প্রতিবেদন

ঘূর্ণিঝড় মোরা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে সরকার : দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমেছে অনেক

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঘূর্ণিঝড় মোরা যেদিন বাংলাদেশ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল সেদিন আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ৬০ বছর পূর্তির সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অবস্থান করছিলেন। ২৯ মে প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা ছাড়ার পর এই ঝড়ের জন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সঙ্কেত জারি করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সন্ধ্যা ৬টায় সঙ্কেত ১০ নম্বরে উন্নীত হয়। বাংলাদেশ সময় ২৯ মে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী ভিয়েনায় পৌঁছে তার সফরকালীন আবাসস্থল ইম্পেরিয়াল হোটেলে যাওয়ার পরপরই ঝড়ের সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিয়ে দেশে কথা বলেন। ঝড়ের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার সঙ্গে সার্বণিক যোগাযোগ রাখতে থাকেন। ঝড় মোকাবিলায় প্রশাসনকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রাখার নির্দেশও দেন শেখ হাসিনা। পরে ভিয়েনার গ্র্যান্ড হোটেলে অস্ট্রিয়া আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সব প্রস্তুতি গ্রহণের কথা জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘১০ নম্বর সিগন্যাল দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, আমরা অনবরত খবর রাখছি। সব মানুষকে নিরাপদ শেল্টারে নেয়া হয়েছে। নৌবাহিনীর সকল জাহাজ এবং বিমান বাহিনীর সকল উড়োজাহাজ সরানো হয়েছে।’
অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের আগেই ঢাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়। সভা থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে দ্রুত সভা করে প্রয়োজনীয় পদপে নিতে বলা হয়। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করতেও নির্দেশ দেয়া হয়। ঝড়-পরবর্তী সময়ে ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রত্যেক জেলায় প্রয়োজনীয় চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ করা হয়।
প্রবল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় মোরা ৩০ মে সকালে আঘাত হানে। সমুদ্রে ভাটার সময় আঘাত হানার কারণে উপকূলে কোনো জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা ঘটেনি। তবে কিছু য়তি ও প্রাণহানি ঘটে। সরকারি উদ্যোগে পূর্ব প্রস্তুতি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে না পারলে য়তির পরিমাণ আরও বাড়তে পারত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজার সদরে ১, চকরিয়ায় ৩, পেকুয়ায় ১, রাঙ্গামাটিতে ২ জন ও ভোলার মনপুরায় একটি শিশুর প্রাণহানি ঘটে।
ঘূর্ণিঝড় মোরা উপকূলে আঘাত হানার সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১৮ কিলোমিটারের বেশি। স্থলভাগে আসার পর প্রবল ঘূর্ণিঝড় মোরার শক্তি কমতে শুরু করে। ফলে ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় জেলাগুলোতে কিছু ঘরবাড়ি ও গাছপালা বিধ্বস্ত হয়। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার উপকূলবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজ নিজ বাসা-বাড়িতে ফিরে যায়। এদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ স্থানে দিনভর বৃষ্টি হয়। শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি রুটে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকে। ফেরি চলে সীমিত পরিসরে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে কুতুবদিয়া, কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিনস ও চট্টগ্রামে কিছু কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং গাছপালা ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় নেয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। ভোর রাত পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেয়া হয়। দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতি জেলায় বরাদ্দ দেয়া হয় ১০ লাখ টাকা। মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ক সব সময় পরিস্থিতি জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মকা- তদারকি করেছে।
তবে ঘূর্ণিঝড় মোরায় সাগর উত্তাল থাকলেও অমাবস্যা-পূর্ণিমার তিথি না থাকায় জলোচ্ছ্বাস তেমন জোরালো হয়নি। ভাটা থাকায় বাড়তে পারেনি উজানের পানি। অমাবস্যা এবং পূর্ণিমা অর্থাৎ প্রতি মাসে সাধারণত দুবার প্রবল জোয়ারের তিথি থাকে। সৌভাগ্য যে, মোরার সময় প্রবল জোয়ারের তিথি ছিল না। এতেও অনেকটাই রা পেয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, উখিয়াসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা। ভেসে যায়নি কোটি কোটি টাকার চিংড়ি ঘের তথা মৎস্য সম্পদ। ২৯ মে বিকেল থেকেই মাইকিং করে উপকূলীয় বাসিন্দাদের নিয়ে আসা হয় বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে। তাদের জন্য শুকনো খাবার এবং সেহরির ব্যবস্থাও করা হয়। ৩০ মে দুপুরের পর তারা আশ্রয় কেন্দ্র ছেড়ে যেতে থাকেন। স্থল থেকে বিচ্ছিন্ন ুদ্র দ্বীপ সেন্টমার্টিনে তি হয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রবল বেগে বয়ে যাওয়া বাতাস উড়িয়ে নিয়েছে অসংখ্য বসতঘর। উপড়ে পড়ে গাছপালা। নোঙ্গর ছিঁড়ে ভেসে যায় অন্তত ১৫টি ফিশিং বোট। এ দ্বীপের অনেকেই আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। তবে জেলা প্রশাসনের তৎপরতা এবং প্রস্তুতি থাকায় জানমালের তি হয়নি। এ জন্য স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
