প্রতিবেদন

আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস-২০১৭ উদযাপন : নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে শান্তিরক্ষীদের কাজ করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

নিজস্ব প্রতিবেদক : যথাযোগ্য মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ২৯ মে পালিত হলো আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হয়। জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বিশ্বের সব দেশের শান্তিরীদের অসামান্য অবদানকে এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরী দিবস উদযাপনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়। এরই অংশ হিসেবে ২৯ মে সকালে পিসকিপার্স রান-এর মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। পিসকিপার্স রান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ শান্তিরীদের নিকটাত্মীয় এবং আহত শান্তিরীদের সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ উপস্থাপনার আয়োজন করা হয়। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরার ল্েয বিশেষ জার্নাল ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি চ্যানেলে বিশেষ টকশো প্রচারিত হয়। এছাড়াও শান্তিরায় বাংলাদেশের কার্যক্রমের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ অন্যান্য বেসরকারি চ্যানেলে প্রচারিত হয়।
ইউক্রেনের শান্তিরী সংস্থা এবং ইউক্রেন সরকারের যৌথ প্রস্তাবনায় ২০০২ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী এ দিবসের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। বলা হয়, প্রতি বছর ২৯ মে তারিখে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরী দিবস পালন করা হবে। ২০০৩ সালের ২৯ মে তারিখে প্রথম আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরী দিবস উদযাপন করা হয়। ১৯৪৮ সালে সংঘটিত আরব-ইসরাইল যুদ্ধকালীন যুদ্ধবিরতি পর্যবেণে যে জাতিসংঘ ট্রুস সুপারভিশন অর্গানাইজেশন (আন্টসো) গঠিত হয়, সেটিই হচ্ছে প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরী বাহিনী। ১৯৪৮ সালের ২৯ মে তারিখে জাতিসংঘ শান্তিরী বাহিনীর প্রথম দলটি মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন হয়। আর এ জন্যই এই তারিখে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরী দিবস।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘ শান্তিরী মিশনে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরী প্রেরণকারী দেশ বাংলাদেশ। ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বাংলাদেশি শান্তিরী সদস্যরা সর্বোচ্চ পেশাদারি মনোভাব, আনুগত্য ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন। তাদের অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের সুনাম বেড়েছে এবং বাংলাদেশের শান্তিরীরা একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে সম হয়েছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাতেও পরিণত হয়েছে শান্তিরক্ষী বাহিনী। বর্তমানে বিশ্বের ১২২টি দেশের শান্তি রায় বাংলাদেশের ৯ হাজার ৫৯৩ জন শান্তিরী সদস্য অত্যন্ত দতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ওইসব দেশের ১৭টি মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরীরা নিয়োজিত আছেন।
শান্তিরা মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এখন বিশ্বে সর্বোচ্চ শান্তি সেনা প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে বাংলাদেশের সেনা, নৌ, বিমান ও পুলিশ বাহিনী আন্তর্জাতিক মান অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশ বীরের জাতি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শান্তিরা মিশনে বাংলাদেশের নারীরাও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছেন।
দিবসটি উপলে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘ শান্তিরী মিশনে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। পেশাদারিত্বের পাশাপাশি অর্পিত দায়িত্বের প্রতি একনিষ্ঠতা বাংলাদেশি শান্তিরীদের এই সাফল্য অর্জনে ভূমিকা রেখেছে। রাষ্ট্রপতি বিশ্বশান্তি রার মহান দায়িত্ব পালন করতে জীবন উৎসর্গকারী শান্তিরীদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। তিনি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
দিবসটি উপলে দেয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শান্তিরা বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করবেন। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প থেকে জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রমের প্রতি আমাদের অব্যাহত সমর্থন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে কর্মরত সকল বাংলাদেশি সদস্যকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বাংলাদেশের শান্তিরীদের জাতিসংঘ শান্তিরা মিশনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব এবং নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দিয়ে বলেন, আমি আশা করি আপনারা (জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশগ্রহণকারী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতীয় পতাকা সমুন্নত রাখার মাধ্যমে শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করে যাবেন। ১৯৭৪ সালে ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় প্রত্যয়ে ধ্বনিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের উল্লেখ করে আবদুল হামিদ বলেন, তখন থেকে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। রাষ্ট্রপতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বে শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং শান্তিরীরা শুরু থেকে তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জন করেছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, শান্তিরীরা দেশের অর্থনীতি এবং দ্বিপীয় ও বহুপীয় কূটনীতি সম্প্রসারণে অনেক অবদান রাখছে। বাংলাদেশ শান্তিরা মিশনে সবচেয়ে বেশি সেনা প্রেরণকারী দেশ এবং এতে নারী শান্তিরাকারীদের অংশগ্রহণও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। শান্তিরা মিশনে নারী সদস্যের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তারা সংশ্লিষ্ট দেশে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, নারী পুলিশকে সহায়তা এবং নারীর মতায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের শান্তিরীদের শক্তিশালী অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ প্রশিণের ওপর গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার বিভিন্ন দেশের পরিবেশের উপযোগী এবং আধুনিক সমরাস্ত্র ও তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসমৃদ্ধ শান্তিরী প্রেরণ করছে।
রাষ্ট্রপতি মিশনে দায়িত্ব পালনকালে শহীদ দুই জন ও ৮ জন আহত শান্তিরীকে পদক প্রদান করেন। পরে তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৪ দেশের শান্তিরীর সঙ্গে কথা বলেন।