কলাম

রাজনীতির ভ্রষ্ট মনস্তত্ত্ব থেকে জঙ্গিবাদী মতাদর্শের উন্মেষ

মেজর জেনারেল মো. আব্দুর রশীদ (অব.) : গত বছরের ৩১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ হামলার পর বাংলাদেশের জঙ্গিবাদে নতুন মাত্রার অস্তিত্ব নজরে আসে। নিরাপত্তার শঙ্কা বাড়তে থাকে। পুলিশের অভিযানের তীব্রতাও সমানতালে বাড়তে থাকে। নতুন আঙ্গিক ও কৌশল নিয়ে মাঠে নামা জঙ্গি সংগঠনটি নব্য জেএমবি নামে পরিচিতি পায়। যদিও অনেক দেশি-বিদেশি জঙ্গিবিশারদ নব্য জেএমবির মধ্যে ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের প্রেতাত্মাকে দেখতে পেয়েছেন। গত ১৫টি সার্থক পুলিশি অভিযানে নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতাসহ অর্ধশতাধিক জঙ্গি মারা পড়লে সংগঠনটির শক্তি মারাত্মকভাবে খর্ব হয় এবং অস্তিত্ব সংকট সৃষ্টি হয়। পরবর্তী পর্যায়ের নেতারা সংগঠনের হাল ধরার চেষ্টা করে। ঢাকা ও আশপাশের জনাকীর্ণ এলাকায় আস্তানা গেড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থেকে জঙ্গি তৎপরতা চালানোর কৌশল গ্রহণ করলেও তা টিকে থাকতে পারেনি পুলিশি অভিযানের কারণে। কৌশল পরিবর্তন করে ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে আস্তানা গেড়ে পুনরায় সংগঠিত হবার প্রাণান্তকর চেষ্টায় লিপ্ত হয়। পুলিশের জঙ্গি নিধন অভিযানের সার্থকতা জনমনে কিছুটা স্বস্তি দিলেও জঙ্গি মতাদর্শের উৎপাটন নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েই গেছে। জঙ্গি মতাদর্শে দীতি হয়ে সন্তানদের হিজরতের নামে ঘরছাড়া করার কৌশল জিইয়ে থাকলে পিতা-মাতা নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না।

সীতাকু-, সিলেট, মৌলভীবাজার, ঝিনাইদহ, রাজশাহীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের আস্তানাগুলোর ক্রমাগত উন্মোচন এবং পুলিশি অভিযানের মুখে জঙ্গিদের আত্মহননের ঘটনা মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকার জঙ্গি কৌশল লোকালয়ে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস কমিয়ে দিচ্ছে এবং আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে। জঙ্গিদের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা তীব্র হলেও অনাকাক্সিত বিপদের গন্ধে সমাজ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। তথাপি জঙ্গিবিরোধী মানসিকতা আগের চেয়ে অনেক বেশি গতি পেয়েছে। বুকে অনেক কষ্ট থাকলেও নিহত জঙ্গিদের লাশের বোঝা বইতে পরিবারের সদস্যদের অস্বীকৃতিই প্রকাশ করে জঙ্গিবাদের প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা। জামায়াত-উল মুজাহেদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি অংশ নতুন আঙ্গিকে নিজেদের সাজিয়ে আবির্ভূত হয়েছে নব্য জেএমবি নামে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলা করে দেশবাসীকে যেমন চমকে দিয়েছিল, তেমনি নব্য জেএমবি হলি আর্টিজানে বিদেশিদের ল্যবস্তু বানিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়। বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। ইরাক ও সিরিয়ার ব্যাপক অঞ্চলে ইসলামিক স্টেট নামের নতুন খিলাফত সৃষ্টির পর বিশ্বে জঙ্গি ধারায় পরিবর্তনের ধাক্কা লাগে। নব্য জেএমবি’র নতুন কৌশল সেই ধারাকে অনুরণিত করছে বলে অনেকেই সোজা-সাপ্টাভাবে ধারণা করেন। প্রকৃতপে নিরীহ মানুষ হত্যাকে ঘিরে চলা জঙ্গিত্ব কাক্সিত রাজনৈতিক ফল আনতে সম হবে না জেনেও জঙ্গি মতাদর্শে অনুরক্ত হয়ে ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা করে সহিংসতার পথে চলার পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করছে ভ্রান্ত রাজনীতি।