কুতুবদিয়ায় ২৯ মে সন্ধ্যা হতে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক ব্যাপকভাবে আবহাওয়ার খবর প্রচার করায় দুর্গম এলাকাসহ অন্যান্য গ্রামের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ আশ্রয় নেয় বিভিন্ন সাইকোন শেল্টারে। ওসব আশ্রিত মানুষের জন্য শুকনা খাবার বিতরণ করে উপজেলা প্রশাসন। মহাবিপদ সঙ্কেত প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল নেটওয়ার্ক গ্রামীণ অপারেটরে কিছুটা কাজ করলেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অন্য অপারেটরগুলো। তাছাড়া রাত ১০টার পর হতে বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎ সংযোগ। বিশেষ করে দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের ব্যবহার্য রবি অপারেটর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় জনজীবনে নেমে আসে মারাত্মক ভোগান্তি। তবে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষকে উদ্ধার ও পুনর্বাসন কাজে উপজেলা প্রশাসন ছিল বেশ তৎপর।
ভাটার টানে ঘূর্ণিঝড় মোরা প্রবল শক্তি নিয়ে আঘাত হানতে না পারায় উপকূলের মানুষ সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ঘূর্ণিঝড়ে তিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জনগণের সেবার জন্যই রাজনীতি করি। কেবল সরকারে নয়, বিরোধীদলে থাকতেও যেকোনো দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। দুর্যোগে মানুষের জীবন রাই আমাদের প্রথম ল্য। ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসবেই। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসও হবে। কিন্তু ওই সময় আমাদের প্রথম কর্তব্য মানুষের জীবন রা করা। আমরা সতর্ক রয়েছি। যখনই ঘূর্ণিঝড়ের আভাস পাই, তখনই কতটুকু য়তি হতে পারে এবং সেগুলো মোকাবিলায় কার কী করণীয় তা নির্ধারণ করে মানুষের পাশে ছুটে যাই। সব ধরনের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করি বলেই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে আমরা সম হই; ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেকাংশে কমে আসে।
ঘূর্ণিঝড় মোরায় য়তির বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে পরিমাণ তি হওয়ার কথা ছিল আল্লাহর রহমতে তা হয়নি। সাগরে ভাটা থাকায় য়তি অনেক কম হয়েছে। তবে প্রচুর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, গাছপালা ভেঙে পড়েছে। সরকার ও সচেতন প্রশাসন দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও পদপে নিয়েছে। তিনি জানান, ভিয়েনা সফরে থাকতেই ঘূর্ণিঝড় মোরা মোকাবিলায় সব ধরনের পদপে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলাম। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দুটি জাহাজ তিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ তৎপরতাসহ মানুষের জানমাল রায় পদপে নিয়েছে। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারও প্রস্তুত ছিল। প্রয়োজনে সেগুলোকেও ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ছিল সরকারের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩১ মে সকালে দেশে ফেরার পরপরই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছি তিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে। দলের পে একাধিক টিমও গঠন করা হয়েছে। তারা তিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ করছে। কেমন তি হয়েছে, পুনর্বাসনে কী কী করণীয় সেগুলোও তারা (আওয়ামী লীগ) নির্ধারণ করে সুপারিশ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার, প্রশাসন, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প থেকেও ঘূর্ণিঝড় মোরায় তিগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে সব ধরনের পদপে নেয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে তিগ্রস্ত সব বাড়িঘর মেরামত করে দেয়া হবে। খাদ্য ও নগদ সহায়তার পাশাপাশি পুনর্বাসনে সবকিছু করা হচ্ছে।
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সরকার নির্মিত সাইকোন শেল্টার মুজিব কেল্লার উন্নয়নসহ নতুন নতুন সাইকোন শেল্টার তৈরি ও উন্নয়নে তার সরকারের পদপেগুলোও জাতীয় সংসদে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। এ প্রসঙ্গে ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক সম্পদহানি হলেও তৎকালীন বিএনপি সরকারের নিদারুণ ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ওই ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা ও মানুষের জানমাল রায় বিএনপি সরকারের কোনো পূর্বপ্রস্তুতিই ছিল না। এ কারণে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়, ঘরবাড়ি ও সম্পদ ধ্বংস হয়। বিপুল সংখ্যক গবাদিপশু ভেসে যায়। নৌবাহিনীর জাহাজ ও বিমান বাহিনীর উড়োজাহাজও তিগ্রস্ত হয়। সে সময় বিরোধী দলে থাকলেও আমরা দলের সব সংসদ সদস্যকে নিয়ে তিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি এমনকি মারা যাওয়া মানুষের মরদেহ উদ্ধার ও দাফনের পদপেও নিয়েছিলাম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় আমি সংসদে দাঁড়িয়ে লাখ লাখ প্রাণহানি ও ব্যাপক সম্পদ ধ্বংসের কথা তুলে ধরলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেছিলেন, যত মানুষ মারা যাওয়ার কথা ছিল, তত মানুষ মারা যায়নি। আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, কত মানুষ মারা গেলে আপনার তত মানুষ হতো? খালেদা জিয়া ওই প্রশ্নের জবাব দেননি। কত লাখ মানুষ মারা গেছে, কত গবাদিপশু ভেসে গেছে, কত ঘরবাড়ি ও গাছপালা ধ্বংস হয়েছে তার খোঁজখবরও বিএনপি সরকার রাখেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাওরসহ দুর্গত এলাকায় নদীভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এটি শেষ হলে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজও শুরু হবে। তবে কাজগুলো একসঙ্গে শুরু ও শেষ করার পদপে নিতে হবে। কেননা এক পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বর্ষা মৌসুম এসে যাওয়ায় আবারো নদীভাঙন শুরু হয়ে যায়। হাওর, বাঁওড় ও বিলের উন্নয়নে সরকার ইতোমধ্যে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেছে। কার্যক্রমগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ঢিমেতালে কাজ করলে চলবে না। কাজগুলো গতিশীল করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে সতর্ক ও সজাগ হওয়ারও নির্দেশ দেন।