রাজনীতি

যে কারণে বিএনপি-জামায়াতের দূরত্ব বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক : ২৮ বছর পর সম্পর্কে বেশ টানাপড়েন শুরু হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। ১৯৯০ সালে বিএনপি-জামায়াত একজোট হয়। ২০১৭ সালে এসে দেখা যাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াত পরস্পর দুই মেরুর বাসিন্দা! দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ছাড়াও আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে যে মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে তাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম শরিক এ দলটিকে সঙ্গে রাখার পে এখন খুব বেশি যুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না জোটের ভেতরে-বাইরের অনেকেই। যে কারণে ইদানীং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিএনপি জামায়াতকে এড়িয়ে চলছে। তবে বিএনপির একটি পক্ষ প্রকাশ্যেই বলছে, বিএনপি যতই জামায়াতকে এড়িয়ে চলুক না কেন, জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেয়া প্রশ্নে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অবধারিতভাবে বিএনপি প্রার্থীকে ভোট দেয়া বেশি শ্রেয় মনে করবে। কারণ বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের হাতেই তারা বেশি মার খেয়েছে। এ সরকারের অধীনেই তাদের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হয়েছে এবং অনেক হামলা-মামলা ও অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা। সেক্ষেত্রে বিএনপি মনে করে, জামায়াতের যেসব নেতাকর্মী এখন আত্মগোপন করে আছে বা পোশাক পাল্টিয়ে ও দাড়ি কেটে জনারণ্যে মিশে আছে, তাদের তো আর ভোটাধিকার বাতিল হয়নি। তাদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার বাতিল হয়েছে। তাই নির্বাচনের দিন তারা শার্ট-প্যান্ট-কোট-টাই পরে, ফুলবাবু সেজে ভোটকেন্দ্রে যাবে এবং চুপটি করে বিএনপি প্রার্থীকে ভোটটি দিয়ে আসবে।
ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে যা-ই ঘটুক, দৃশ্যত বিএনপি কিন্তু এখন বেশ এড়িয়ে চলছে জামায়াতকে। এতে দল দুটির মধ্যে দিন দিন দূরত্ব বাড়ছে। দেশের প্রগতিশীল দলগুলোকে কাছে টানার উদ্যোগও জামায়াতকে এড়িয়ে চলার একটি কারণ বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে মনে করছেন, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য বিএনপি এই এড়িয়ে চলা নাটক করছে। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বাড়ার েেত্র আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন আদায়কে প্রভাবক হিসেবে দেখছেন অনেক রাজনীতিক বিশ্লেষক। তবে কৌশলগত কারণে জামায়াত খুব শক্তভাবে সঙ্গে আছে এ কথাও যেমন বলতে রাজি নয় বিএনপি; তেমনি আবার তাদের বের করে দিলাম এ কথাও জোর দিয়ে বলতে চাইছে না দলটি। বিএনপির একেবারে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে জামায়াতের বর্তমান শীর্ষ নেতাদের গোপন যোগাযোগ যে আছে এটা অবশ্য বেশ ভালোভাবেই মনে করেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। বিএনপির সিনিয়র কয়েকজন নেতার কথা হলো, জামায়াত বিএনপির সঙ্গে আছে কি নেই; এ ব্যাপারে তারা কিছুই বলবে না। কারণ জামায়াতের এখন নিবন্ধনই নেই। ফলে নির্বাচনে দর-কষাকষির কোনো মতাও দলটির নেই বলে তারা মনে করেন। তবে বিএনপির ভেতরকার এই পরিবর্তন বা অবস্থানের কথা জামায়াত যে বোঝে না, এমন নয়। বোঝে বলেই জামায়াতও এখন বিএনপির সঙ্গে গাঁটছড়া দেখাতে রাজি নয়। জামায়াত নেতাদের উপলব্ধি, বিএনপিতে এখন আর তাদের আগের সেই মর্যাদা ও গুরুত্ব নেই। যে কারণে জামায়াত জোটের কোনো কর্মসূচিতেই সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখছে না। সর্বশেষ গত ১০ মে খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ রূপকল্প উপস্থাপন অনুষ্ঠানে জামায়াতের কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হলে ঠিক এর ৪ দিন পরে এক অনুষ্ঠানে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ প্রশ্নে তাঁর দলের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, জামায়াতকে নিয়ে তাদের যে ২০ দলীয় জোট তা ‘আন্দোলনকেন্দ্রিক’ এবং এর সঙ্গে সরকার পরিচালনার কোনো সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন এবং সরকার গঠনের যে ঐকমত্য ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর চারদলীয় জোট গঠনের সময় হয়েছিল সে অবস্থানে বিএনপি এখন আর নেইÑএমন বার্তাই দেন তিনি। রাজনৈতিক পর্যবেক মহলের মতে, ফখরুল এও জানিয়ে দেন যে, জামায়াতকে নিয়ে তাঁর দল এখন অত বেশি চিন্তিতও নয়।
তবে জামায়াত নেতারা মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে টানাপড়েন হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিএনপি আলাদা ভিশন নিয়ে রাজনীতি করে, জামায়াত রাজনীতি করে জামায়াতের ভিশন নিয়ে। কোনো কোনো জামায়াত নেতা মনে করেন, নির্বাচনের সময় বিএনপি জামায়াতকে মোটেও ছাড় দিতে চায় না। তারপরও বিএনপির সঙ্গে জোট টিকে আছে সরকারি দলের বাড়াবাড়ির কারণে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে কেন্দ্র করে দেশি ও আন্তর্জাতিক েেত্র যে মেরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তাতে জামায়াতের কোনো স্থান নেই। সামনের দিনগুলোতে ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচিতে দলটির কার্যকর অংশগ্রহণ আরো কমে যাবে। দলটি মূলত আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। এটা শাসক দলের জন্য স্বস্তির হলেও, একইভাবে ভয়েরও। জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া জামায়াতের এসব নেতাকর্মী ভোটের সময় ঠিকই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসবে এবং যে প্রার্থীকে ভোট দিলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হেরে যাবে, সে প্রার্থীকেই ভোট দেবে, এবার সে প্রার্থী যদি কমিউনিস্ট পার্টিরও হয়, তাহলেও অসুবিধা নেই।