কট্টর ও বিশুদ্ধ ইসলামের আবরণে জিহাদের বাধ্যবাধকতাকে উপজীব্য করে ইসলামি জঙ্গিবাদের পথ চলা শুরু হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত উপস্থিতিকে অমুসলিমদের দখলদারিত্ব বানিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে ঈমানি দায়িত্ব বলে বিশ্বের মুসলিমদের জিহাদে অংশগ্রহণের ডাক দেয়া হয়। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা তালেবানি শক্তির উত্থান ঘটিয়ে ইসলামি পাকিস্তানকে সুসংহত করতে চেয়েছে। ধর্মকে রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র বানিয়ে মতা পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করে। মানুষের অধিকার বঞ্চনার অনুভূতিকে ভোঁতা করে পারলৌকিক প্রাপ্তি ও খোদাভীতিকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। বহু জাতিসত্তার পাকিস্তানে নৃতাত্ত্বিক পরিচিতিকে মুছে দিয়ে ধর্মীয় পরিচিতির একক ধারা তৈরি করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা পাকিস্তানের সংহতিকে ভঙ্গুর করে ফেলেছিল।
ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করার প্রাক্কালে ধর্মীয় বিভাজনকে ধারালো করে মুসলমান ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য দুটো আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয় যার আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় দ্বিজাতি তত্ত্ব। ধর্মকে মাথায় নিয়ে অধিকার প্রত্যাশী মানুষকে দমিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে ধর্ম দিয়ে বর্ম তৈরি করে পাঞ্জাবি শাসকরা মতাকে স্থায়ী রূপ দিতে থাকে। সৌদি আরবের সুন্নি ইসলামের ওয়াহাবি উগ্রবাদ দিয়ে পাক-ভারতের সহিষ্ণু ইসলামের ধারক ও প্রচারক হিসেবে সুফি ইসলামকে গলা টিপে হত্যা করতে চেয়েছিল তারা। শিয়া ও আহলে জামায়াতসহ সংখ্যালঘুদের খতম করা মৌলবাদী রাজনীতির অস্ত্র হয়ে যায়, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা সাইয়িদ আবুল আলা মউদুদী সৌদি আরবের ওহাবি ইসলামের প্রতিভূ হিসেবে হিংসার ধারাকে পাকিস্তানে ধারণ করে।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র দ্বিজাতিতত্ত্বকে কবর দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তা ও অধিকার-বঞ্চিত মানুষের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়। ধর্মীয় আফিম দিয়ে জনগণকে নেশাগ্রস্ত রেখে মতার রাজনীতির পাশাখেলা শুরু হয়। বাংলাদেশে মতার পট পরিবর্তন করে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের চেতনাকে ধর্মের আবেশ দিয়ে ঘুম পাড়াতে হবে। নতুন রাষ্ট্রের দুর্বলতাকে পুঁজি করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে হিংসার রাজনীতির সূচনা হয়। মৌলবাদী রাজনীতি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং মৌলবাদী রাজনীতি সহিংস জঙ্গিবাদে রূপ লাভ করে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পেছনে তেলসমৃদ্ধ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে সাদ্দাম হোসেন ও কর্নেল গাদ্দাফিকে উৎখাতের পশ্চিমা কৌশল সার্থকতার মুখ দেখলে সিরিয়ার বাশার আল আসাদকে উচ্ছেদ করার ল্েয নিরস্ত্র মানুষের গণ-আন্দোলনকে অস্ত্র সরবরাহ করে যুদ্ধে নামানো হয়। সিরিয়া ত-বিত হয়ে মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের জন্ম দেয়। ৩ লাখ মানুষ মারা পড়েছে। সিরিয়ার অর্ধেকের বেশি মানুষকে শরণার্থী বা বাস্তুহারা বানিয়েছে। মতার পটপরিবর্তনে জঙ্গিবাদের নগ্ন ব্যবহার পৃথিবীকে অশান্ত করে তুলেছে। জঙ্গিবাদের আদর্শের ভিত্তি ইসলাম হলেও বিকৃত ও খ-িতভাবে তৈরি ব্যাখ্যা প্রকৃতপে কৃত্রিম এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল