয় ‘ক্রিটিক্যাল’ বা ‘সংকটপূর্ণ’। এর অর্থ হলো, যেকোনো সময় আবারও হামলা হতে পারে। নিরাপত্তার েেত্র সশস্ত্র পুলিশকে সহযোগিতা করতে ‘অপারেশন টেম্পেরার’ নামে সেনাবাহিনীর ইউনিট নামানো হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। এএফপির একজন আলোকচিত্রী জানান, সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট ইতোমধ্যে পাহারার দায়িত্ব পালন করতে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে জানিয়েছেন, জনসাধারণের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগম স্থানগুলোতে আর্মড পুলিশকে সহায়তা করতে সেনা মোতায়েন করা হবে। কনসার্টের মতো ব্যাপক জনসমাগম হয় এমন অনুষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তাতেও সামরিক বাহিনীকে দেখা যেতে পারে। তারা পুলিশ কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানেই দায়িত্ব পালন করবে বলে জানান টেরেসা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যুক্তরাজ্যে ৫ হাজার সেনা মোতায়েনের খবর দেয়া হলেও বিবিসির নিরাপত্তা প্রতিবেদক ফ্রাংক গার্ডনার বলেছেন, এই সংখ্যা হবে কয়েক শ’।
ম্যানচেস্টারে হামলার পরেই ব্রিটেনের গোয়েন্দারা জানতে পারেন, পুরো যুক্তরাজ্যে এখন ৩ হাজারেরও বেশি জঙ্গি আস্তানা গেড়েছে। তারা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের বেশির ভাগই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত। এদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ মিশনে সক্রিয়। তারা যে কোনো স্থানে যেকোনো মুহূর্তে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য তৈরি রয়েছে। জানা গেছে, তাদের শনাক্ত করতে এবং নজরদারিতে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ বাহিনী। ২২ মে ম্যানচেস্টার হামলার পর এই হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬। শুধু ম্যানচেস্টার সিটিতেই কয়েক ডজন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন শহরটির সহকারী পুলিশ প্রধান গ্যারি শেবান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের গোয়েন্দা পুলিশি সংস্থা ইউরোপোল বলেছে, দেশে ফেরা জঙ্গিরা যেকোনো সময় তীব্র সহিংসতা ঘটাতে পারে। এসব উগ্রপন্থির মধ্যে বেশির ভাগ নারী ও পুরুষের বয়স ২০-এর কোটায়। তাদের মধ্যে একজন জঙ্গিকে পুরোপুরি নজরে রাখতে ৩০ জন পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। বলা হয়েছে, ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের হয়ে লড়াই করার জন্য ব্রিটেনের সাড়ে ৮০০ নাগরিক ইরাক ও সিরিয়ায় গেছে। সেখান থেকে এবার তারা দেশে ফিরতে শুরু করেছে। অবশ্য ইরাক ও সিরিয়ায় শ’খানেকের বেশি ব্রিটিশ জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে আতঙ্কের ব্যাপার হলো যারা জীবিত ফিরে এসেছে, তাদের রয়েছে যুদ্ধেেত্র লড়াই করার বাস্তব ও প্রশিতি অভিজ্ঞতা। তারা জানে কিভাবে বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। ফলে তারা স্থানীয় উদীয়মান জঙ্গিদের নিয়ে দেশটিতে ভয়ঙ্কর সব হামলা চালানোর ছক কাটছে।
যুক্তরাজ্য জঙ্গিদের কতটা হুমকির মুখে রয়েছে সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কমিশনার মার্ক রাউলির কথায়। রাউলি বলেছেন, গত চার বছরে ব্রিটিশ নিরাপত্তা বিভাগগুলো কমপে ১৩টি পূর্বপরিকল্পিত হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় তাদের ওপর নজরদারি করা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা বিভিন্ন পরিবহন ও শপিং সেন্টারকে বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে একা একা ছুরি বা গাড়ি ব্যবহার করে হামলাকে উদ্বুদ্ধ করছে। আরো শিহরণ জাগানো ব্যাপার হচ্ছে, সিরিয়ায় আইএসের পে যুদ্ধ করে আসা সন্ত্রাসীরা তাদের স্ত্রী ও সন্তানকে ব্রিটেনে বড় ধরনের হামলা চালানোর জন্য ব্রেনওয়াশ করেছে। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ব্রিটেনে সন্ত্রাস সম্পর্কিত ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৮০ জনকে। আগের ১২ মাসে এ সংখ্যা ছিল ৩০৭। অর্থাৎ এ েেত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫ শতাংশ। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতে, গত ৩ বছরে সন্ত্রাস বিষয়ক অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে ৩৮৬ জন। এতে যুক্তরাজ্যের চিন্তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। সিরিয়া বা ইরাক থেকে এসে নয়, তার দেশের নাগরিকরাই এবার নিজ দেশের ওপর হামলে পড়েছে। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে সচেতন না হলে এই প্রবণতা আরো বাড়বে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।