জামায়াতের কিছু নেতা মনে করেন, বিএনপিতে এখন আর তাদের গুরুত্ব নেই। ফলে বিএনপির সঙ্গে আর থেকেও লাভ নেই। তার চেয়ে ভিন্ন নামে দল গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন এই পর্যায়ের নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নানা বাস্তবতায় বিএনপি-জামায়াতের মধুর সম্পর্ক এখন আর নেই। এর প্রধান কারণ হতে পারে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। তবে জামায়াত দলগতভাবে ইচ্ছা করে জোট ভাঙবে বলে মনে হয় না। তারা জোটে থাকবে কিন্তু ঝুঁকি নেবে না। বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামো এবং দেশীয় রাজনীতি দুদিক থেকেই জামায়াত কোণঠাসা হয়ে পড়ায় দলটির এক ধরনের গুরুত্ব কমেছে। পাশাপাশি নিবন্ধন না থাকায় দলটি আরো বেকায়দায় পড়ে গেছে। ফলে বিএনপি এখন এক সময়ের প্রধান মিত্র দলটিকে নিয়ে বেশি মাতামাতি করতে রাজি নয়। তাছাড়া পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল দলগুলোকে নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণের যে চেষ্টা বিএনপির মধ্যে ল্য করা যাচ্ছে, সেটিও ওই দলটিকে সঙ্গে রাখার জন্য সহায়ক নয়। ফলে জামায়াতকে সঙ্গত কারণেই বিএনপি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। তাছাড়া নিবন্ধন না থাকলে দলটির ভোট এমনতিই জাতীয়তাবাদী দলটি পাবে বলে মনে করছে বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীই।
বিএনপির জামায়াতঘেঁষা নেতারা মনে করেন, কার্যকর অংশগ্রহণ কমে গেলেও জামায়াত এখনো ২০ দলীয় জোটে আছে। তবে নির্বাচনের আগে বা ভবিষ্যতে কী হবে সেটি উদ্ভূত পরিস্থিতিই বলে দেবে। বিএনপির জামায়াতঘেঁষা নেতারা এটা খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ভোটের রাজনীতিতে ৫-৬ শতাংশ ভোটের অধিকারী জামায়াতকে নিয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির আগ্রহ নেইÑএ কথা বলা যাবে না।
২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট আত্মপ্রকাশ করলেও ওই সময়ের ঘোষণাপত্রে দলগুলোর মধ্যে আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো বিষয় ছিল না। তবে বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনের পর ২০০১ সালের নির্বাচনে জামায়াতকে ৩১টি আসনে এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩৬টি আসনে ছাড় দেয়া হয়। কিন্তু ২০১৩ সালের ১ আগস্ট উচ্চ আদালতের এক রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। শুধু তা-ই নয়; সুপ্রিমকোর্ট গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা বরাদ্দ না দিতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয়। ওই রায়ের পর গত ১৬ ফেব্র“য়ারি সংসদ নির্বাচনের প্রতীকের তালিকা থেকে দাঁড়িপাল্লা বাদ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে ইসি। ফলে নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যায় জামায়াত ও তাদের পরিচিত ও প্রিয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা।
বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন, ইসি পুনরায় জামায়াতকে নিবন্ধন না দিলে দলটির সমর্থকরা বিএনপিকেই ভোট দেবে। আর নিবন্ধন না থাকলে আসন ভাগাভাগির ব্যাপারে তাদের দর-কষাকষির মতাও থাকবে না। সে েেত্র কিছু আসনে জামায়াত স্বতন্ত্র প্রার্থী দিলে গুরুত্ব অনুযায়ী সেগুলোতে তাদের ছাড় দেয়ার চিন্তা আছে বিএনপির। কিন্তু জামায়াতকে নিয়ে আর কোনো শোডাউন করতে বিএনপি রাজি নয়। তবে এসব চিন্তা আপাতত বাদ দিয়ে প্রধান প্রতিবেশী ভারতসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে খুশি করে চলার পে বিএনপি। ভিশন ২০৩০-এ প্রধানমন্ত্রীর মতায় ভারসাম্য আনা, প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে নতুন ধারার রাজনীতি প্রবর্তন; সর্বোপরি পররাষ্ট্রনীতিতে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তপে না করা এবং অন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় সমস্যা সৃষ্টি না করার অঙ্গীকারÑবিএনপি এসব দিকে ল্য রেখেই করেছে বলে অনেকে মনে করেন।
অন্যদিকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণার পাশাপাশি দেশের প্রগতিশীল দলগুলোকেও কাছে টানার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। কিন্তু বিকল্প ধারা, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগসহ প্রগতিশীল দলগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধার ওই উদ্যোগের সঙ্গে জামায়াতের জোটে থাকার বিষয়টি সাংঘর্ষিক। ফলে জামায়াতকে দূরে রাখার কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি। তবে বিএনপির এ উদ্যোগও সফল না হওয়ার পেছনে তলে তলে দলটির জামায়াতপ্রীতিকেই দায়ী করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।