অপ-রাজনীতি এবং বিত্তবান রাষ্ট্র ও সংগঠনের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অস্ত্র সব সময় তাক করেছে বাঙালিত্বকে, হামলা করেছে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনীতি কেন্দ্রীভূত ছিল ইসলামকে উপজীব্য করে পাকিস্তানি ধারার রাজনীতির অনুসরণ। যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মীয় রাজনীতির পুনর্বাসন, পাকিস্তানি স্বার্থে ভারতের সাথে সুসম্পর্ক থেকে দূরে থাকা। জয় বাংলার বিপরীতে বাংলাদেশ জিন্দাবাদের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক আত্মপরিচয়ের মনস্তত্ত্ব তৈরি। ইসলামি রাজনীতির পুনর্বাসনের হুমকি মোকাবিলার জন্য সহিংস বিকল্প শক্তির একটি অবয়ব হচ্ছে জঙ্গিবাদ। ইসলামের নামে মৌলবাদকে টিকিয়ে রাখতে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে এবং ভারত মহাসাগরীয় ভূ-রাজনীতির স্বার্থ উদ্ধারে বাংলাদেশে শাসক পাল্টানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার রাজনৈতিক ল্য জঙ্গিবাদের মধ্যে স্বচ্ছভাবে ফুটে উঠেছে। সিঙ্গাপুরে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিরা সংগঠিত হচ্ছিল বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের এজেন্ডা নিয়ে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত অবস্থানের কারণে বিদেশি সামরিক উপস্থিতির পথ খুলতে জঙ্গিবাদী অস্থিতিশীলতা একটি বড় অজুহাত হবে যদি আল-কায়েদা বা ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব তৈরি হয়।
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী মতাদর্শের হিংসাত্মক পথ ধরার আবেদন খুব বেশি সাড়া না পেয়ে সমাজকে ধর্মান্ধ করার প্রক্রিয়া নিয়ে মাঠে সক্রিয় মৌলবাদী ও তাদের দোসররা। কামাল পাশার অসাম্প্রদায়িক তুরস্কের রূপান্তরিত হবার কৌশল বুকে লালন করে তারা সে পথে হাঁটছে কৌশলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বাংলাদেশকে দূরে টেনে আনতে পছন্দের শাসককে মতায়িত করতে জঙ্গিবাদী অশুভ শক্তি একটি কার্যকর হাতিয়ার। ধর্মান্ধ ও কট্টর সমাজ জঙ্গিবাদ বিস্তারের নিরাপদ ত্রে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের স্থায়ী জায়গা পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি দ্বিজাতি তত্ত্বের পুনরুজ্জীবন ঘটাবে।
বাংলাদেশের জঙ্গিবাদী আবাদের েেত্র অভ্যন্তরীণ উপাদানের অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা বেশি হয়েছে। ধান ভানতে শিবের গীত গেয়েছেন অনেকেই। গণতন্ত্রের ঘাটতি, সুশাসনের অভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বঞ্চনা ইত্যাদি জঙ্গিবাদের পারিপার্শ্বিক অনুঘটক হলেও মূল চালিকাশক্তি নয়। তালেবানি ধারায় ধর্মীয় রাজনীতির বিরুদ্ধবাদীদের শায়েস্তা করার কৌশল হিসেবে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হয়েছিল। ধর্মকে মুখোমুখি করে হাজার বছরের সহিষ্ণু ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতিকে রূপান্তরিত করার পুরনো পাকিস্তানি কৌশল দৃশ্যমান। বাঙালি জাতিসত্তার বিনাশ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল্যবোধকে বিলীন করে দ্বিজাতি তত্ত্বকে কবর থেকে উঠিয়ে আনার কৌশল নিয়েই জঙ্গিবাদের জন্ম ও বিচরণ। মৌলবাদের মধ্যে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব। জঙ্গিবাদের সঙ্গে মৌলবাদী রাজনীতির গোপন অভিসার বন্ধ না হলে জঙ্গিবাদের বিনাশ দুঃসাধ্য।
লেখক : স্ট্রাটেজি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
ইনস্টিটিউট অব কনফিক্ট
ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিস
(আই কাডস) এর নির্বাহী পরিচালক